রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি, রাজনীতিবিদসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ বৃহস্পতিবার সকালে ঈদগাহের প্রধান জামাতে অংশ নিয়েছেন।
ত্যাগের আহ্বান আর আনন্দের বার্তা নিয়ে এসেছে আরেকটি উৎসবের দিন, ঈদগাহ আর মসজিদে মসজিদে ঈদুল আজহার নামাজে অংশ নিয়েছেন সকল শ্রেণি, পেশা আর বয়সের লাখো মুসলমান। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টায় জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে এবারের কোরবানির ঈদের প্রধান জামাত হয়। সেখানে ইমামতি করেন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতি মোহাম্মদ আবদুল মালেক।
নামাজ শেষে দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনার পাশাপাশি বিশ্ববাসীর শান্তি প্রার্থনায় দোয়া ও মোনাজাত করা হয়। আল্লাহর কাছে হাত তুলে মুফতি মোহাম্মদ আবদুল মালেক বলেন, “সব মজলুম ভাইকে জুলুম থেকে হেফাজত করেন, জালিমদেরকে বন্দি করে দেন হে আল্লাহ। জালিমদের উত্তম বিচার আপনিই করতে পারেন হে মাওলা।” মুনাজাতে তিনি বলেন, “বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মুসলমনরা মজলুম হয়ে আছে, ইবাদত আদায় করতে পারছেন না, এই জুলুম থেকে হেফাজত করেন আল্লাহ। আমাদের এই দেশকে হেফাজত করেন, পুরো মুসলিম বিশ্বকে হেফাজক করেন। এই বাংলাদেশের সরকারকে মাওলা হিম্মত, নেক নিয়ত, সৎ সাহস আরো বাড়িয়ে দেন আল্লাহ। আমাদের ইবাদত বন্দেগি কবুল করেন।”
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ, সমাজকল্যাণ মন্ত্রী এজেডএম জাহিদ হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ইসমাইল জবিহউল্লাহ, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এ কে এম শামসুল ইসলাম, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিনসহ মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য, রাজনীতিবিদ, বিচারপতি, কূটনীতিক, সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জাতীয় ঈদগাহে ঈদের জামাতে অংশ নেন।
নামাজ ও মোনাজাত শেষে রেওয়াজ মাফিক বুকে বুক মিলিয়ে কোলাকুলি করেন সবাই। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পরস্পেরের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। নামাজে আসা বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে হাত মিলিয়ে শুভেচ্ছা্ বিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী।
এ জামাতে অংশ নিতে ভোর থেকেই ঈদগাহর মূল ফটকের বাইরে লাইন শুরু হয়। পায়জামা পাঞ্জাবি, টুপি পড়ে ও নানা ধরনের আতর সুগন্ধি মেখে সবাই জড়ো হন ঈদগাহ মাঠে। জামাত শুরুর সময়ের আগেই ঈদগাহ পরিপূর্ণ হয়ে যায়।
শিশু-কিশোরেরা আসে তাদের বাবা-মায়ের সঙ্গে। হাতে হাত ধরে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তারা মাঠে প্রবেশ করে। অনেকেই ঈদগাহে আসেন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে। এজন্য বড় বিছানার চাদর ও ম্যাট নিয়ে আসেন কেউ কেউ।
ঈদগাহে এবারো প্রবেশ করতে হয়েছে সারিবদ্ধভাবে। প্রধান ফটকে বসানো আর্চওয়ের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে নিরাপত্তা বিধি পালন করে।
ঈদগাহ ময়দানে সহজে প্রবেশ ও বের হতে মৎস্য ভবন, বঙ্গবাজর, পল্টন, জিপিও মোড় ঘিরে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনী।
এবার একসঙ্গে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষের নামাজ পড়ার ব্যবস্থা করেছিল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। নারীদের জন্য ছিল আলাদা ব্যবস্থা।
প্রতিবছরের মত এবারও ঈদুল আজহার দিনে পাঁচটি জামাত হয়েছে ঢাকায় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে।
সকাল ৭টায় সেখানে প্রথম জামাত হয়। নামাজ শেষে সমগ্র মুসলিম উম্মাহ এবং দেশ ও জাতির কল্যাণ, সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনায় মোনাজাত করা হয়।

কোরবানি ঈদের সকালে কোথাও কোথাও বৃষ্টি হতে পারে বলে আভাস দিয়েছিল আবহাওয়া অফিস। সকালে ঢাকার আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলেও ঈদের সামাজ পড়তে আসা মানুষকে বৃষ্টির বিড়ম্বনায় পড়তে হয়নি।
