পাকিস্তান-আফগানিস্তানের সংঘাত কত দূর গড়াবে?

আজাদ ডেস্ক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
ছবি : রয়টার্স ছবি:
ছবি : রয়টার্স ছবি:

পাকিস্তান ও আফগানিস্তান গেল কয়েক মাসে কয়েকবার একে অপরকে হামলার লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে; আর প্রতিবারই তারা শান্ত হয়েছে সৌদি আরব ও তুরস্কের মতো বিদেশি শক্তির মধ্যস্থতায়।

কিন্তু নতুন করে দুই দেশের মধ্যে যে লড়াই বেঁধেছে, তার তীব্রতা কিংবা পরিধি আগের চেয়ে বেশি। ফলে এই লড়াই শেষমেশ কতদূর গড়াবে, এখন সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে।

বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের যুদ্ধ না থামাতে পারলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতাই হুমকির মুখে পড়তে পারে। এজন্য দুই রাষ্ট্রকে সমঝোতার পথে হাঁটার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

ব্রাসেলসভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের এশিয়া অঞ্চলের উপদেষ্টা সামিনা আহমেদ বলেন, “পাকিস্তান এটা স্পষ্ট করেছে যে, আফগানিস্তান যদি তাদের মাটিতে তেহরিক-ই তালেবান পাকিস্তানকে (টিটিপি) মদদ দেয়, তাহলে ইসলামাবাদ পদক্ষেপ নেবে।

‘ফলে ইসলামাবাদ ও কাবুলের উচিত হবে, তুরস্ক, কাতার ও সৌদি আরবের মতো বিশ্বস্ত মধ্যস্থতাকারীদের নিয়ে অবিলম্বে আলোচনায় বসা।’

নতুন সংঘাতের সূত্রপাত যেভাবে
বৃহস্পতিবার গভীর রাতে পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী এলাকায় হামলা চালায় আফগানিস্তান। তালেবান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, তারা বৃহস্পতিবার রাতে ১৯টি পাকিস্তানি সামরিক পোস্ট এবং দুটি ঘাঁটি দখল করে নিয়েছে। ৫৫ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হওয়ার কথাও বলেছে তারা।

কাবুল বলেছে, কদিন আগে আফগানিস্তানে পাকিস্তানের চালানো বোমা হামলার প্রতিশোধ নিতে তারা এ হামলা চালিয়েছে।

আফগানিস্তানের এ হামলার কয়েক ঘণ্টা পর ‘সরাসরি যুদ্ধ’ ঘোষণা করে শুক্রবার ভোরেই কাবুল, কান্দাহার ও পাকতিয়া শহরে পাল্টা হামলা চালায় পাকিস্তান।

পাকিস্তানের দাবি, তাদের ‘অপারেশন গাজব লিল-হকে’ ২৭৪ জন আফগান তালেবান যোদ্ধা নিহত হয়েছে; আহত হয়েছে চার শতাধিক। অন্যদিকে তালেবানের হাতে নিজেদের ১২ সেনা নিহত হওয়ার তথ্য দিয়েছে ইসলামাবাদ।

 

কত দূর গড়াবে পাকিস্তান-আফগানিস্তানের সংঘাত?

পাকিস্তানের হামলার পর স্যাটেলাইট থেকে ধারণ করা কাবুলের চিত্র। ছবি: রয়টার্স।


দুই প্রতিবেশীর লড়াই কী নিয়ে
দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের চলমান এই সংঘাতকে গত কয়েক মাসের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
২০২৫ সালের অক্টোবরে সীমান্ত এলাকায় দুই দেশের মধ্যে প্রায় এক সপ্তাহ প্রাণঘাতী লড়াই চলে। এরপর কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় একটি তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয় তারা।
আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যবর্তী সীমান্তরেখাটি 'ডুরান্ড লাইন' নামে পরিচিত, যা ২ হাজার ৬১১ কিলোমিটার বিস্তৃত। আফগানিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে এই সীমান্তকে স্বীকৃতি দেয় না। তাদের যুক্তি হলো, এটি একটি ঔপনিবেশিক সীমানা, যা অবৈধভাবে দুই দেশের জাতিগত পশতুন এলাকাগুলোকে বিভক্ত করে দিয়েছে।

