ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া ভূখণ্ডটিতে যারা এখনও নিজেদের মৌলিক চাহিদা মেটাতে সংগ্রাম করছেন, সেই গাজাবাসীরাই ভোট দেওয়ার সুযোগকে স্বাগত জানিয়েছেন।
পশ্চিম তীর ও গাজার এক শহরে স্থানীয় নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন কয়েক লাখ ফিলিস্তিনি। শনিবারের এ ভোট দুই দশক পর যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় নির্বাচনের আবহ ফিরিয়েছে; তাও এমন এক সময়ে, যখন ইসরায়েল যে কোনো মূল্যে ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সম্ভাবন্য নস্যাৎ করতে চায়।
পশ্চিম তীরভিত্তিক প্যালেস্টিনিয়ান অথরিটির (পিএ) আশা, নির্বাচনে গাজার দেইর আল-বালাহ’র প্রতীকী অন্তর্ভুক্তি যুদ্ধবিধ্বস্ত ভূখণ্ডটিতে তার কর্তৃত্ব ফেরাতে ভূমিকা রাখবে। ২০০৭ সালে হামাস গাজা থেকে তাদের ক্ষমতাচ্যুত করেছিল।
ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া ভূখণ্ডটিতে যারা এখনও নিজেদের মৌলিক চাহিদা মেটাতে সংগ্রাম করছেন, সেই গাজাবাসীরাই ভোট দেওয়ার সুযোগকে স্বাগত জানিয়েছেন, বলছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
“জন্মের পর থেকে আমি নির্বাচনের কথা শুনে আসছি। আমরা অংশ নিতে আগ্রহী, যাতে আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া বাস্তবতা বদলাতে পারি,” শহরে তাঁবুর ঘরের বাইরে পরিবারের রান্নার হাঁড়ির পাশে বসে এমনটাই বললেন আধাম আল-বারদিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গত অক্টোবরে গাজায় হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ভূখণ্ডটি আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে রাখার পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে থেমে থেমে কিছু আলোচনা হলেও এখন পর্যন্ত খুব বেশি অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। ইউরোপ ও আরব দেশগুলো গাজায় ফের পিএ-র শাসন এবং গাজা, পূর্ব জেরুজালেম ও পশ্চিম তীরকে নিয়ে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র চাইলেও ইসরায়েল ও তাদের মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের বাধায় তা মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। পশ্চিম তীর এখনও ইসরায়েলের দখলে আছে, তার মধ্যেই সীমিত আকারে শাসন চালায় পিএ।
পশ্চিমা কূটনীতিকরা বলছেন, স্থানীয় নির্বাচন দুই দশকের মধ্যে পুরো ফিলিস্তিনজুড়ে একটি জাতীয় নির্বাচনের পথ করে দিতে পারে এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানোসহ সংস্কারের পথে সহযোগিতা করতে পারে।
দুই বছরেরও বেশি সময় আগে গাজায় হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এবারই প্রথম কোনো নির্বাচনে ভোট দিচ্ছে ফিলিস্তিনিরা। পশ্চিম তীরে সর্বশেষ পৌরসভা নির্বাচন হয়েছে চার বছর আগে।
ইসরায়েল আগে পিএ-র হয়ে ফিলিস্তিনিদের কাছ থেকে কর আদায় করতো; কিন্তু তারা এখন ওই করের অর্থ আর পিএ-কে দিচ্ছে না। তেল আবিবের যুক্ত হচ্ছে, পিএ ওই করের অর্থ থেকে কারাবন্দি ও ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে নিহতদের পরিবারকে নানান সুযোগ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, যা প্রকারান্তরে হামলাকেই উৎসাহিত করছে। অর্থ না থাকায় পিএ এখন প্রশাসনের কর্মীদের বেতন দিতেও হিমশিম খাচ্ছে।
ইসরায়েলের সরকার এখন সেটলারদের পশ্চিম তীরের আরও বেশি জমি দখলেও নানাভাবে উৎসাহিত করছে। তাদের উগ্র-জাতীয়তাবাদী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মতরিচ বলেছেন, “আমরা ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের চিন্তাকে ধারাবাহিকভাবে হত্যা করতে থাকবো।”
২০২৩ সাল থেকে দুই বছর ইসরায়েল গাজার বিভিন্ন এলাকায় যে ধারাবাহিক হামলা চালায় তাতে অন্য এলাকাগুলোর তুলনায় দেইর আল-বালাহ তুলনামূলক কম ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়। এখন সেখানকার অনেক ভবনে স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের ব্যানার ঝুলতে দেখা যাচ্ছে।
কিছু কিছু জায়গায় তাঁবুতেই ভোট নেওয়া হবে, বিদ্যুৎ ঘাটতি থাকায় কোথাও কোথাও দুই ঘণ্টা আগেই ভোটগ্রহণ শেষ হবে। শনিবার স্থানীয় সময় সকাল ৭টা থেকে এই ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে আল জাজিরা।
ফিলিস্তিনি নির্বাচন কমিশন গাজার বাকি অংশে ভোট না হওয়ার জন্য ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞকে দায়ী করেছে। ভূখণ্ডটির অর্ধেকের বেশি অংশ এখন ইসরায়েলের দখলে রয়েছে, বাকিটা হামাসের নিয়ন্ত্রণে।
ভোট বয়কট করেছে হামাস
প্যালেস্টিনিয়ান অথরিটি (পিএ) নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের প্রতি ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের (পিএ) করা চুক্তিকে সমর্থন করার অনুরোধ জানিয়েছিল। এর প্রতিবাদে অনেক রাজনৈতিক গোষ্ঠীই এবারের নির্বাচন বয়কট করেছে। পিএর সঙ্গে হওয়া ওই চুক্তিতে ইসরায়েল রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ও ছিল।
প্রায় দুই দশক গাজা শাসন করা হামাস আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রার্থী না দিলেও কিছু প্রার্থীর একটি তালিকা দেইর আল-বালাহ’তে ঘুরে বেড়াচ্ছে, যাদেরকে বাসিন্দারা হামাস-সমর্থিত বলে মনে করছেন।
পশ্চিম তীরসহ বেশিরভাগ জায়গাতেই সবচেয়ে বেশি প্রার্থী দিয়েছে ফাতাহ, যারা পিএ-র মেরুদণ্ড। এর বাইরে অনেকে স্বতন্ত্রভাবেও নির্বাচন করছে।
হামাস বলেছে, তারা নির্বাচনের ফলকে সম্মান জানাবে। তাদের বেসামরিক পুলিশ সদস্যদেরই গাজার ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজে লাগানো হবে বলে ভোটের আগে একাধিক ফিলিস্তিনি সূত্র রয়টার্সকে বলেছিল।
গাজার ৭০ হাজারসহ ১০ লাখের বেশি ফিলিস্তিনি এবার ভোট দিতে পারবে বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনি কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি। শনিবার রাতে বা রোববার ভোটের ফল জানা যেতে পারে।
সূত্র : বিডিনিউজ