ঠিক হয়েছিল, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ঈদগাহে জামাত শুরু করা সম্ভব না হলে বায়তুল মোকাররম মসজিদে সকাল ৮টায় প্রধান জামাত হবে। তবে আবহাওয়া বিরূপ না হওয়ায় প্রধান জামাতের স্থান বদলেরও প্রয়োজন পড়েনি।
ঈদ জামাত শেষে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়েন পশু কোরবানির তোড়জোড়ে। এবার ঢাকায় সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে পশু জবাই করার জন্য আলাদা স্থান বেঁধে দেওয়া হয়নি। বরাবরের মতই নগরজুড়ে রাস্তা ও অলিগলিতে পশু জবাইয়ের দৃশ্য দেখা গেছে।
ঢাকায় কোরবানি করা পশু এবং কোরবানির হাট মিলিয়ে ৫০ হাজার টনের বেশি বর্জ্য তৈরি হয়। সেভাবেই দ্রুততম সময়ে অপসারণের চ্যালেঞ্জ নিয়েছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। দিনের বর্জ্য দিনে সাফ করাই তাদের লক্ষ্য।
মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে ঈদ জাতীয় উৎসবে রূপ নেয়। ঈদযাত্রা সহজ করতে এবার একটানা সাত দিনের ছুটি ঘোষণা করেছে সরকার। ঢাকা থেকে এক কোটির বেশি মানুষ গ্রামে চলে গেছেন স্বজনদের সঙ্গে ঈদ করতে।
ঈদের শুভেচ্ছা বাণীতে কোরবানির আনন্দ দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষ এবং অভাবগ্রস্তদের সঙ্গে যথাযথভাবে ভাগাভাগি করে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তিনি বলেছেন, “ঈদুল আজহায় কোরবানির হিস্যা আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও দরিদ্র মানুষের মধ্যে সুষ্ঠু বণ্টনের মাধ্যমে সমাজে অংশীদারিত্ব, বৈষম্য হ্রাস, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত হয়। কোরবানির ঈদ গরিব মানুষের সারা বছরের আমিষ যোগানে সাহায্য করে। সার্বিক অর্থে দেশের অর্থনীতিকে ব্যাপকভাবে চাঙ্গা করে।”
নির্ধারিত স্থানে কোরবানি করার পাশাপাশি কোরবানির বর্জ্য ফেলার আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপ্রধান বলেন, “সমাজের সচ্ছল ও বিত্তবানদের আহ্বান জানাব, তারা যেন কোরবানির আনন্দ দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষ এবং অভাবগ্রস্তদের সঙ্গে যথাযথভাবে ভাগাভাগি করে নেন, মানব কল্যাণে এগিয়ে আসেন।” ঈদুল আজহার মহান শিক্ষাকে ধারণ করে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সততা, সহনশীলতা, মানবিক মূল্যবোধ ও ত্যাগের আদর্শ প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।
ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে মানুষের ত্যাগ কবুলের পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে শান্তি, সম্প্রীতি ও নিরাপত্তার জন্য প্রার্থনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

বিশ্ববাসীকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি বলেছেন, “পবিত্র ঈদুল আজহায় আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের ত্যাগ কবুল করেন। আমাদের মাতৃভূমিসহ সমগ্র মুসলিম বিশ্ব ও মানবজাতির জন্য শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা দান করেন। একইসঙ্গে আমি বিশ্বজুড়ে শান্তি, সম্প্রীতি এবং নিরাপত্তার জন্যও মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করছি। ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর হোক এই পবিত্র ঈদুল আজহা। আল্লাহ আমাদের কোরবানি ও ইবাদত কবুল করে নিন। তার অশেষ রহমত ও বরকতে আমাদের জীবন ভরে উঠুক শান্তি ও সমৃদ্ধিতে।”
রাষ্ট্রপতির কার্যালয় জানিয়েছে, ঈদের দিন বেলা ১১টা থেকে ১২টা পর্যন্ত বঙ্গভবনে রাজনৈতিক দলেন নেতা, কূটনীতিক, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও তার সহধর্মিনী রেবেকা সুলতানা।
তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শুভেচ্ছা বিনিময়ের কোনো কর্মসূচি রাখেননি। ঈদের নামাজ শেষে তিনি বাবা জিয়াউর রহমান ও মা খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করেন। দুপুরে ঢাকা সেনানিবাসে সশস্ত্র বাহিনী আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী ‘বড়খানা’ (প্রীতিভোজ) অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন।