নেতানিয়াহুর জন্য যে ৫ সমস্যার সমাধান হতে পারে ইরান যুদ্ধ

আজাদ ডেস্ক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:

ইসরায়েলের ইতিহাসে এর আগে বহু নেতা চেষ্টা করেও যা পারেননি, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সেখানে সফল হয়েছেন। চিরশত্রু ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি ও অনির্দিষ্টকালের জন্য হামলা চালাতে তিনি শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে রাজি করাতে পেরেছেন। এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ইরানে ১,৪০০ হাজারের বেশি এবং লেবাননে ১,০০০ মানুষ নিহত হয়েছে। যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার যে আশঙ্কা অনেকে করেছিলেন, তাতে আঞ্চলিক দেশগুলোতেও ডজনখানেক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।

তেলের দামের রেকর্ড বৃদ্ধিতে বিশ্ব অর্থনীতি যখন টালমাটাল, তখন খোদ যুক্তরাষ্ট্রেও ডেমোক্র্যাটসহ ট্রাম্পের কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত টাকার কার্লসন বা জো রোগানের মতো ব্যক্তিরাও এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন।

ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের তৈরি হয়েছে নজিরবিহীন কূটনৈতিক দূরত্ব। এই দূরত্ব কীভাবে ঘুচবে এবং যুদ্ধের সম্ভাব্য সমাধানই বা কী হতে পারে তা নিয়ে স্পষ্ট কোনও মতৈক্যও নেই।

তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর কাছে এসব বিষয়ের খুব কমই হয়ত গুরুত্ব পাবে। কারণ, এই যুদ্ধ তার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনের এমন পাঁচটি বড় সমস্যার সমাধান করে দিতে পারে, যা নিয়ে তিনি বছরের পর বছর ধরে হিমশিম খাচ্ছেন।

১. ইরানের হুমকি
নেতানিয়াহু দীর্ঘকাল ধরেই ইরানকে ইসরায়েল এবং বিশ্বশান্তির জন্য এক নম্বর হুমকি হিসেবে প্রচার করে আসছেন। জাতিসংঘে পোস্টার হাতে নিয়ে ইরানের পারমাণবিক গ্রাফ দেখিয়ে বিশ্বকে সতর্ক করে তিনি দাবি করেছিলেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাছে পৌঁছে গেছে, এ থেকে যে বিপদ ঘনিয়ে আসতে পারে।

তবে ইরানের সঙ্গে কোনও যুদ্ধেই জয় পেতে সক্ষম বোধ করেনি ইসরায়েল। যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ছাড়া একা ইরানের বিরুদ্ধে জয়ী হওয়া ইসরায়েলের জন্য অসম্ভব ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে না নামলে এই সমর্থন ইসরায়েল কখনও পেতও না।

গত বছর ট্রাম্প জুনে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইসরায়েলের সাথে যোগ দিতে রাজি হয়েছিলেন, কিন্তু ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পরপরই তিনি দ্রুত যুদ্ধ শেষ করার পদক্ষেপ নেন।

তবে এবার ট্রাম্প শুরু থেকেই এই যুদ্ধের অংশীদার। এই সংঘাতের ফল কী হবে তা এখনও অজানা থাকলেও, যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি ইসরায়েলের অংশীদার হিসেবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে টেনে আনতে পারাকে নেতানিয়াহু তার এক মাপের সাফল্য বলেই বোধ করবেন।

এমনকি এই যুদ্ধ যদি ইরান সরকারের পতন যদি নাও ঘটে, তারপরও ইসলামিক প্রজতন্ত্রের এই দেশটি যদ্ধের কারণে দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে ইসরায়েলের জন্য কম হুমকি হয়ে থাকতে পারে ইরান।

ইরানের আঞ্চলিক ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ এর ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায়, যার মধ্যে লেবাননের হিজবুল্লাহর ওপর ব্যাপক হামলা এবং সিরিয়ার বাশার আল-আসাদের পতনও রয়েছে, নেতানিয়াহু এখন যুক্তি দিতে পারেন যে, এই অঞ্চলে ইসরায়েলের ভয় করার মতো কেউ নেই এবং ইসরায়েলই নির্বিবাদে আধিপত্য বিস্তারকারী রাষ্ট্র।

২. নেতানিয়াহুর দুর্নীতি মামলা
২০১৯ সাল থেকে তিনটি দুর্নীতির মামলায় বিচারের মুখোমুখি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের শুরু থেকেই অভিযোগ ছিল যে, নেতানিয়াহু বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত এবং দূরে ঠেলে রাখার চেষ্টা করছেন। যুদ্ধের অজুহাত দিয়ে তিনি বারবার শুনানি পেছানো এবং আদালতের হাজিরা এড়িয়ে চলার যৌক্তিকতাকে কাজে লাগিয়েছেন।

চলতি মাসের শুরুতে নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সেই আগের আহ্বানের পুনরাবৃত্তি করে ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের কাছে তাকে ক্ষমা করার অনুরোধ জানান। এতে তিনি বিচার এড়াতে পারবেন এবং দোষী সাব্যস্ত হলে যে ১০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে তা থেকেও মুক্তি পাবেন।

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বাড়তে থাকার মধ্যেও তিনি এই পরিস্থিতির অজুহাত খাড়া করতে ছাড়েননি। যুদ্ধ শুরু হওয়ার ১২ দিন পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে নেতানিয়াহু তার বিরুদ্ধে আইনি কার্যক্রমকে একটি ‘উদ্ভট সার্কাস’ বলে অভিহিত করেন।

তিনি বলেন, হারজগের উচিত ‘সঠিক কাজ’ করা এবং মামলাটি গুটিয়ে নেওয়া, যাতে তিনি (নেতানিয়াহু) যুদ্ধে এবং আঞ্চলিক কূটনীতিতে পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারেন।

১২ মার্চ তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “তাকে (হারজগ) ইসরায়েল রাষ্ট্রকে এবং আমাকে সময় দিতে হবে যাতে প্রয়োজনীয় কাজগুলো করা যায়, শুধু শত্রুদের পরাজিত করাই নয়, বরং আমাদের অঞ্চলে শান্তি, সমৃদ্ধি ও মৈত্রীর বিশাল সুযোগ তৈরি করাও আমার লক্ষ্য। আমি সম্পূর্ণ ভারমুক্ত থাকতে চাই।”

তবে ওই একই সপ্তাহের শুরুর দিকে ইসরায়েলের বিচার মন্ত্রণালয় বলেছে যে, নেতানিয়াহুর বিচার চলাকালে তাকে ক্ষমা করা ঠিক হবে না।

৩. বিচার বিভাগীয় সংস্কারের বাধা
বিচার বিভাগীয় সংস্কারের নামে আদালতের ক্ষমতা কমিয়ে সরকারের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর যে চেষ্টা নেতানিয়াহু ও তার কট্টরপন্থি সহযোগীরা করছিলেন, তা বছরের পর বছর ধরে বিরোধীরা প্রত্যাখ্যান করে আসছিল।

২০২২ সালের নির্বাচনের পর লাখ লাখ ইসরায়েলি এই প্রচেষ্টাকে ‘অভ্যুত্থান’ আখ্যা দিয়ে রাজপথে বিক্ষোভ করেছিল। তবে ২০২৩ সালে ৭ অক্টোবরে গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর সেই আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে।

আর এখন ইরান যুদ্ধ বাড়তে থাকার মধ্যেও নেতানিয়াহু ওই পথ থেকে সরে আসেননি, বরং এই যুদ্ধের ডামাডোলের সুযোগে তিনি বিতর্কিত আইন পাস করার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

মার্চের মাঝামাঝি সময়ে নেতানিয়াহুর জোট সংসদে এমন একটি আইন পাসের চেষ্টা শুরু করে যা অ্যাটর্নি জেনারেলের ক্ষমতা খর্ব করবে এবং সংবাদমাধ্যমের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ বাড়াবে। এছাড়া, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরে ইসরায়েলে হামাসের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতা তদন্তেও একটি রাজনৈতিক প্যানেল গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

