ইরান যুদ্ধের প্রতিধ্বনি পাকিস্তানেও গভীরভাবে অনুভূত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্র দেশটিকে কূটনীতিকভাবে কঠিন এক অবস্থায় ফেলে দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি। আল জাজিরা লিখেছে, ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তে পাকিস্তানের প্রায় ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। দেশটির লাখ লাখ শ্রমিক কাজ করেন সৌদি আরব ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশে। আনুষ্ঠানিকভাবে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি করে গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে রিয়াদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক আরও জোরদার করেছে ইসলামাবাদ। এই চুক্তি অনুযায়ী এক পক্ষের ওপর আগ্রাসনকে উভয়ের ওপর আগ্রাসন হিসেবে বিবেচনা করার অঙ্গীকার রয়েছে।
ইরানের ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উপসাগরীয় দেশগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যাওয়ায় একটি প্রশ্ন পাকিস্তানে ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছে—যদি এই যুদ্ধে ইসলামাবাদও জড়িয়ে পড়ে, তাহলে তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে? এ পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া মূলত কূটনৈতিক তৎপরতায় সীমিত রয়েছে। আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গে, বিশেষ করে ইরান ও সৌদি আরবসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে ইসলামাবাদ।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র গেল ২৮ ফেব্রুয়ারি যৌথভাবে ইরানে হামলায় শুরু করে, তাতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওন।
পাকিস্তান এই হামলাকে ‘অযৌক্তিক’ বলে নিন্দা জানায়। তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ইরানের পাল্টা হামলাকেও ‘সার্বভৌমত্বের স্পষ্ট লঙ্ঘন’ বলে আখ্যা দেয় তারা।
সংঘাত শুরুর সময় ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা-ওআইসির বৈঠকে অংশ নিতে রিয়াদে ছিলেন পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার। পরে তিনি বলেছেন, তেহরান ও রিয়াদের মধ্যে তিনি ‘শাটল যোগাযোগ’ শুরু করেছেন।
৩ মার্চ সিনেটে এবং একই দিন এক সংবাদ সম্মেলনে ইসহাক দার বলেছেন যে তিনি ব্যক্তিগতভাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিকে সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা চুক্তির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। দার বলেন, “সৌদি আরবের সঙ্গে আমাদের একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে এবং পুরো বিশ্বই তা জানে। আমি ইরানের নেতৃত্বকে বলেছি, সৌদি আরবের সঙ্গে আমাদের এই চুক্তির বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে।”
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জবাবে আগারচি সৌদি আরবের মাটি থেকে ইরানের ওপর হামলা হবে না, এমন নিশ্চয়তা চেয়েছেন।
দার বলেন, তিনি রিয়াদের কাছ থেকে সেই আশ্বাস পেয়েছেন এবং দাবি করেন, পর্দার আড়ালের এই যোগাযোগের ফলেই সৌদি আরবে ইরানের হামলার মাত্রা সীমিত ছিল।
বৃহস্পতিবার সৌদি আরবে ইরানের রাষ্ট্রদূত আলিরেজা ইনায়েতি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে সৌদি আরব তাদের আকাশসীমা বা ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেবে না—রিয়াদের এমন প্রতিশ্রুতিকে তেহরান স্বাগত জানায়। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “সৌদি আরবের কাছ থেকে আমরা বারবার শুনেছি যে তারা তাদের আকাশসীমা, জলসীমা বা ভূখণ্ড ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে দেবে না—এ জন্য আমরা কৃতজ্ঞ।”
তবে একদিন পরেই শুক্রবার ভোরে সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায় যে সেখানে প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটি লক্ষ্য করে ছোড়া তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তারা প্রতিহত করেছে। এর কয়েক ঘণ্টা পরেই পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির রিয়াদে পৌঁছে সে দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে সৌদি মন্ত্রী বলেন, বৈঠকে ‘সৌদি আরবের ওপর ইরানের হামলা এবং পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির কাঠামোর মধ্যে সেগুলো বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ’ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
