নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পেলে দেশে ফিরতে প্রস্তুত সাকিব, বিচারের মুখোমুখি হতেও আপত্তি নেই

আজাদ ডেস্ক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:

বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক ও বিশ্বের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান বলেছেন, সরকার যদি তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়, তাহলে তিনি দেশে ফিরে আদালতের সব আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে প্রস্তুত। তার দাবি, তিনি কোনো অন্যায় করেননি। তাই দেশে ফিরে আইনগতভাবে নিজের অবস্থান প্রমাণ করতে চান।

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাকিব বলেন, তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলোর বিচারিক প্রক্রিয়া থেকে তিনি পালিয়ে থাকতে চান না। বরং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা হলে তিনি দেশে ফিরে আদালতে হাজির হয়ে আইনি লড়াই চালাতে আগ্রহী।

বর্তমানে শ্রীলঙ্কায় একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি টি-টোয়েন্টি লিগে খেলছেন সাকিব। সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে এখনও অবসর নেননি। বরং দেশের মাটিতে একটি বিদায়ী আন্তর্জাতিক সিরিজ খেলে ক্যারিয়ারের ইতি টানতে চান। একই সঙ্গে ২০২৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের জার্সিতে মাঠে নামার স্বপ্নও এখনও তার রয়েছে।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের আগে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন সাকিব আল হাসান। ওই বছরের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি আর দেশে ফেরেননি। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তার বিরুদ্ধে হত্যা ও দুর্নীতিসহ একাধিক মামলা দায়ের হয়।

সাকিবের ভাষ্য, দেশে ফেরার বিষয়ে তিনি অতীতেও একাধিকবার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিরাপত্তার বিষয়ে ইতিবাচক বার্তা পাওয়ার পর তিনি দেশে ফেরার উদ্দেশ্যে বিমানে উঠেছিলেন। বিমানবন্দরের লাউঞ্জ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগও করেছিলেন। কিন্তু যাত্রাপথেই তাকে ফিরে যেতে বলা হয়। ফলে তিনি দুবাই থেকে আবার যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যান। তার মতে, দীর্ঘ প্রস্তুতির পরও শেষ মুহূর্তে কেন সিদ্ধান্ত বদলে গেল, সে বিষয়ে তিনি আজও স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাননি।

তিনি আরও জানান, পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে একটি পোস্ট দেওয়ার পরও দেশে ফেরার প্রচেষ্টা ব্যাহত হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে তিনি এমন ইঙ্গিত পেয়েছিলেন যে, ওই পোস্টই তার দেশে ফেরার পথে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তবে তিনি মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত মত প্রকাশের কারণে একজন নাগরিককে দেশে ফিরতে বাধা দেওয়া উচিত নয়।

সাক্ষাৎকারে সাকিব বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তার আইনজীবীরা স্বরাষ্ট্র, আইন ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন করেছিলেন, যাতে তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলো পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু এসব আবেদনের কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব তিনি পাননি।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার আগ্রহও প্রকাশ করেন সাবেক এই অধিনায়ক। তার বিশ্বাস, আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতির একটি ইতিবাচক সমাধান সম্ভব হতে পারে।

নিজের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া হত্যা মামলার বিষয়ে সাকিব বলেন, অভিযোগের সময় তিনি বাংলাদেশে ছিলেন না; বরং কানাডার টরন্টোতে একটি ক্রিকেট ম্যাচ খেলছিলেন। তাই ওই মামলাকে তিনি ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন। একই সঙ্গে দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি।

সাকিব জানান, তদন্তের কারণে প্রায় দেড় বছর ধরে তার ব্যাংক হিসাব জব্দ রয়েছে। তিনি বলেন, দেশের সর্বোচ্চ করদাতা ক্রীড়াবিদদের একজন হিসেবে তিনি নিয়মিত কর পরিশোধ করেছেন। তদন্তের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও অনির্দিষ্ট সময় ধরে ব্যাংক হিসাব জব্দ রাখা যৌক্তিক নয় বলে তিনি মনে করেন। প্রয়োজনীয় সব তথ্য ও নথি দিতে তিনি প্রস্তুত বলেও জানান।

রাজনৈতিক পরিচয় প্রসঙ্গে সাকিব বলেন, আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলে দেশে ফেরা সহজ হতে পারে—এমন পরামর্শ তিনি বিভিন্ন মহল থেকে পেয়েছেন। তবে তিনি সেই পথে হাঁটার কোনো ইচ্ছা নেই বলে স্পষ্ট করেন। তার মতে, ব্যক্তিগত অবস্থান বদলে সুবিধা নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

সম্প্রতি দিল্লিতে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেওয়ার পর বাংলাদেশে তার খালি বাড়িতে হামলার ঘটনাও সাক্ষাৎকারে উঠে আসে। এ বিষয়ে সাকিব বলেন, ওই অনুষ্ঠানে তিনি কেবল দেশের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন নিয়ে নিজের মতামত তুলে ধরেছেন। এ জন্য তার কোনো অনুশোচনা নেই।

পারিবারিক বিষয়েও আবেগঘন মন্তব্য করেন সাকিব। তিনি বলেন, গত প্রায় দুই বছর ধরে তিনি তার মা-বাবার সঙ্গে দেখা করতে পারেননি। তার বাবা-মা বাংলাদেশেই অবস্থান করছেন। তাদের বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রেও নানা জটিলতার কথা উল্লেখ করেন তিনি। দীর্ঘদিন পরিবারের কাছ থেকে দূরে থাকাটা তার জন্য মানসিকভাবে কঠিন হলেও তিনি পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

৩৯ বছর বয়সী এই অলরাউন্ডার বলেন, এখনও তিনি বিভিন্ন দেশের ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে নিয়মিত খেলছেন এবং নিজের পারফরম্যান্সে সন্তুষ্ট। তবে বয়সের বাস্তবতা বিবেচনায় আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার নিয়ে খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে চান না। তাই নিরাপদ পরিবেশ তৈরি হলে দ্রুত দেশে ফিরে জাতীয় দলের হয়ে বিদায়ী সিরিজ খেলা এবং এরপর ২০২৭ সালের বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার স্বপ্ন পূরণ করতে চান তিনি।
 

এলাকার খবর

সম্পর্কিত