সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর থেকে ইরানের শাসনব্যবস্থার কেন্দ্রে বড় ধরনের ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে শুরু হয়েছে তাঁর উত্তরসূরি খোঁজার জটিল প্রক্রিয়া।
গত প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে ইরানে ইসলামি শাসনব্যবস্থা বা 'ইসলামিক রিপাবলিক' টিকে আছে। এই দীর্ঘ সময়ে মাত্র একবার দেশটির সর্বোচ্চ নেতা পরিবর্তন করা হয়েছিল। ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন আলী খামেনি। তবে মৃত্যুর আগে খামেনি আনুষ্ঠানিকভাবে কাউকে নিজের উত্তরাধিকারী বা উত্তরসূরি ঘোষণা করে যাননি।
খামেনির উত্তরসূরি নির্বাচন না করা পর্যন্ত দেশ পরিচালনার জন্য গত রোববার তিন সদস্যের একটি পরিষদ গঠন করা হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত থাকায় নতুন নেতা নির্বাচনে কত দিন সময় লাগবে, তা এখনো অস্পষ্ট।
এখন কার হাতে ক্ষমতা
ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত তিন সদস্যের একটি নেতৃত্বদানকারী পরিষদ (লিডারশিপ কাউন্সিল) রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবে। এই পরিষদে রয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, বিচার বিভাগের কট্টরপন্থী প্রধান গোলামহোসেন মোহসেনি ইজেই এবং জ্যেষ্ঠ আলেম আলিরেজা আরাফি।
ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিকল্পনা থাকলেও ইরান হয়তো একসঙ্গে এতজন শীর্ষ কর্মকর্তাদের হারানোর জন্য প্রস্তুত ছিল না। ইসরায়েল দাবি করেছে, শনিবারের হামলায় ইরানের সামরিক বাহিনীর 'বেশির ভাগ' শীর্ষ নেতা নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছেন সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল আবদুররহিম মুসাভি, ইসলামিক রিভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) কমান্ডার মেজর জেনারেল মোহাম্মদ পাকপুর এবং প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের সচিব আলী শামখানি।
১৯৮৯ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধের পরপরই আয়াতুল্লাহ খোমেনি মারা যান। সে সময় একদিনেরও কম সময়ের মধ্যে খামেনিকে উত্তরসূরি হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। ফলে তখন অন্তর্বর্তীকালীন কোনো পরিষদের প্রয়োজন হয়নি।
কিন্তু এবারের পরিস্থিতি বেশ ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মাঝেই খামেনির উত্তরসূরি নির্বাচনের প্রক্রিয়া দীর্ঘ হতে পারে।
তত দিন পর্যন্ত প্রতিরক্ষা বিষয়ক সিদ্ধান্তগুলোর দায়িত্ব আলী লারিজানি ও বাকের গালিবাফের হাতে থাকবে কি না, তা এই অন্তর্বর্তী পরিষদকেই ঠিক করতে হবে।
লারিজানি ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা। গত জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে এই দুজন এবং আলী শামখানি মিলে ইরানের প্রতিরক্ষার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সেই শামখানিই শনিবারের হামলায় নিহত হয়েছেন।
ইরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা কে হবেন, সিদ্ধান্ত নেবে কারা?
ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, ৮৮ জন জ্যেষ্ঠ আলেমের সমন্বয়ে গঠিত 'অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস' বা বিশেষজ্ঞ পরিষদ নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করবে। এই পরিষদের সদস্যরা প্রতি আট বছর পরপর জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন। তবে প্রার্থী হওয়ার আগে তাঁদের 'গার্ডিয়ান কাউন্সিল' বা অভিভাবক পরিষদের অনুমোদন পেতে হয়। ১২ জন আইন বিশেষজ্ঞের এই কাউন্সিল সাধারণত ইরানের পার্লামেন্টের কার্যক্রম তদারক করে।
স্বাভাবিক সময়ে পার্লামেন্টে পাস হওয়া কোনো আইন শরিয়াহসম্মত কি না, তা যাচাই করে এই গার্ডিয়ান কাউন্সিল। প্রয়োজনে তারা আইন সংশোধনের নির্দেশও দেয়। এ ছাড়া পার্লামেন্ট, প্রেসিডেন্ট এবং বিশেষজ্ঞ পরিষদের নির্বাচনে কারা প্রার্থী হতে পারবেন, সেটিও চূড়ান্ত করে এই কাউন্সিল।
নেতৃত্বের দৌড়ে কারা এগিয়ে?