বিশ্লেষকের মতে, যুদ্ধ যত তীব্র হচ্ছে, দুই ঘনিষ্ঠ অংশীদার—ইরান ও সৌদি আরব—এর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা পাকিস্তানের জন্য ততই কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
চাপে প্রতিরক্ষা চুক্তি
গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর রিয়াদে স্বাক্ষরিত ‘স্ট্র্যাটেজিক মিউচুয়াল ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট’ ছিল সাম্প্রতিক কয়েক দশকের মধ্যে পাকিস্তানের করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা চুক্তি।
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ সালমান ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ যখন চুক্তিতে সই করেন তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান আসিম মুনির।
চুক্তিটির মূল ধারায় বলা হয়েছে, যেকোনো এক দেশের ওপর আগ্রাসনকে উভয় দেশের ওপর আগ্রাসন হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
তবে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন, এটিকে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের স্বয়ংক্রিয় বাধ্যবাধকতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না।
সেপ্টেম্বরে দোহায় হামাস কর্মকর্তাদের ওপর ইসরায়েলের হামলার পর এই চুক্তি করা হয়। উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ-জিসিসিভুক্ত বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে মার্কিন নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে দেশগুলোর যে আস্থা ছিল তাতে বড় ধাক্কা হয়ে আসে এই ঘটনা।
পারমাণবিক অস্ত্রধারী পাকিস্তান বহু দশক ধরে সৌদি আরবের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। এর আওতায় বর্তমানে প্রায় ১,৫০০ থেকে ২,০০০ পাকিস্তানি সেনা সদস্য সৌদি আরবে মোতায়েন রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
ইরানের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যে এই প্রতিরক্ষা চুক্তি এমন এক পরীক্ষার মুখে পড়েছে, যা দুই পক্ষের কেউই আগে কল্পনা করেনি।
রিয়াদভিত্তিক ‘কিং ফয়সাল সেন্টার পর রিসার্চ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ’ এর অ্যাসোসিয়েট ফেলো উমর কারিম মনে করেন, পাকিস্তানের বর্তমান জটিল পরিস্থিতি মূলত একটি ‘ভুল হিসাবের ফল’।
তার মতে, ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের পর ইসলামাবাদ সম্ভবত কখনও ভাবেনি যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাদের তেহরান ও রিয়াদের মধ্যে দোটানায় পড়তে হবে।
কারিম আল জাজিরাকে বলেন, “পাকিস্তানের নেতারা সব সময় সৌদি আরবের প্রতিরক্ষার সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে জড়িয়ে পড়া থেকে সতর্ক ছিলেন। বর্তমান সেনাপ্রধান প্রথমবারের মতো তা করেছেন, তাতে সম্ভাব্য লাভ যেমন বড়, তেমনি মাশুলও বেশি।” তিনি বলেন, “সম্ভবত এটাই শেষবার, যখন সৌদি আরব পরীক্ষা করবে পাকিস্তানকে। যদি এবার পাকিস্তান প্রতিশ্রুতি পূরণ না করে, তাহলে দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক অপূরণীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।”
২০১৫ সালে ইয়েমেনে যুদ্ধরত সামরিক জোটে যোগ দিতে সৌদি আরবের সরাসরি অনুরোধ পাকিস্তান প্রত্যাখ্যান করেছিল। তখন দেশটির পার্লামেন্ট একটি প্রস্তাব পাস করে নিরপেক্ষ থাকার সিদ্ধান্ত নেয়।
ওই ঘটনার দৃষ্টান্ত টেনে রিয়াদভিত্তিক ‘গালফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরাম’ এর জ্যেষ্ঠ অনাবাসী ফেলো আজিজ আলগাশিন বলেন, “সৌদি–পাকিস্তান চুক্তির সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। চুক্তি যতটা শক্তিশালী, তার পেছনের রাজনৈতিক হিসাব ও সদিচ্ছাও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ।”