বিরোধী নেতা ইয়ার লাপিদ অভিযোগ করেছেন যে, জোট সরকার যুদ্ধের সময়ও নিজেদের উগ্র এজেন্ডা বাস্তবায়ন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে টাকা চুরি করছে। তিনি বলেন, “পুরো দেশ যখন একসাথে দাঁড়িয়ে আছে, তখন জোট সরকার তাদের চরমপন্থি কর্মসূচি প্রচার করছে এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অর্থ চুরি করছে।”

৪. ফিলিস্তিনিদের প্রতি আচরণের সমালোচনা
যুদ্ধের আবহে ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরায়েলের আচরণ নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনা অনেকটা আড়ালে চলে গেছে।

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি সহিংসতা বহুগুণ বেড়েছে। উপরন্তু গাজায় ইসরায়েলের আরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ হওয়ার পরও বিশ্ব গণমাধ্যমের বড় অংশের দৃষ্টি এখন ইরান যুদ্ধের দিকে।

গত ১১ মার্চ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্য পশ্চিম তীরে সহিংসতা বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছিল। সেখানে ইসরায়েল ইরানে হামলার পর থেকে ৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছিল। তবে সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে এবং নিহতের সংখ্যা বর্তমানে ১১ জনে দাঁড়িয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত পশ্চিম তীরে ১,০০০ এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে।

পশ্চিম তীরে নিহতদের মধ্যে তমুনের বানি ওদেহ পরিবারের চার সদস্য রয়েছেন, মা ও বাবা ওয়াদ ও আলী এবং তাদের দুই শিশু মোহাম্মদ (৫) ও ওসমান (৭)। ১৫ মার্চ ইসরায়েলি সেনারা তাদের গুলি করে হত্যা করে, যা আন্তর্জাতিক নিন্দার শিকার হলেও কোনো প্রতিকার মেলেনি।

গাজায় দুই বছর ধরে চলা যুদ্ধের পর পরিস্থিতি এখনও ভয়াবহ। গত বুধবার জাতিসংঘ আবারও ইসরায়েলকে যুদ্ধের বিধিনিষেধ শিথিল করা এবং ত্রাণ প্রবেশের অনুমতি দিতে বলেছে।

ফিলিস্তিনি শরণার্থী বিষয়ক জাতিসংঘ সংস্থার প্রধান ফিলিপ লাজারিনি সতর্ক করেছেন যে, ইসরায়েলি সেনাদের দায়মুক্তির সঙ্গে এমন কাজগুলো এখন স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ইরান যুদ্ধের কারণে গাজায় ত্রাণ পৌঁছানোর প্রতিশ্রুতিতে এখন বিশ্ববাসীর আর নজর নেই বললেই চলে।

৫. নির্বাচন ও পরাজয়ের ভয়
দুর্নীতি কেলেঙ্কারি এবং ৭ অক্টোবরের ব্যর্থতার দায়ে অভিযুক্ত নেতানিয়াহু চলতি বছরের শেষ দিকে হতে যাওয়া নির্বাচনে পরাজয়ের ঝুঁকিতে ছিলেন। একটি জরিপে দেখা গিয়েছিল তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে আছেন।

তবে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর তার ওপর জনগণের আস্থা বেড়েছে। মাআরিভ পত্রিকার একটি সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, যুদ্ধ পরিচালনায় নেতানিয়াহুর ওপর জনগণের আস্থা শুরুর ৬০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নিজেকে একজন ‘শক্তিশালী যুদ্ধকালীন নেতা’ হিসেবে তুলে ধরে নেতানিয়াহু বছরের মাঝামাঝি সময়ে আগাম নির্বাচন ডেকে পুনরায় জয়ী হওয়ার পরিকল্পনা করছেন।

সূত্র : বিডিনিউজ

এলাকার খবর

সম্পর্কিত