মহিলা এশিয়ান কাপ : অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার আগে বাটলারের রুদ্রমূর্তি

ক্রীড়া প্রতিবেদক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:

নারী এশিয়ান কাপ খেলতে অস্ট্রেলিয়া রওনা দেওয়ার আগের সংবাদ সম্মেলনে পিটার জেমস বাটলার ধরা দিলেন বিস্ফোরক ভঙ্গিতে। প্রস্তুতির কমতি, প্রস্তুতি ম্যাচ খেলতে না পারা নিয়ে ক্ষোভ ঝাড়লেন। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) কর্তাদের পেশাদার মনোভাবে ঘাটতিকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করলেন। রাগ-ক্ষোভ-উষ্মা প্রকাশের ফাঁকে টুর্নামেন্টের লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলের কোচ জানালেন, পরিস্থিতি বুঝে খেলার পরিকল্পনাও।

আগামী ১ মার্চ অস্ট্রেলিয়ায় শুরু হবে এশিয়ার নারী ফুটবলের সর্বোচ্চ আসর। ‘বি’ গ্রুপে বাংলাদেশের সঙ্গী চীন, উত্তর কোরিয়া ও উজবেকিস্তান। এদের মধ্যে চীন প্রতিযোগিতার নয়বারের চ্যাম্পিয়ন, উত্তর কোরিয়া শিরোপা স্বাদ পেয়েছে তিনবার। শক্তি-ঐতিহ্যে চীন ও উত্তর কোরিয়া থেকে যোজন যোজন মাইল পিছিয়ে বাংলাদেশ। আরেক প্রতিপক্ষ উজবেকিস্তানও (৪৯তম) ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের (১১২তম) চেয়ে ঢের এগিয়ে।

এই প্রথম মেয়েদের এশিয়ান কাপে খেলবে বাংলাদেশ। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, মাঠের লড়াইয়ের জন্য কতটা প্রস্তুত আফঈদা-ঋতুপর্ণারা। গত জুলাইয়ে দাপটের সাথে এশিয়ান কাপের বাছাই পেরুনোর পর মাত্র চারটি ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ। সবশেষটি গত ২ ডিসেম্বরে, ঢাকায় আজারবাইজানের বিপক্ষে।

বৃস্পতিবার রাতে রওনা দিয়ে শুক্রবার অস্ট্রেলিয়া পৌঁছাবে বাংলাদেশ দল। ৩ মার্চ চীনের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে গ্রুপ পর্ব শুরু করার আগে সেখানে ক্যাম্প করবেন বাটলার। অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় একটি দলের সাথে একটি প্রীতি ম্যাচও খেলার কথা রয়েছে। ম্যাচটি হলে সেটি হবে চার মাসের মধ্যে মেয়েদের প্রথম প্রীতি ম্যাচ খেলতে নামা!

বাটলারের মূল ক্ষোভও এখানেই। বাছাই পেরুনোর পর বাফুফের কাছে এশিয়ান কাপের প্রস্তুতি, প্রীতি ম্যাচ নিয়ে নিজের চাওয়াটা আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছিলেন এই ইংলিশ কোচ। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, জাপান, ফিলিপাইন-এমন সব দেশে কখনও ক্যাম্প করার কথা, কখনও তাদের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ খেলার আশাবাদ জানিয়েছিল বাফুফে, কিন্তু তা কথার কথাই থেকে গেছে। তাই বাফুফের নারী উইংয়ের চেয়ারম্যান মাহফুজা আক্তার কিরণের পাসে বসে সংবাদ সম্মেলনে ক্ষোভ উগরে দিলেন বাটলার, ‘বেশি বিস্তারিত না বলে আমি শুধু এটাই বলব যে, যেকোনো টুর্নামেন্টে খেলার আগে আপনাকে প্রস্তুতি নিতে হবে। প্রস্তুতিই সব। আপনি হুট করে কিছু করতে পারেন না। মালয়েশিয়ার সাথে আমাদের খেলা না হওয়ার কারণ মিস কিরণ (নারী কমিটির প্রধান) ভালো জানেন। আমরা যে তারিখগুলো দিয়েছিলাম বা চিঠি আদান-প্রদান হয়েছিল, সেগুলোর সাথে লিগের তারিখের মিল ছিল না। কারণ প্রস্তুতির চেয়ে লিগ বেশি অগ্রাধিকার পেয়েছিল। ফিলিপাইনের বিপক্ষে ১৯ ফেব্রুয়ারি খেলার কথা ছিল এবং ১৪ ফেব্রুয়ারি দলের দেশ ছাড়ার কথা ছিল। কিন্তু লিগের তারিখ পেছানোর ফলে আমাদের ১০ এবং ১৩ ফেব্রুয়ারি দুটি প্রস্তুতি ম্যাচের আদলে নিজেদের মধ্যে ম্যাচ খেলতে হয়েছে। ১০ এবং ১৩ ফেব্রুয়ারি ম্যাচ খেলে কীভাবে ১৯ ফেব্রুয়ারি ফিলিপাইনের বিপক্ষে খেলতে পারেন? মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রেও তাই, তারিখগুলো ভুল ছিল এবং লিগের সাথে সাংঘর্ষিক ছিল।’

