সরকার গঠনের পর দলের নেতা-কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রাখা বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা৷ এছাড়া অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, দ্রব্যমূল্য, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ইত্যাদি চ্যালেঞ্জের কথাও বলছেন তারা
মঙ্গলবার নতুন মন্ত্রিসভা গঠন হওয়ার পরই রোজার মাস শুরু হবে৷ এই সময় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে নতুন সরকারকে৷
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সই হওয়া বিভিন্ন চুক্তি, সংস্কার, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সংবিধান সংস্কার, গণপরিষদ, উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতিসহ আরো অনেক চ্যালেঞ্জ আছে৷ ফলে নতুন যে সরকার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে তাদের চ্যালেঞ্জগুলো সাধারণভাবে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা নতুন একটি সরকারের চ্যালেঞ্জের মতো নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা৷
তারা বলছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশে এক নতুন প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে৷ নতুন এক প্রত্যাশার দুয়ার খুলেছে৷ বিএনপিকে তাই সংসদ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার বিষয় মাথায় রাখলেই চলবে না৷ তাকে গণভোটও মাথায় রাখতে হবে৷ ৬৮.০৬ শতাংশ ভোটার গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে রায় দিয়েছে৷ আর আগেই বিএনপিসহ রাজনৈতিক দলগুলো গুলো জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে৷ ফলে সরকার পরিচালনার দক্ষতাই নতুন সরকারকে উৎরে দেবে না৷ তাকে আরো বেশি কিছু ধারণ করার দক্ষতা দেখাতে হবে৷
নতুন সরকারের সামনে যত চ্যালেঞ্জ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আসলে অনেক চ্যালেঞ্জ সামনে থাকলেও আমি মনে করি সরকার গঠনের পর দলকে গোছানো বা নিয়ন্ত্রণে রাখাই হবে বিএনপি সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ৷ দলটি দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার বাইরে ছিলো৷ তৃণমূলে তাদের অনেক নেতা-কর্মী আছে, তাদের মধ্যে নানা ধরনের প্রত্যাশা আছে৷ সেই প্রত্যাশা তারা এখন পূরণ করতে চাইবে৷ সেটা সামলিয়ে দলকে সুশৃঙ্খল রাখাই হবে তাদের বড় কাজ৷ তিনি বলেন, ‘‘এখন একটি অফিসে ১০ জন লোক, তাদের সবাই যদি বিএনপি হয় তাহলে তো আর হবে না৷ তাহলে তো আগে যা ছিলো তাই হলো৷ দলের লোকজনের আকাঙ্খা পূরণ দোষের কিছু নয়৷ তবে সেজন্য একটা নীতিমালা সেট করতে হবে, চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে৷ মানুষের প্রত্যাশার জায়গা কিন্তু দুর্নীতি ও চাদাবাজী দূর করা৷ সেটা করতে না পারলে তো নতুন সরকার সংকটে পড়বে৷ আর জামায়াত ক্ষমতায় যেতে পারেনি৷ কিন্তু তারা কিন্তু আসন আর ভোটের হিসাবে অতীতের তুলনায় অনেক বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছে৷ তাই বিরোধী দল হিসাবে তারা সংসদে এবং রাজনীতিতে অনেক বড় চাপ সৃষ্টিতে সক্ষম হবে৷ বিএনপিকে সেটা মাথায় রাখতে হবে,’’ বলেন ড. সাব্বির আহমেদ৷
নতুন সরকারের জন্য অর্থনীতি একটা বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করেন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. আইনুল ইসলাম৷ তার মতে, রোজার মাসের দ্রব্যমূল্যের চ্যালেঞ্জ একদম সামনে৷ এরপর বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি- এই তিন বড় চালেঞ্জ তাদের মোকাবেলা করতে হবে৷ তিনি বলেন, ‘‘নতুন সরকারের সামনে অনেকগুলো অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ আছে৷ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কর্মসংস্থান৷ এটা করতে