অন্যদিকে পাকিস্তানের অভিযোগ, টিটিপির মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে আফগানিস্তান আশ্রয় দিচ্ছে।

২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় আসার পর দুই প্রতিবেশী দেশ এই সীমান্ত এলাকায় দফায় দফায় সংঘর্ষে জড়িয়েছে।

দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার নিরাপত্তা ও কৌশলগত বিষয়ক বিশেষজ্ঞ সামি ওমারির হিসাব বলছে, ২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন ও ন্যাটো বাহিনী চলে যাওয়ার পর থেকে আফগান ও পাকিস্তানি বাহিনী ৭৫ বার সংঘর্ষে জড়িয়েছে।

২০০৭ সালে পাকিস্তানে টিটিপির আত্মপ্রকাশ ঘটে। আফগান তালেবান থেকে আলাদা একটি সংগঠন হলেও তাদের সঙ্গে টিটিপির গভীর আদর্শিক, সামাজিক ও ভাষাগত সম্পর্ক রয়েছে।

যুদ্ধ-সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা 'আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটার' দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক পার্ল পান্ডিয়া মনে করেন, আফগান তালেবান সম্ভবত টিটিপির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে অনিচ্ছুক, ‘এর একটা বড় কারণ হলো, দুই গোষ্ঠীর মধ্যকার পুরনো সখ্যতা। আরেকটি কারণ হলো, তালেবান মনে করে, টিটিপির বিরুদ্ধে কঠোর হলে তারা 'ইসলামিক স্টেট খোরাসান প্রভিন্সের' (আইএসকেএফ) দিকে ঝুঁকে যেতে পারে।”

পান্ডিয়া বলেন, “আফগান তালেবান যদি টিটিপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়, তবে সংঘাত ছড়িয়ে পড়াটা অনিবার্য হয়ে দাঁড়াবে।”


বিরোধ আছে আরো!
১৯৪৭ সালের পর থেকে পরবর্তী সংক্ষিপ্ত কিছু সময় বাদ দিলে, পাকিস্তান-আফগানিস্তান সম্পর্কে পারস্পরিক অবিশ্বাস, তিক্ততা আর শত্রুতাই দৃশ্যমান হয়েছে। কয়েক দশক কেটে গেলেও অমীমাংসিত থেকে গেছে বহু বিষয়।

বিরোধের তালিকায় আছে বাণিজ্য ও ট্রানজিটও। স্থলবেষ্টিত আফগানিস্তানে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে পাকিস্তান রুট বহুল ব্যবহৃত। তবে পাকিস্তান চায় না, ভারতের সঙ্গে আফগানিস্তানের সড়ক বাণিজ্য তৈরি হোক।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের বিশ্লেষণে বলা হয়, পশতুন ও পাঞ্জাবি নিয়ে বিভাজনও দুই প্রতিবেশীর মধ্যে দূরত্ব তৈরিতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।

সিন্ধু নদের পূর্ব ও দক্ষিণ তীরের মানুষের সঙ্গে পশতুনদের জীবনযাত্রার ঐতিহাসিক পার্থক্য রয়েছে। পশতুনদের অনেকেই মনে করেন, পাকিস্তান পাঞ্জাবিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।

২০১৮ সালে পাকিস্তান যখন খাইবার পাখতুনখাওয়ার উপজাতীয় এলাকাগুলোকে মূল শাসনব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করে, তখন আফগানরা একে অপমান হিসেবে দেখেছিল।

এ কারণে টিটিপিকে আফগান পশতুনরা তাদের আপনজন মনে করে। বর্তমানে এ টিটিপিই দুই দেশের বিবাদের অন্যতম কারণ।