খামেনির দ্বিতীয় ছেলে মোজতবা খামেনি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায়। ইরানের অভিজাত সামরিক বাহিনী ইসলামিক রিভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এবং স্বেচ্ছাসেবী আধাসামরিক বাহিনী বাসিজের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তবে রাজতন্ত্র উৎখাত করে ক্ষমতায় আসা ইসলামি প্রজাতন্ত্রে বাবার পর ছেলের ক্ষমতায় আসাকে ভালো চোখে নাও দেখতে পারেন শিয়া আলেম সমাজ।
অন্তর্বর্তীকালীন কাউন্সিলে জায়গা পাওয়া জ্যেষ্ঠ আলেম আলিরেজা আরাফিকেও শক্তিশালী প্রার্থী ভাবা হচ্ছে। খামেনি তাঁকে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তিনি বিশেষজ্ঞ পরিষদের ডেপুটি চেয়ারম্যান এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্য। অর্থাৎ নিজের প্রার্থিতা যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ তার হাতেই। এ ছাড়া ইরানের মাদ্রাসা বা শিক্ষাব্যবস্থার প্রধান হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করছেন।
আরেকজন সম্ভাব্য প্রার্থী হলেন মোহাম্মদ মেহেদি মিরবাঘেরি। তিনি বিশেষজ্ঞ পরিষদের সদস্য এবং কট্টরপন্থী অংশের প্রতিনিধিত্ব করেন। তবে আয়াতুল্লাহ খোমেনির নাতি হাসান খোমেনির নামও আলোচনায় আছে। তিনি তাঁর সমসাময়িক অন্য নেতাদের তুলনায় কিছুটা কম কট্টর হিসেবে পরিচিত।
তবে ইরান হয়তো অপেক্ষাকৃত তরুণ ও কম পরিচিত কাউকে বেছে নিতে পারে। অথবা একক কোনো ব্যক্তির বদলে নেতৃত্বের দায়িত্ব কোনো কাউন্সিলের হাতেও ছেড়ে দেওয়া হতে পারে।
ইরানের ক্ষমতাচ্যুত শেষ শাহের বড় ছেলে রেজা পাহলভিকে অনেকে সম্ভাব্য নেতা হিসেবে ভাবছেন। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৬। এরপর থেকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রেই বসবাস করছেন। ধারণা করা হচ্ছে, ইসরায়েলেরও তাঁর প্রতি সমর্থন থাকতে পারে।
তবে সমস্যা হলো, ইরানে বর্তমান সরকারের বিকল্প হিসেবে কোনো সংগঠিত শক্তি নেই। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সিআইএ পরিচালক ও অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ডেভিড পেট্রাউস সিএনএনকে বলেন, 'সিরিয়ায় যেমন বাশার আল-আসাদের বাহিনীর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো আহমেদ আল-শারা বা অন্য কোনো নেতা ছিলেন, ইরানে তেমন কেউ নেই।'
বিপ্লব রক্ষা ও বাসিজ বাহিনী
হামলায় শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুতে ইরানের শাসনব্যবস্থায় যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তার নিয়ন্ত্রণ সম্ভবত এখন ইসলামিক রিভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) হাতে। কয়েক দশক ধরে এই বাহিনীই ইরানের শাসনক্ষমতাকে টিকিয়ে রেখেছে। তারা সরাসরি সর্বোচ্চ নেতার কাছে দায়বদ্ধ। দেশের বাইরের শত্রুর পাশাপাশি দেশের ভেতরের শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বও তাদের।
আইআরজিসির ক্ষমতা শুধু অস্ত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ইরানের অর্থনীতির একটা বড় অংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে। নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও যারা সরকারের প্রশ্রয়ে ধনী হয়েছেন, তাদের অনেকেই এই বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত। ধারণা করা হচ্ছে, পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রেও এই বাহিনী বড় ভূমিকা রাখবে।
নামের সঙ্গেই 'গার্ড' বা রক্ষী শব্দটি জড়িয়ে আছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবকে রক্ষা করতেই এই বাহিনীর জন্ম। বর্তমানে এই বাহিনীতে প্রায় দেড় থেকে দুই লাখ সদস্য রয়েছেন। নিজস্ব সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী ও গোয়েন্দা শাখা—সবই আছে তাদের।
ইসরায়েলের হামলায় আইআরজিসির শীর্ষ অনেক নেতা নিহত হলেও তাদের হাতে এখনো 'বাসিজ' বাহিনী রয়েছে। ফারসি শব্দ বাসিজ-এর অর্থ 'সমাবেশ'। এটি মূলত একটি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী, যারা পুলিশের মতো কাজ করে। গ্রামের দরিদ্র ও রক্ষণশীল পরিবার থেকে আসা তরুণদের নিয়ে এটি গঠিত।