হলে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে৷ বিদেশিদের আস্থা অর্জন করতে না পারলে বিদেশি বিনিয়োগ আনা কঠিন হবে৷ রাজস্ব খাত খুবই দুর্বল অবস্থায় আছে৷ অ্যামেরিকা ও জাপানের সাথে চুক্তি হয়েছে তাতো দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে৷ সেটা তারা কীভাবে ডিল করবে তা দেখার আছে৷ আমরা যদি আমদানিতে তাদের সুবিধা দেই তাহলে তো সেটা আমাদের জন্য কঠিন হবে৷ তিনি বলেন, ‘‘আর মনে রাখতে হবে জামায়াতের কিন্তু বড় ধরনের উত্থান হয়েছে৷ তারা যে সংখ্যক আসন পেয়েছে তা কিন্তু অতীতের তুলনায় বহুগুণ বেশি৷ ফলে তাদের যে ধীরে ধীরে আরো উত্থান হবে সেটাও মাথায় রাখতে হবে৷’’
‘মানুষ দুর্নীতি-চাঁদাবাজির অবসান চায়’
নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ‘ভয়েস ফর রিফর্ম’ এর সহ-সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর মনে করেন, সামনে যে চ্যালেঞ্জগুলো আছে তা মোকাবেলা করতে না পারলে হয়তো আবার তরুণরা মাঠে নামবে৷ তিনি বলেন, ‘‘সাধারণ মানুষের কাছে বড় ব্যাপার হলো দুর্নীতি, চাঁদাবাজি৷ সাধারণ মানুষ এর অবসান চায়৷ পালাবদলে কিন্তু অনেক চাঁদাবাজি হয়েছে৷ এখন যেহেতু বিএনপি সরকার গঠন করতে যাচ্ছে তাই তৃণমূলে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে তাদের কঠোর অবস্থান নিতে হবে৷ আর কর্মসংস্থান একটা বড় চ্যালেঞ্জ৷’’ ফাহিম মাশরুর বলেন, ‘‘ঢাকার দুই সিটিতে ১৫টি আসনের সাতটিই কিন্তু জামায়াত ও এনসিপি পেয়েছে ৷ অতীতে বিরোধী দল কখনোই ঢাকায় এত আসন পায়নি ৷ এটা একটা বড় সিগন্যাল৷ বিএনপি যদি প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয় তাহলে কিন্তু তরুণরা আবার মাঠে নামবে৷’’
তিনি আরো বলেন, ‘‘সংস্কার প্রক্রিয়া নিয়ে একটি মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হতে পারে৷ সেটা হয়তো রাজনৈতিক সংকট তৈরি করবে৷ মনে রাখতে হবে গণভোটে ভোটাররা সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে৷ কিন্তু বিএনপি বেশ কিছু বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে৷ ফলে এটা নিয়ে আমি বড় ধরনের সংকট ও সাংবিধানিক সংকটের আশঙ্কা করছি৷ আমরা মনে করি এই নির্বাচনের পর কোনো ধরনের হামলা বা সহিংসতা হওয়া উচিত নয়৷ এরইমধ্যে কিছু অভিযোগ পাওয়া গেছে৷ বিএনপির উচিত অবিলম্বে এগুলো বন্ধ করা উচিত,’’ বলেন ফাহিম মাশরুর৷
সরকারকে প্রশ্নের মুখে রাখতে চায় বিরোধীরা
বিএনপির স্বনির্ভর বিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি বলেন, ‘‘মানুষ চাঁদাবাজি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে৷ আমি সামনে আমাদের সরকারের জন্য দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, অর্থনীতি এসব বিষয়ে চ্যালেঞ্জ দেখি৷ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতেও বড় চ্যালেঞ্জ দেখছি৷’’ তিনি বলেন, ‘‘যদি চাঁদাবাজি, দুর্নীতি বন্ধ না হয় তাহলে মানুষ বিএনপিকে ভোট দিলো কেন? এটা বন্ধ করতে হবে৷ তৃণমূলে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হলে আইনের অনুশাসন লাগবে৷ যেই এটা করুক তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে৷ আমার বাবা করলেও তাকে ছাড় দেয়া যাবে না৷’’
সংস্কার প্রশ্নে নিলোফার চৌধুরী মনি বলেন, ‘‘আমরা তো বলেছি এটা ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন হবে৷ এখন সংসদ বসবে সংসদে যাবে বিষয়গুলো৷ আলাপ আলোচনা হবে তার মধ্যমে নিশ্চয় প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন হবে৷’’
