যুদ্ধে ইরানের নতুন কৌশল, নতুন করে হিসাব মেলাতে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রকে

আজাদ ডেস্ক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে যৌথ অভিযান শুরু করার সময় তাদের মূল লক্ষ্য ছিল তেহরানের শাসনব্যবস্থায় দ্রুত পরিবর্তন আনা। তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে বড় ধরনের জটিলতার মুখে পড়েছে তারা।

মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, প্রত্যাশিত জনরোষ বা শাসনব্যবস্থার পতনের লক্ষণ এখনো স্পষ্ট নয়। বরং চার দিনে গড়ানো সংঘাত গোটা মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়েছে এবং ইরান পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

এ অবস্থায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের পুরোনো কৌশল নতুন করে পর্যালোচনা করতে হচ্ছে।

কৌশলগত ভুল হিসাব

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদরদপ্তর পেন্টাগন স্বীকার করেছে, যুদ্ধ স্বল্পস্থায়ী নাও হতে পারে। মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন আরও প্রাণহানির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, “এটি ইরাক নয়, এটি অন্তহীন যুদ্ধও নয়।” তবে এই বক্তব্যই ইঙ্গিত দেয়, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের সম্ভাবনা এখন আলোচনায়।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একই সুরে কথা বলেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, প্রাথমিক অভিযানে ‘শক অ্যান্ড অ’ কৌশলের প্রত্যাশিত সাফল্য না পাওয়ায় এই বক্তব্যগুলো এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন লক্ষ্য

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য এখন ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা। তিনি বলেন, “আমাদের কয়েকটি লক্ষ্য আছে। সেগুলো অর্জনে যত সময় লাগে, তত সময় নেওয়া হবে।”

এতে স্পষ্ট হচ্ছে, শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্র এখন কিছুটা হলেও সরে এসেছে।

ইরানের নতুন যুদ্ধকৌশল

ইরান সরাসরি বড় হামলার বদলে এখন ধাপে ধাপে আঘাত হানার কৌশল নিয়েছে। তাদের লক্ষ্য শুধু ইসরায়েল নয়, বরং গোটা অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বলয়ের ওপর চাপ বাড়ানো।

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি-র অভ্যন্তরীণ সমন্বয় জোরদার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

এক ইরানি সামরিক কর্মকর্তার ভাষায়, “আমরা নেতাকে হারিয়েছি, কিন্তু আমাদের অস্ত্রের মজুত ও পরিকল্পনা অটুট রয়েছে। কয়েক মাস যুদ্ধ চালানোর সক্ষমতা আমাদের আছে।”

জ্বালানি ও বাণিজ্যে চাপ

ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে হুমকি দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করছে। এতে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়েছে। সৌদি আরব ও কাতারের বড় জ্বালানি স্থাপনা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার খবরও এসেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের লক্ষ্য সামরিক ক্ষতির চেয়েও অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা।

অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতার চেষ্টা

ইসরায়েলের আহ্বান সত্ত্বেও ইরানে বড় কোনো গণঅভ্যুত্থান হয়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প কুর্দি নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।

ইরানি কর্মকর্তারা এই কৌশল নাকচ করে দিয়েছেন এবং কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর ওপর নজরদারি জোরদারের কথা জানিয়েছেন।

বৃহত্তর সংকটের দিকে

এই সংঘাত এখন কেবল ইরান-ইসরায়েল দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নেই। এটি যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক নিরাপত্তা বলয় ও বৈশ্বিক বিশ্বাসযোগ্যতারও পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের কৌশল হলো যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করে ব্যয় ও ঝুঁকি বাড়ানো। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়বে এবং আলোচনার টেবিলে তেহরানের দর-কষাকষির ক্ষমতা শক্তিশালী হবে।

শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের গতিপথ নির্ধারিত হবে সামরিক জয়ের মাধ্যমে নয়, বরং কে কতটা মূল্য দিতে বাধ্য হচ্ছে—সেই ভারসাম্যের ওপর।

এলাকার খবর

সম্পর্কিত