জাপানে প্রীতি ম্যাচ না হওয়ার কারণ হিসেবে মাহফুজা আক্তার কিরণ জানান, জাপানের ঠাণ্ডা আবহাওয়ার কথা। বাটলার অবশ্য সরাসরি এ যুক্তি খণ্ডনে গেলেন না। তবে বাফুফের অপেশাদারিত্বের দিকটি তিনি তুলে ধরলেন বিস্ফোরক সব শব্দে, ‘হয়তো বাফুফের সবাই এই স্তুরের ফুটবল বোঝে না। আমার মা সবসময় বলতেন- ‘যত কম কথা, তত কম ঝামেলা।’ কিন্তু মাঝেমধ্যে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করার জন্য মুখ খুলতেই হয়। প্রস্তুতি নিয়ে অনেক মিথ্যাচার করা হয়েছে। খুব বেশি কিছু বলব না, তবে বাস্তবতা হলো—প্রস্তুতি আদর্শ মানের হয়নি। কাউকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দোষারোপ করছি না। আমাদের একটি পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু সেটি কাজে লাগেনি। আমি একজন বাস্তববাদী মানুষ এবং এই দলের জন্য আমিই দায়বদ্ধ। তবে তখনই দায়ভার নেব, যখন মানুষ মিডিয়ায় গিয়ে এটা বলা বন্ধ করবে যে- সবই ‘বাটলারের পরিকল্পনা’ বা ‘বাটলারের দোষ।’ আমি লাইবেরিয়া, বতসোয়ানা, ইংল্যান্ড এবং মালয়েশিয়ার মতো অনেক আন্তর্জাতিক দল পরিচালনা করেছি; আমি কারো হাতের পুতুল নই। সবসময় সংবাদমাধ্যম এবং খেলোয়াড়দের সাথে সত্য ও সততার পথে চলব। তবে এখনকার বাস্তবতায় সময়ের সঠিক ব্যবহার করাটাই সবচেয়ে জরুরি এবং আমাদের হাতে থাকা সময়ের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করতে হবে ‘

গ্রুপ পর্বের তিন শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষের কৌশল সাজানো নিয়েও সাবধানী বাটলার। তরুণদের উপর তিনি আস্থা রাখছেন। তবে, বাস্তবের জমিনে থেকে, পরিস্থিতি বুঝে খেলার পরিকল্পনার কথাও বললেন ওয়েস্ট হ্যাম ইউনাইটেডের এই সাবেক ফুটবার, ‘না, আক্রমণাত্মক ছকে থাকব না, কিছুটা পরিবর্তন ও পরিমার্জন করতে হবে। এ নিয়ে কিছুটা কাজ করছি, যদিও হাতে খুব বেশি সময় ছিল না—সেটি আবারও বলছি। তবে এ নিয়ে অভিযোগ করছি না। সবচেয়ে বড় কথা হলো, আমার মনে হয় প্রতিক্রিয়াশীল হওয়ার চেয়ে প্রোঅ্যাক্টিভ হওয়া ভালো। হয়তো কৌশলে কিছু পরিবর্তন আনব এবং দলে কিছুটা গতি বাড়ানোর চেষ্টা করব। দলের প্রায় ৪৮ শতাংশ খেলোয়াড়ের বয়স ২০ বছরের নিচে এবং তাদের মানসিকতা বেশ আক্রমণাত্মক; আমি চাই না তারা সেই ধারা থেকে বেরিয়ে আসুক। একই সঙ্গে, আমাদের দায়িত্ব এবং বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কেও আমি সচেতন। আমাদের লক্ষ্য হলো বিধ্বস্ত না হয়ে একটি গ্রহণযোগ্য ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক পারফরম্যান্স উপহার দেওয়া। আপনি যদি কোনো বাছবিচারহীন বা ঢিলে মানসিকতা নিয়ে শীর্ষ দলগুলোকে আক্রমণ করতে যান, তবে বড় ধরণের ধাক্কা খাবেন। কারণ বড় দলগুলোর বিপক্ষে ভুল করলেই তারা কঠোর শাস্তি দেবে। আমরা অত্যন্ত মানসম্পন্ন কিছু দলের বিপক্ষে খেলতে যাচ্ছি। তাই ম্যাচ বাই ম্যাচ, পরিস্থিতি অনুযায়ী খেলতে হবে আমাদের ‘

গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য উজবেকিস্তান ম্যাচ। এই ম্যাচটির ফল অনুকূলে এলে সরাসরি অলিম্পিকসে খেলার সুযোগ পাবে দল। প্রতিযোগিতার সেরা ছয় দলের মধ্যে থাকলে খোলা থাকবে পরের নারী বিশ্বকাপে খেলার দুয়ার। বাটলার অবশ্য উজবেকিস্তানকে নিয়েও ভীষণ সতর্ক, ‘উজবেকিস্তান ম্যাচ নিয়ে যে কথাগুলো হয় আমি মনে করি এগুলো সবই অনুমাননির্ভর। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমি চাই দলটি একটি বিশ্বাসযোগ্য এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক পারফরম্যান্স দেখাক। প্রতিপক্ষ উজবেকিস্তান, কোরিয়া বা চীন যেই হোক না কেন—মনে রাখবেন উজবেকিস্তান টেকনিক্যালি অত্যন্ত দক্ষ। তাদের অবমূল্যায়ন করা বা হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যারা ভাবছেন, আমরা এখনই বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করব—তাদের বাস্তবতায় ফিরে আসা উচিত। আকাশকুসুম না ভেবে ধাপে ধাপে এগোনোই ভালো। ফুটবলে অনেক চড়াই-উতরাই থাকে। আমার কাছে বিশ্বাসযোগ্য পারফরম্যান্স হলো ফুটবল দিয়ে মানুষের মন জয় করা। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো— বল দখলে থাকা এবং না থাকা উভয় অবস্থাতেই অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও কাঠামোগত খেলা উপহার দেওয়া। কখনও কখনও জয় বা ফলাফল ফুটবলের ভেতরের দুর্বলতাগুলোকে ঢেকে দেয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী উন্নতির জন্য এমন পারফরম্যান্স প্রয়োজন, যা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা দুই বছর পর আবার কোয়ালিফাই করতে পারি। আর সেটি কেবল ধারাবাহিকতার মাধ্যমেই সম্ভব ‘

২৬ জনের দলে নতুন মুখ তিন জন- সুইডেন প্রবাসী আনিকা রানিয়া সিদ্দিকী, সবশেষ বাংলাদেশ মহিলা ফুটবল লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা আলপি আক্তার (২৯টি) ও সুরভী আক্তার আফরিন। দলে আছেন উমহেলা মারমা, চোট কাটিয়ে ওঠা নবীরন খাতুন, সুরভী আকন্দ্র প্রীতির মতো তরুণরাও। বাটলার এই নতুন ও তরুণদের দিকে তাকিয়ে আছেন আগ্রহভরে, ‘আলপি সবসময় শিরোনামে থাকলেও প্রীতিও অসাধারণ করেছে। উমহেলা ফ্যান্টাস্টিক। সে ট্রেনিংয়ে মুগ্ধ করেছে এবং দলে সম্পূর্ণ নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আমাদের অনেক তরুণ খেলোয়াড় আছে, যারা সিনিয়র খেলোয়াড়দের ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলছে। আমি মনে করি একটি প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি ও বিকাশের জন্য আলপি বা প্রীতির মতো তরুণ খেলোয়াড়দের নিয়ে আসা খুবই কার্যকর। আমার মনে হয় সব খেলোয়াড়ই শারীরবৃত্তীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিকশিত হয়। কেউ অন্যদের চেয়ে দ্রুত উন্নতি করে, কেউ থমকে যায়, আবার কেউ ঝরে পড়ে। প্রীতি তাদের মধ্যে একজন যে খুব দ্রুত সামনে এসেছিল, তারপর কিছুটা থমকে গিয়েছিল, কিন্তু এখন সে আবার অদম্য শক্তিতে ফিরে এসেছে। সে, উমহেলা, আফরিন, আলপি— আলপি অত্যন্ত ভালো করেছে। প্রশ্ন হলো আপনি তাদের কীভাবে পরিচালনা করছেন। তাদের ওপর অনেক চাপ, হয়তো এই টুর্নামেন্টটি তাদের জন্য কিছুটা দ্রুতই চলে এসেছে। তবে আমার কোনো সন্দেহ নেই যে তারা অবদান রাখবে ‘

এলাকার খবর

সম্পর্কিত