দুই দেশের সম্পর্কে ‘অকৃতজ্ঞতার’ হিসাব-নিকাশও আছে।
পাকিস্তান মনে করে, সোভিয়েতবিরোধী লড়াইয়ে তারা সহায়তা না করলে আফগানিস্তান পুরোপুরি সোভিয়েতের কব্জায় চলে যেত। ইসলামাবাদ এটাও বিশ্বাস করে, তাদের সাহায্যের কারণেই তালেবানরা যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজিত করতে পেরেছে।

এসব কারণে পাকিস্তান মনে করে, কাবুলের উচিৎ ইসলামাবাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা থাকা।

কিন্তু আফগানদের মনোভাব হলো, ইসলামাবাদ যা করেছে, সেটা তাদের নিজেদের স্বার্থেই করেছে এবং সেটা করতে গিয়ে তারা আফগানদের ব্যবহার করেছে। এ কারণে কৃতজ্ঞতার প্রশ্ন তাদের কাছে অর্থহীন।


তালেবানের পাশে আর কারা?
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের লড়াই কেবল আফগান তালেবান কিংবা টিটিপির বিরুদ্ধেই নয়, সেখানে বেলুচ বিদ্রোহীরাও তাদের প্রতিপক্ষ।

আবার টিটিপির নানা শাখা সংগঠনও রয়েছে, যারা পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর কাছে ‘ফিতনা আল-খাওয়ারিহ’ নামে পরিচিত।

এছাড়া ‘ইসলামিক স্টেটের’ (আইএস) মতো সশস্ত্র সংগঠনও রয়েছে, যারা আফগান তালেবান শাসনের মিত্র হিসেবেই পরিচিত।

ইসলামাবাদের অভিযোগ, তালেবান সরকার এসব সংগঠনকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে। যদিও কাবুল এই অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে।

তালেবানের এসব মিত্র মূলত ‘ডুরান্ড লাইন’ বরাবর তৎপরতা চালায়। হামলা চালাতে তারা পাকিস্তানের ভূখণ্ডেও প্রবেশ করে।

বেলুচ বিদ্রোহীরা, বিশেষ করে বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানের জন্য আরেকটি বড় হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

গেল মাসে বিএলএ বেলুচিস্তানজুড়ে একের পর এক হামলা চালায়। তারা প্রদেশটির বেশ কয়েকটি সামরিক চৌকি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও দখল করে নিয়েছিল।

বিশ্ব নেতারা কী বলছেন?
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন আব্দুল আজিজ আল-খুলাইফি শুক্রবার পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন।

কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “দুই পক্ষ পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার উত্তেজনা কমিয়ে আনার বিষয়ে আলোচনা করেছেন।”

উভয় পক্ষকে ‘সর্বোচ্চ সংযম দেখানোর’ অনুরোধ জানিয়েছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম।

এক্স হ্যান্ডেলে তিনি লেখেন, “নিরাপত্তা নিয়ে পাকিস্তানের যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তার সমাধান করতে হবে। অন্যদিকে আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতিও সম্মান দেখাতে হবে।”

চলমান অস্থিরতা নিরসনে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সঙ্গে আলোচনা করেছে তুরস্ক সরকারও।

রয়টার্সের খবরে বলা হয়, তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান শুক্রবার পাকিস্তান, আফগানিস্তান, কাতার ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে ফোনে আলাদাভাবে কথা বলেন।

পাকিস্তান ও সৌদি আরবের শীর্ষ কূটনীতিকদের মধ্যেও সীমান্ত উত্তেজনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন।

জাতিসংঘের তরফে বলা হয়েছে, সংস্থাটির মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।

সহিংসতা বৃদ্ধি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি উভয় দেশকেই আন্তর্জাতিক আইন কঠোরভাবে মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন।

সংলাপ ও প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের মাধ্যমে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে তৈরি হওয়া দূরত্ব ঘোচানোর আহ্বান জানিয়েছে ইরান।

দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সংঘাত নিরসনে দুই দেশকে রোজার মাসে সংযম ও ইসলামি সংহতির কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন।

শুক্রবার এক্স পোস্টে তিনি বলেন, গঠনমূলক সংলাপ, পারস্পরিক বোঝাপড়া গভীর করা ও কাবুল-ইসলামাবাদের সহযোগিতা উন্নয়নে কোনো সহযোগিতা লাগলে তেহরান তা দিতে প্রস্তুত আছে।

সীমান্তে জরুরি ভিত্তিতে হামলা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে রাশিয়া।

পাকিস্তান ও আফগানিস্তান রাজি হলে সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতারও প্রস্তাবও দিয়েছে পুতিন প্রশাসন।

আফগানিস্তানে পাকিস্তানের বিমান হামলার নিন্দা জানিয়েছে ভারত।

দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছেন, “এই হামলা রোজার মাসে চালানো হয়েছে। এটি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতাকে ভিন্ন খাতে চালানোর আরেকটি চেষ্টা।”

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শুক্রবার পাকিস্তান-আফগানিস্তাননের সংঘাত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং সংবাদ সম্মেলনে বলেন, চীন নিজস্ব চ্যানেলের মাধ্যমে সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতা করছে।

ভারত কীভাবে সম্পৃক্ত?
অক্টোবরের সংঘর্ষের সময়টি বিশেষ একটি কারণে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। কারণ, ওই সময় তালেবান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি ভারতে সফরে ছিলেন।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক ইব্রাহিম বাহিসের ধারণা, ভারতে মুত্তাকির এই উচ্চপর্যায়ের সফর সম্ভবত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বড় ধরনের সামরিক অভিযানে যাওয়ার সিদ্ধান্তে ভূমিকা রেখেছে।

মুত্তাকির সফরে ভারত ও আফগানিস্তানের তরফে একটি যৌথ বিবৃতিও আসে, যেখানে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কারণে সৃষ্ট সন্ত্রাসবাদের নিন্দা জানানো হয়।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুর খবরে বলা হয়, ওই বিবৃতি আসার পর আফগান রাষ্ট্রদূতকে তলব করে ‘তীব্র আপত্তি’ জানায় ইসলামাবাদ।

গত শতাব্দির নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে কিছু দিন আগ পর্যন্তও তালেবানকে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার একটি ছায়াশক্তি হিসেবে দেখত ভারত।

আফগানিস্তানে ভারতীয় কূটনৈতিক মিশনগুলোতে প্রাণঘাতী হামলার জন্য নয়াদিল্লি এই গোষ্ঠী ও তাদের সহযোগীদের ঘাড়ে দায়ও চাপিয়েছে।

তবে তালেবানের নতুন করে ক্ষমতায় আসা এবং কাবুল-ইসলামাবাদের টানাপড়েনের প্রেক্ষাপটে নতুন আফগান নেতৃত্বের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়িয়ে দেয় ভারত, যার একটি বহিঃপ্রকাশ মুত্তাকির সফর।

আফগান কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ‘পাঠান ভাইয়ের’ ভিডিওর বরাতে আরেক ভারতীয় সংবাদমাধ্যম 'ইন্ডিয়া টুডে' ওই সময় লিখেছিল, “মুত্তাকির দিল্লি সফর নিয়ে পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম রীতিমতো ক্ষুব্ধ।”

সামরিক শক্তিতে কার দৌড় কতটুকু
লন্ডনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান 'ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের' (আইআইএসএস) ‘মিলিটারি ব্যালেন্স ২০২৫’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংখ্যার বিচারে দুই দেশের সামরিক শক্তির ব্যবধান আকাশ-পাতাল।

সামরিক অভ্যুত্থান ও সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী দেশটির সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। দেশটির রাজনীতিতেও তাদের ব্যাপক আধিপত্য।

পাকিস্তান একটি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী ও মেরিন কোর মিলিয়ে দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বেশ শক্তিশালী।