তবে ইসলামাবাদের কায়েদ-ই আজম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক ইলহান নিয়াজ বলেন, যদি ইরানের হুমকি যথেষ্ট গুরুতর মনে করে সৌদি আরব আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানের সামরিক সহায়তা চায়, তাহলে পাকিস্তান সৌদি আরবকে ‘সহায়তায় এগিয়ে আসবে’। তার ভাষায়, “তা না হলে পাকিস্তানের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
পাকিস্তানের সীমাবদ্ধতা
তবে পাকিস্তানের জন্য জটিলতা হল, রিয়াদ যদি সামরিক সহায়তা চায়, ইরানকে নিছক প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখার মতো সক্ষমতা ইসলামাবাদের নেই। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ ও সহজে অতিক্রমযোগ্য সীমান্ত রয়েছে, বাণিজ্যিক সম্পর্কও উল্লেখযোগ্য। সাম্প্রতিক সময়ে কূটনৈতিক যোগাযোগও বেড়েছে। ২০২৫ সালের অগাস্টে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ইসলামাবাদ সফর করেন এবং দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক নানা যোগাযোগ বজায় রয়েছে। অধ্যাপক নিয়াজ স্বীকার করেন, তেহরান কখনও কখনও ‘কঠিন প্রতিবেশী’ হিসেবেও আচরণ করেছে। দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কের অনিশ্চয়তার প্রমাণ হিসেবে তিনি ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে সীমান্তে হামলা পাল্টা হামলার ঘটনা সামনে আনেন, যে হামলা শুরু করেছিল ইরান।
তবুও তার মতে, ইরানের স্থিতিশীলতা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা নিশ্চিত করা পাকিস্তানের জন্য ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্বার্থ’, “ইরান যদি গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত হয়, বিচ্ছিন্ন হয়ে হয়ে যাওয়া ভূ-খণ্ডে লড়াই চলতে থাকে অথবা পাকিস্তানের পশ্চিম সীমান্ত পর্যন্ত ইসরায়েলের প্রভাব বিস্তৃত হয়—এসব আশঙ্কা ইসলামাবাদকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে।”
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের হামলা এবং ইরানের পাল্টা হামলার প্রভাব পাকিস্তানের ভেতরেও দ্রুত দেখা দিয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর পাকিস্তানজুড়ে বিক্ষোভে অন্তত ২৩ জন নিহত হন। এর জেরে গিলগিট বালতিস্তানে সেনা মোতায়েন ও তিন দিনের কারফিউ জারি করা হয়।
প্রধানত পাকিস্তানের শিয়া সম্প্রদায়ের নেতৃত্বে এই বিক্ষোভগুলো হয়। প্রায় ২৫ কোটি জনসংখ্যার ওই দেশে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ শিয়া, যারা ঐতিহাসিকভাবেই ইরান–সংক্রান্ত ঘটনাকে ঘিরে সক্রিয় হয়ে ওঠে। পাকিস্তানে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার দীর্ঘ ইতিহাস এই সংকটকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
‘জয়নাবিউন ব্রিগেড’ নামে একটি শিয়া মিলিশিয়াগোষ্ঠীকে প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন ও নেতৃত্ব দেয় ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোর। গত এক দশকে পাকিস্তান থেকে হাজারো যোদ্ধা নিয়োগ করেছে এই গোষ্ঠী। তাদের অনেকেই সিরিয়ায় জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসআই এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অংশ নিয়েছিল। সিরীয় কিছু মানবাধিকারকর্মী তাদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগও করেছেন।
দুই বছর আগে পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কুররাম এলাকায় ২০২৪ সালের শেষ কয়েক সপ্তাহে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষে ১৩০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়। এ এলাকাটি জয়নাবিউন ব্রিগেডের প্রধান নিয়োগকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। সে বছরই পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে এই গোষ্ঠীকে নিষিদ্ধ করে। তবে অনেকের মতে, এই পদক্ষেপ তাদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে তেমন কার্যকর হয়নি।
বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, যদি ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের উপসাগরীয় মিত্রদের সংঘাত আরও তীব্র হয়, তাহলে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা অর্জন করা এসব যোদ্ধা পাকিস্তানের মাটিতে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান থেকে আক্রমণাত্মক ভূমিকায় যেতে পারে। ইসলামাবাদভিত্তিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক আমির রানা বলেছেন, “পাকিস্তানের শিয়া সংগঠনগুলোর ওপর ইরানের উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে।”
‘পাক ইনস্টিটিউজ অব পিস স্টাডিজ’ এর নির্বাহী পরিচালক রানা বলছেন, এছাড়া আছে বেলুচিস্তান, যা আগে থেকেই অস্থিতিশীল, ‘কোনো ধরনের মুখোমুখি সংঘাত হলে পাকিস্তানের জন্য তার পরিণতি গুরুতর হতে পারে।”
পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশের সীমানা ইরানের সঙ্গে যুক্ত এবং কয়েক দশক ধরে এটি বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল।
তেহরানভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোহাম্মদ খাতিবি আল জাজিরাকে বলেন, এই বাস্তবতা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তার মতে, ভৌগোলিক বাস্তবতাই ইসলামাবাদের কৌশলগত সিদ্ধান্তকে সীমাবদ্ধ করে দেয়।
পাকিস্তানের সামনে কী বিকল্প
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণাত্মক সামরিক পদক্ষেপ, যেমন যুদ্ধবিমান মোতায়েন বা ইরানের ভূখণ্ডে হামলা পাকিস্তানের জন্য বাস্তবসম্মত বিকল্প নয়, দেটির অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতা বিবেচনায়। বিশ্লেষক আমির রানা মনে করেন, পাকিস্তান বর্তমানে দুই পক্ষকেই সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, “ইরানের প্রধান সামরিক হুমকি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং এই ক্ষেত্রে সৌদি আরবকে সহায়তা করতে পারে পাকিস্তান। কিন্তু তা করলে পাকিস্তান সরাসরি এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে—সেটাই বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন।” তার মতে, পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে গোপনে সৌদি আরবকে কিছু ‘অপারেশনাল’ সহায়তা দেওয়া, একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখা।
রিয়াদভিত্তিক নীতিবিশ্লেষক আজিজ আলগাশিয়ানও এই মতের সঙ্গে একমত। তিনি বলেন, পাকিস্তানের সবচেয়ে বাস্তব ভূমিকা হতে পারে আকাশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা দেওয়া—যা সামরিকভাবে অর্থবহ এবং রাজনৈতিকভাবেও গ্রহণযোগ্য। তার ভাষায়, “পাকিস্তান সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে। এটি বাস্তবসম্মত, প্রতিরক্ষামূলক এবং পাকিস্তানের স্বার্থেও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সৌদি আরবের স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ হওয়া পাকিস্তানের জন্য উপকারী।”
তবে রিয়াদভিত্তিক গবেষক উমর কারিম সতর্ক করে বলেন, পাকিস্তানের জন্য দুই পক্ষের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার পথ ইসলামাবাদের ভাবনার চেয়ে দ্রুত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, “পরিস্থিতি যদি সংকটজনক পর্যায়ে পৌঁছে যায় এবং সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনা ও অবকাঠামোতে হামলা বাড়ে, তাহলে তারা পাকিস্তানের কাছে প্রতিরক্ষা সহায়তা চাইবে—এটা শুধু সময়ের ব্যাপার।”
কারিম বলেন, পাকিস্তান যদি সৌদি আরবে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করে, তাহলে নিজ দেশের আকাশ প্রতিরক্ষাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। আর সংঘাতে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়লে দেশের ভেতরেও রাজনৈতিক চাপ বাড়তে পারে।
এ মুহূর্তে ইসলামাবাদের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার কূটনীতি, এ কথা তুলে ধরে বিশ্লেষক খাতিবি বলেন, রিয়াদ ও তেহরান—দুই রাজধানীতেই তাদের যোগাযোগ এবং অর্জিত আস্থাকে কাজে লাগানোই পাকিস্তানের প্রধান কৌশল হওয়া উচিত। পাকিস্তানের উচিত এই অবস্থান ‘যেকোনো মূল্যে’ ধরে রাখা।
তার ভাষায়, “পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত অবস্থান হলো মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করা এবং দুই পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ককে কাজে লাগানো।”
কোথায় পাকিস্তানের ঝুঁকি?
