শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারিতে ১,৪৯৬ কোটি টাকা জরিমানা, সালমান-শিবলীসহ অনেকে নিষিদ্ধ

আজাদ প্রতিবেদক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:

সব জরিমানার কত টাকা আদায় হয়েছে, কতগুলো সিদ্ধান্ত আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে, সেসব তথ্য দেওয়া হয়নি।

শেয়ারবাজারে অনিয়ম, কারসাজি ও বিতর্কিত লেনদেনের ঘটনায় বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে মোট ১ হাজার ৪৯৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা জরিমানা করার তথ্য জাতীয় সংসদকে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের পর পুনর্গঠিত বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ১২টি আলোচিত বিষয়ে অনুসন্ধান ও তদন্ত চালিয়েছে।

এসব তদন্তের ভিত্তিতে সাবেক বিএসইসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম, সাবেক কমিশনার শামসুদ্দিন আহমেদ, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠী ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠকে সিরাজগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. সেলিম রেজার প্রশ্নের জবাবে এ তথ্য দেন অর্থমন্ত্রী। ওই সংসদ সদস্য জানতে চান, ‘বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে পুকুরচুরিতে ধ্বংসপ্রাপ্ত পুঁজিবাজার’ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং শক্তিশালী পুঁজিবাজার গঠনে বর্তমান সরকারের পদক্ষেপ কী।

জবাবে মন্ত্রী বলেন, “বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে পুকুরচুরিতে ধ্বংসপ্রাপ্ত পুঁজিবাজার কেলেঙ্কারিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।”

২০২৪ সালের ৫ অগাস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিএসইসির চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ হয়। পরে কমিশনের নেতৃত্বে পরিবর্তন আনা হয়।

সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সরকার পরিবর্তনের পর নতুন কমিশন পাঁচ সদস্যের একটি অনুসন্ধান ও তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটি ১২টি বিষয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে প্রতিবেদন জমা দেয়। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নিষেধাজ্ঞা, জরিমানা এবং বিভিন্ন অভিযোগ দুদকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

শিবলী, সালমান ও শায়ানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বেক্সিমকো গ্রিন সুকুক আল ইস্তিসনা বন্ড সংক্রান্ত তদন্তে শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামকে আজীবনের জন্য বাংলাদেশের পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রমে অংশগ্রহণে নিষিদ্ধ ও অযোগ্য (পারসোনা নন গ্রাটা) ঘোষণা করা হয়েছে।

সাবেক বিএসইসি কমিশনার শামসুদ্দিন আহমেদকে পাঁচ বছরের জন্য একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।

তদন্তে দুর্নীতি ও সম্ভাব্য অর্থপাচারের অভিযোগ পাওয়ায় বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানো হয়েছে বলে তথ্য দেন মন্ত্রী।

আইএফআইসি গ্যারান্টিড শ্রীপুর টাউনশিপ গ্রিন জিরো কুপন বন্ড সংক্রান্ত তদন্তে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানকে আজীবন পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রমে অংশগ্রহণে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাকে ১০০ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

একই ঘটনায় তার ছেলে এবং আইএফআইসি ব্যাংকের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমানকে আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি ৫০ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

আইএফআইসি ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ আলম সরওয়ারকে পাঁচ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। আইএফআইসি ইনভেস্টমেন্টের সাবেক প্রধান নির্বাহী ইমরান আহমেদের বিরুদ্ধে পাঁচ বছরের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এমার্জিং ক্রেডিট রেটিং লিমিটেডকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। কোয়েস্ট বিডিসি লিমিটেড সংক্রান্ত তদন্তে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি এলআর গ্লোবাল বাংলাদেশ লিমিটেডের মিউচ্যুয়াল ফান্ড ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বাতিল করা হয়েছে। কোম্পানির প্রধান নির্বাহী রিয়াজ ইসলামের বিরুদ্ধে আজীবন নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। ওই ঘটনাতেও দুর্নীতি ও সম্ভাব্য অর্থপাচারের অভিযোগ দুদকে পাঠানো হয়েছে।

ফরচুন শুজ লিমিটেড সংক্রান্ত তদন্তে আইসিবির অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সমবায় অধিদপ্তরের ডেপুটি রেজিস্ট্রার আবুল খায়ের হিরুর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানোর তথ্য সংসদে জানান অর্থমন্ত্রী। ওই ঘটনার বিষয়েও দুদককে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

সংসদে দেওয়া তথ্যে দেখা যায়, কয়েকটি আলোচিত তদন্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি। রিং শাইন টেক্সটাইলস, কপারটেক ইন্ডাস্ট্রিজ, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ এবং এবিজি লিমিটেড (বসুন্ধরা গ্রুপ) সংক্রান্ত প্রতিবেদন কমিশনের বিবেচনায় রয়েছে। বেস্ট হোল্ডিংসের আইপিও অনুমোদনসংক্রান্ত বিষয়ে আদালতের স্থগিতাদেশ থাকায় বিএসইসির তদন্ত কার্যক্রমও স্থগিত রয়েছে। আল-আমিন কেমিকেল ইন্ডাস্ট্রিজ, এমেরাল্ড অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ এবং সোনালী পেপার অ্যান্ড বোর্ড মিলসের বিষয়ে শুনানি ও পুনঃশুনানির প্রক্রিয়া চলছে।

দুই বছরে ১১৪ অনুসন্ধান, ৬৭৫ ‘এনফোর্সমেন্ট’
অর্থমন্ত্রী সংসদকে জানান, ১৩ মে ২০২৬ পর্যন্ত শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি ও বাজার কারসাজি নিয়ে ১১৪টি অনুসন্ধান, ১২টি তদন্ত এবং ৬৪টি পরিদর্শন সম্পন্ন হয়েছে। এ সময় ৬৭৫টি এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে এবং ১৬টি বিষয় তদন্তের জন্য দুদকসহ বিভিন্ন সংস্থায় পাঠানো হয়েছে। বাজার কারসাজির অভিযোগে বেক্সিমকো লিমিটেড, আবুল খায়ের হিরু ও সংশ্লিষ্টদের ৭০০ কোটি ৬৩ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

এছাড়া মিথ্যা তথ্য দেওয়া ও জালিয়াতির অভিযোগে সালমান এফ রহমান ও আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমানকে মোট ১৫০ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

সংসদে দেওয়া তথ্যে জরিমানার অঙ্ক, নিষেধাজ্ঞা এবং দুদকে পাঠানো অভিযোগের বিস্তারিত থাকলেও এসব জরিমানার কত টাকা আদায় হয়েছে, কতগুলো সিদ্ধান্ত আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে কিংবা দুদকে পাঠানো অভিযোগের ভিত্তিতে কতগুলো মামলা হয়েছে, সে তথ্য দেওয়া হয়নি।

তদন্তে চিহ্নিত অনিয়মের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কোনো প্রতিকার পেয়েছেন কি না, সে বিষয়েও সংসদে কোনো তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি।

সরকার পুঁজিবাজারকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের প্রধান উৎস হিসেবে গড়ে তুলতে বন্ডবাজার শক্তিশালী করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, এ লক্ষ্যে ঋণপত্রবিষয়ক বিধিমালা সংশোধন করা হয়েছে। পাশাপাশি এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড (ইটিএফ), সুকুক, কমোডিটি ডেরিভেটিভ চালু, রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করা এবং ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন ও এসএমই কোম্পানিকে বাজারে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
 

এলাকার খবর

সম্পর্কিত