ববিতার একুশে পদক: স্বীকৃতির চেয়ে বড় যে প্রশ্নগুলো

| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:

চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ অভিনেত্রী ফরিদা আক্তার ববিতার একুশে পদক প্রাপ্তি নিঃসন্দেহে আনন্দের সংবাদ। তবে এই আনন্দের গভীরে একটি অস্বস্তিকর কিন্তু জরুরি প্রশ্ন রয়ে যায়—এতদিন পরে কেন?

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে ববিতা সাধারণ কেউ নন। তার অভিনয় একাধিক প্রজন্মের নান্দনিক রুচি গড়ে দিয়েছে, চলচ্চিত্রকে দিয়েছে নতুন ভাষা ও বিশ্বাসযোগ্যতা। তবু রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির জন্য তাকে প্রায় সারাজীবন অপেক্ষা করতে হয়েছে। এই প্রশ্ন কেবল ববিতাকে ঘিরে নয়; এটি আমাদের রাষ্ট্রীয় সাংস্কৃতিক নীতির দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।

বাংলাদেশে গুণী শিল্পীদের প্রতি রাষ্ট্রের দৃষ্টি ধারাবাহিক নয়, বরং উপলক্ষনির্ভর। আমরা শিল্পীকে স্মরণ করি তখনই, যখন তিনি অসুস্থ, নিঃসঙ্গ অথবা প্রয়াত। রাষ্ট্রীয় বড় সাংস্কৃতিক আয়োজনগুলোর অতিথি তালিকাও প্রায় পূর্বানুমেয়। সেখানে ববিতার মতো শিল্পীরা বছরের পর বছর অনুপস্থিত থেকেছেন।

একটি আইকনের নির্মাণ

১৯৬৮ সালে ‘সংসার’ চলচ্চিত্রে শিশুশিল্পী হিসেবে ববিতার অভিনয়জীবনের শুরু। জহির রায়হানের ‘জ্বলতে সুরুজ কি নিচে’ ছবির মাধ্যমে তার নাম হয় ‘ববিতা’—যে নামটি পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে স্থায়ী হয়ে যায়। পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে স্বাধীনতা-পরবর্তী রাষ্ট্রগঠনের সময় পর্যন্ত চলচ্চিত্রের রাজনৈতিক ও নান্দনিক রূপান্তরের প্রতিটি পর্যায়েই তার উপস্থিতি ছিল তাৎপর্যপূর্ণ।

তিনি বাংলা ছাড়াও হিন্দি ও উর্দু ভাষার চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন, যা তাকে উপমহাদেশের বিরল দ্বিভাষিক অভিনেত্রীদের কাতারে নিয়ে যায়। অথচ এই বহুভাষিক ও বহুসাংস্কৃতিক অবদান রাষ্ট্রীয়ভাবে কখনোই যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয়নি।

সত্তরের দশকের নায়িকা নয়, সাংস্কৃতিক প্রতীক

আমজাদ হোসেন পরিচালিত ‘নয়নমনি’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য ববিতা জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হন। পরবর্তী সময়ে তিনি টানা তিনবার এই পুরস্কার লাভ করেন।
‘টাকা আনা পাই’, ‘স্বরলিপি’, ‘আবার তোরা মানুষ হ’, ‘লাঠিয়াল’, ‘সূর্যগ্রহণ’, ‘গোলাপি এখন ট্রেনে’, ‘বসুন্ধরা’—এসব চলচ্চিত্রে তিনি নারী চরিত্রকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেন।

ববিতা হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ‘পোস্টার গার্ল’। গ্ল্যামার, ব্যক্তিত্ব ও অভিনয়ক্ষমতার বিরল সমন্বয় তাকে আলাদা করেছে। গ্রামীণ ও শহুরে—উভয় চরিত্রেই তার সাবলীলতা ছিল অনন্য। স্বাধীনতার পর বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজপড়ুয়া তরুণীদের কাছে তিনি ছিলেন আইকন; ফ্যাশন, রুচি ও আধুনিকতার প্রতীক।

বিশ্ব চলচ্চিত্রে বাংলাদেশের মুখ

তার অভিনয়জীবনের সবচেয়ে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অধ্যায় সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনি সংকেত’। অনঙ্গ বউ চরিত্রে তার সংযত ও স্বাভাবিক অভিনয় বিশ্ব চলচ্চিত্রে বাংলাদেশের শিল্পীর মর্যাদাপূর্ণ স্বাক্ষর।
বাংলাদেশের হয়ে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে জুরি বোর্ডের সদস্য হিসেবে সবচেয়ে বেশি অংশগ্রহণকারী অভিনয়শিল্পীদের একজনও ববিতা। অথচ এই সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্ব রাষ্ট্রীয় স্মৃতিতে খুব কমই গুরুত্ব পেয়েছে।

সমস্যাটি ব্যক্তিগত নয়, রাষ্ট্রীয়

প্রশ্নটি তাই কেবল ববিতাকে ঘিরে নয়; এটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক। কেন ববিতার মতো শিল্পীরা চলচ্চিত্র শিক্ষা, আর্কাইভ, সাংস্কৃতিক কূটনীতি কিংবা রাষ্ট্রীয় বড় আয়োজনের কেন্দ্র থেকে ক্রমশ দূরে সরে যান?

উত্তরটি নির্মম কিন্তু স্পষ্ট—আমাদের রাষ্ট্র শিল্পকে দেখে উৎসবের সাজসজ্জা হিসেবে, দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক পুঁজি হিসেবে নয়। যারা নীরবে, মর্যাদার সঙ্গে কাজ করে যান এবং ক্ষমতার সঙ্গে সখ্য গড়েন না, তারা রাষ্ট্রীয় তালিকায় পিছিয়ে পড়েন।

রাষ্ট্র যদি শিল্পীকে কেবল পুরস্কারপ্রাপ্তির তালিকায় সীমাবদ্ধ রাখে, কিন্তু জীবিত অবস্থায় তাদের অভিজ্ঞতা ও স্মৃতিকে প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব না নেয়, তবে সে রাষ্ট্র সাংস্কৃতিকভাবে দরিদ্রই থেকে যায়। ববিতার মতো শিল্পীরা কেবল সম্মানের দাবিদার নন; তারা আমাদের চলচ্চিত্র শিক্ষার জীবন্ত পাঠ্যপুস্তক।

স্বীকৃতি, কিন্তু আত্মসমালোচনাও জরুরি

একুশে পদক অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু এটিকে যদি ‘দায় শেষ’ বলা হয়, তবে তা হবে আরেকটি রাষ্ট্রীয় ভণ্ডামি। একটি রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক পরিপক্বতা শুধু পুরস্কারের জাঁকজমকে নয়, প্রতিফলিত হয় এই প্রশ্নে—সে তার শিল্পীদের জীবদ্দশায় কতটা সম্মান দেয় এবং কত যত্নে তাদের সৃজনশীল উত্তরাধিকার সংরক্ষণ করে।

ববিতার একুশে পদক বহু আগেই প্রাপ্য ছিল। এই দেরিতে আসা স্বীকৃতি অন্তত আমাদের মনে করিয়ে দিক—গুণী মানুষের খোঁজ মৃত্যুর পরে নয়, জীবনের মধ্যেই নেওয়া উচিত। নচেৎ আমাদের রাষ্ট্রীয় পুরস্কারের ইতিহাস বারবারই লিখবে দেরিতে জাগা বিবেকের গল্প।

বিষয়:

এলাকার খবর

সম্পর্কিত