আইআইএসএসের তথ্যমতে, এসব সামরিক বাহিনীতে ৬ লাখ ৬০ হাজারের মতো সক্রিয় সেনা রয়েছে। পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী মিলিয়ে আছে আরও প্রায় ৩ লাখ।

তাদের এসব বাহিনীর শক্তি বাড়িয়ে তুলেছে আধুনিক সমরাস্ত্র, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি এফ-১৬ যুদ্ধবিমানও রয়েছে। পাকিস্তানের বহরে আছে ফ্রান্সের তৈরি ‘মিরাজ’ যুদ্ধবিমানও। চীনের সঙ্গে যৌথভাবে উৎপাদিত ‘জেএফ-১৭’ যুদ্ধবিমানও আছে তাদের বহরে।

এর বিপরীতে আফগানিস্তানের আছে কেবল একটি ঐক্যবদ্ধ বাহিনী— তালেবান। দুই লাখের কম জনবল নিয়ে গঠিত তালেবানের সামরিক কাঠামোতে কার্যত কোনো বিমানবাহিনী নেই।

আকাশযান বলতে তাদের হাতে আছে সোভিয়েত আমলের কয়েকটি সামরিক হেলিকপ্টার ও মালবাহী উড়োজাহাজ। তবে কুয়াডকপ্টার ড্রোন ব্যবহার করে তারা।

আফগানিস্তানের সামরিক সক্ষমতা তুলে ধরতে গিয়ে সিঙ্গাপুরভিত্তিক সামরিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এস. রাজারত্মম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক আবদুল বাসিত বলেন, “ড্রোন হচ্ছে গরিব দেশের বিমানবাহিনীর মতো। আফগান তালেবানের কাছে ড্রোন আছে; আর আছে আত্মঘাতী বোমারু।”

প্রতিবেশীদের মতো ভারী অস্ত্রশস্ত্র না থাকলেও তালেবানের বড় সামরিক শক্তি হলো, 'গেরিলা যুদ্ধকৌশল'। কঠোর আদর্শিক চর্চা ও ধর্মীয় অনুশাসনও তাদের শক্তি বাড়িয়েছে।

এরপর কী?
কোনো কোনো বিশ্লেষক মনে করেন, আফগানিস্তানে টিটিপির উপস্থিতি নিয়ে পাকিস্তানের উদ্বেগ থাকলেও বড় পরিসরে যুদ্ধ বাঁধার আশঙ্কা খুব একটা নেই।

কারণ হিসেবে তারা বলছেন, পাকিস্তানের তুলনায় আফগানিস্তান সামরিক শক্তিতে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। এছাড়া উভয় পক্ষই উত্তেজনা কমাতে আগ্রহী।

এরই মধ্যে আফগানিস্তানের তরফে বলা হয়েছে, তারা পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সংঘাতের নিরসন চায়।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, আপাতত বড় সংঘাত না হলেও অদূর ভবিষ্যতে দুই দেশের সীমান্ত এলাকা উত্তপ্ত থাকার আশঙ্কাই বেশি।

কারণ হিসেবে তারা বলছেন, ইসলামাবাদ বার্তা দিয়েছে যে, তাদের নিরাপত্তা বাহিনীকে নিশানা বানাতে যারা সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানে প্রবেশ করবে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখবে।

গবেষক আবদুল বাসিত মনে করেন, “সামনে বিপজ্জনক সময় অপেক্ষা করছে।”

তার মতে, আফগানদের পক্ষ থেকে পাল্টা হামলা হলে তা পাকিস্তানের শহরাঞ্চলেই হবে।

“এ ধরনের পাল্টা হামলা হলো বিশৃঙ্খলা তৈরির একটি ‘রেসিপি’। আর বিশৃঙ্খলাই সন্ত্রাসীদের নেটওয়ার্কগুলোর বিকাশের ক্ষেত্র তৈরি করে দেয়।”

সূত্র : বিডিনিউজ

এলাকার খবর

সম্পর্কিত