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন বলেন, ‘‘নির্বাচনের পরই আমরা ভিন্ন মতের ওপর বিরোধীদের ওপর দমন পীড়নের অভিযোগ শুনছি৷ নোয়াখালীতে ধর্ষণের অভিযোগ পেয়েছি৷ হাতিয়াতে হামলা হয়েছে৷ আরো অভিযোগ পাচ্ছি৷ বড়িঘর লুটের অভিযোগ পাচ্ছি৷ বাড়িঘরে হামলার অভিযোগ পাচ্ছি৷ এগুলো বন্ধ করাই এই সময়ে বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ৷ আমরা ১৭ বছর ধরে যে রাজনৈতিক কালচার দেখেছি, আমরা কিন্তু তার অবসান চাই৷ সেটা ফিরে আসতে আমরা দেব না৷ আমরা বিরোধী দল সংসদ এবং সংসদের বাইরে অব্যাহতভাবে প্রশ্ন করতে থাকবো৷ বিএনপি চাইলেও যেন ফ্যাসিস্ট হাসিনা হতে না পারে আমরা কিন্তু সেদিকে খেয়াল রাখব৷ বিএনপিকে আমাদের এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে,’’ বলেন তিনি৷
মনিরা শারমিন বলেন, ‘‘বাংলাদেশের মানুষ দুর্নীতি, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে৷ বিএনপির বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আছে সেখান থেকে তাদের বের হয়ে আসতে হবে৷ আর সংস্কারের পক্ষে দেশের মানুষ রায় দিয়েছে৷ তাই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংস্কার শেষ করতে হবে৷ এছাড়া অর্থনৈতিক, সামাজিক, আইনশৃঙ্খলা, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান- এসব নিয়ে তো চ্যালেঞ্জ আছেই৷
জামায়াত ও এনসিপির কয়েকজন নেতা এরইমধ্যে ছায়া সরকার গঠনের কথা বলেছেন৷ এর মাধ্যমে তারা সরকারকে জাবাবদিহিতা ও প্রশ্নের মুখে রাখতে চায়৷ ফাহিম মাশরুর একে ভালো উদ্যোগ বলে মনে করেন৷ তারা কথা, ‘‘সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখতে এটা একটা ভালো কৌশল৷’’
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ১১ দল সোমবার বিকেলে নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা, হত্যা, ধর্ষণ, হামলা ও নির্যাতন নিপীড়নের প্রতিবাদে ঢাকায় বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের ডাক দিয়েছে৷ মনিরা শারমিন বলেন, ‘‘আমরা যেকোনো অন্যায় অনিয়মের বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিবাদ জারি রাখব সব সময়৷’’
সংস্কার বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ
নতুন সংসদ সদস্যদের সাংসদ এবং গণপরিষদ সদস্য হিসাবে শপথ নেয়ার কথা রয়েছে৷ ১৮০ দিনের মধ্যে সংস্কার বাস্তবায়ন করার পর গণপরিষদের কাজ শেষ হবে৷ কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদের দাবি, ‘‘এই গণভোটের কোনো সাংবিধানিক বৈধতা নেই৷ সংবিধান পরিবর্তন হয় সংবিধানের ৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী৷ আর তা করতে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাগে৷ বিএনপির সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে৷ এখন বিএনপি যতটুকু চাইবে তার বেশি সম্ভব নয়৷ আসলে ঐকমত্য কমিশনে যা হয়েছে তা একটি রাজনৈতিক আলোচনা৷ এর কিছু বিষয়ে বিএনপি একমত হয়েছে, কিছু বিষয়ে হয়নি৷ আর অন্তর্বর্তী সরকারতো এটা নিয়ে কোনো অধ্যাদেশ জারি করেনি৷ ফলে এটা সংসদে ব়্যাটিফাই করারও প্রশ্ন নেই৷ তিনি বলেন, ‘‘বিএনপি উচ্চকক্ষে আসন বণ্টন চায় সংসদে প্রাপ্ত আসনের ভিত্তিতে৷ কিন্তু জামায়াত-এনসিপি চায় প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে৷ এটা নিয়ে একটা রাজনৈতিক সংকট হতে পারে৷ এটা নিয়ে রাজনীতি হতে পারে৷ কিন্তু বিএনপি যেসব বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে তা তো তারা বাস্তবায়ন করবে না৷’’
অন্যদিকে বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ আছে বলে মনে করেন সাবেক কূটনীতিক মেজর(অব.) এমদাদুল ইসলাম৷ তিনি বলেন, ‘‘ভারত বিরোধিতা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা বড় ইস্যু ৷ সেটাকে সামলে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে একটা ভারসাম্যমূলক সম্পর্ক তৈরি করতে হবে নতুন সরকারকে৷ চীন এবং ভারত এই দুই প্রতিবেশির সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন কীভাবে ঘাটাবে সেটাও দেখার বিষয়৷’’