ইসলামাবাদের জন্য সবচেয়ে প্রতিকূল পরিস্থিতি হবে যদি উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত দেশগুলো সম্মিলিতভাবে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এমন শঙ্কার ইঙ্গিতও বাড়ছে। সৌদি আরব ও আরব আমিরাত উভয়ই বলেছে, ইরানের হামলা ‘লাল রেখা অতিক্রম করেছে’।
১ মার্চ আরব আমিরাত, বাহরাইন, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, ইরানের হামলার মুখে তারা ‘আত্মরক্ষার অধিকার পুনর্ব্যক্ত’ করছে। এ ধরনের উত্তেজনা বাড়লে পাকিস্তানের ওপর তার গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে।
উপসাগরীয় দেশগুলোতে বসবাসকারী লাখ লাখ পাকিস্তানি শ্রমিকের পাঠানো রেমিটেন্স দেশটির অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক মুদ্রার উৎস, যা তার সংকটপূর্ণ অর্থনীতির জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। খাতিবি বলেন, যদি দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক যুদ্ধ উপসাগরীয় অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তবে তা সরাসরি পাকিস্তানের ওপর আর্থিকভাবে প্রভাব ফেলবে। তার মতে, “জ্বালানির দামও বেড়ে যেতে পারে, যা পাকিস্তানের ওপর আরও চাপ তৈরি করবে।” উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানির ওপর পাকিস্তানের নির্ভরতার কথা তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের হামলার দুই দিন আগে আফগানিস্তানের সঙ্গে সংঘাতে জড়ায় পাকিস্তান। বিশ্লেষক উমর কারিম বলেন, আঞ্চলিক সংঘাতে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়লে পাকিস্তানের ভেতরে অস্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে। তিনি বলেন, “সাম্প্রদায়িক সংঘাত আবার জ্বলে উঠতে পারে, যা দেশকে রক্তাক্ত নব্বইয়ের দশকের পরিস্থিতিতে ফিরিয়ে নিতে পারে। সরকারের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা এমনিতেই কম, এ ধরনের ঘটনা ঘটলে সরকার আরও অজনপ্রিয় হয়ে উঠবে।”
পাকিস্তান কী মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে জড়াবে? নীতি বিশ্লেষক আজিজ আলগাশিয়ানের মতে, পাকিস্তানে সংঘাতে জড়াতে চায় না। সৌদি আরব নিজেও এ যুদ্ধ চায় না, পরিস্থিতির কারণে জড়িয়ে পড়েছে। ফলে পাকিস্তানও নিশ্চয় এমন এক যুদ্ধে জড়াতে চাইবে না।
তবে ইতিহাসের অধ্যাপক ইলহান নিয়াজ মনে করেন, পরিস্থিতি যদি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে ইসলামাবাদকে এক পক্ষ বেছে নিতে হয়, তাহলে সিদ্ধান্ত এড়ানো কঠিন হয়ে উঠবে। তার ভাষায়, “যদি তেহরান ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে কোনো একটিকে বেছে নিতে পাকিস্তানকে বাধ্য করে, তাহলে সেই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে সৌদি আরবের পক্ষেই যাবে।”