ঋতুর সাফল্যে আনন্দের সঙ্গে উচ্চশিক্ষার অনিশ্চয়তার কান্না
যে দিনটিতে একটি মেয়ের জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্নের একটি ধাপ পূরণ হওয়ার কথা ছিল, সেই দিনই তার জীবনে নেমে এসেছিল গভীর শোক। এসএসসি পরীক্ষার হলে বসে প্রশ্নের উত্তর লিখছিল ঋতু খাতুন। অথচ তখন হাসপাতালের মর্গ থেকে বাড়িতে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছিল তার বাবার মরদেহ। পরীক্ষাটা যেন নষ্ট না হয়—এই আশঙ্কায় পরিবারের সবাই বাবার মৃত্যুর খবর গোপন রেখেছিলেন তার কাছ থেকে।
পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফিরে ঋতু জানতে পারে, তার বাবা আর নেই।
নিথর বাবার মুখ দেখে শেষ বিদায় জানানোর পরও থেমে থাকার সুযোগ ছিল না। সামনে আরও পরীক্ষা। বুকের ভেতর বাবাকে হারানোর অসহনীয় শোক, চোখে পানি—তারপরও বই-খাতা খুলে বসতে হয়েছে তাকে। একে একে শেষ করেছে বাকি পরীক্ষাগুলো।
সোমবার (১০ আগস্ট) প্রকাশিত এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলে সেই লড়াইয়ের স্বীকৃতি পেয়েছে ঋতু। মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে যশোরের চৌগাছার হাকিমপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থী।
কিন্তু ফল হাতে পাওয়ার আনন্দের মধ্যেও ঋতুর মনে এখন একটি বড় প্রশ্ন—**বাবা নেই, সংসারে আর্থিক সংকট; তাহলে কি থেমে যাবে তার উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন?**
পরীক্ষার হলে ঋতু, বাড়িতে বাবার মরদেহ
ঋতু খাতুন চৌগাছা উপজেলার হাকিমপুর ইউনিয়নের হাকিমপুর গ্রামের বাসিন্দা। তার বাবা কবির হোসেন দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসারে ভুগছিলেন। মা রেহেনা খাতুনের সংসারে দুই মেয়ের মধ্যে ঋতু ছোট। বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে।
বাবার অসুস্থতার মধ্যেই চলছিল ঋতুর এসএসসি পরীক্ষা। একদিকে পরীক্ষার প্রস্তুতি, অন্যদিকে অসুস্থ বাবাকে নিয়ে উৎকণ্ঠা—দুইয়ের মধ্যেই এগিয়ে যাচ্ছিল তার দিন।
গত ১০ মে ছিল বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা পরীক্ষা। সেদিন ভোরে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান কবির হোসেন।
বাড়ি থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরের চৌগাছা শহরের ছারা পাইলট বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্রে তখন পরীক্ষা দিচ্ছিল ঋতু। মেয়ের পরীক্ষা যেন নষ্ট না হয়, সে জন্য পরিবারের সদস্যরা বাবার মৃত্যুর খবর তাকে জানাননি। এদিকে পরীক্ষার সময়ই বাবার মরদেহ পৌঁছে যায় বাড়িতে।
পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফিরে ঋতু যখন জানতে পারে বাবার মৃত্যুর খবর, তখন তার সামনে ছিল জীবনের সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতা। বাবার মুখে শেষবারের মতো হাত রেখে বিদায় জানাতে হয়েছে তাকে। তারপর আবারও ফিরতে হয়েছে পড়ার টেবিলে।
‘বাবা বেঁচে থাকলে সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন’
ফল প্রকাশের পর ঋতুর কণ্ঠে সাফল্যের উচ্ছ্বাসের চেয়ে বাবাকে হারানোর শূন্যতাই যেন বেশি স্পষ্ট। ঋতু বলে, “বাবা বেঁচে থাকলে আজ সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন। আমার এই ফল দেখে তিনি গর্ব করতেন।”
একজন সন্তানের কাছে বাবার সাফল্যের মুহূর্তে পাশে থাকার যে স্বপ্ন, ঋতুর জীবনে সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই থেমে গেছে। জিপিএ-৫ হাতে পেয়েও তাই আনন্দটা পুরোপুরি উপভোগ করতে পারছে না সে।
তার সামনে এখন আরও বড় অনিশ্চয়তা—উচ্চশিক্ষা।
বাবাকে হারানোর পর সংসারে আর্থিক সংকট আরও প্রকট হয়েছে। ঋতু জানায়, পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা তার প্রবল, কিন্তু অর্থের অভাবে সেই পথ কতটা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে, তা নিয়ে সে দুশ্চিন্তায় আছে।
মেধা ও মনোবলকে কোনো কিছুই দমিয়ে রাখতে পারেনি
হাকিমপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সিনিয়র সহকারী শিক্ষক শাহানা খাতুন বলেন, ঋতু অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থী। তার ভালো ফল করার বিষয়ে শিক্ষকরা আগে থেকেই আশাবাদী ছিলেন। তিনি বলেন, বাবার অসুস্থতা, পারিবারিক দরিদ্রতা কিংবা মানসিক বিপর্যয়—কোনো কিছুই তার মেধা ও মনোবলকে দমিয়ে রাখতে পারেনি।”
শিক্ষক শাহানা খাতুনের মতে, ঋতুর সামনে আরও অনেক দূর যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু আর্থিক সংকট যেন তার সেই পথের বাধা না হয়ে দাঁড়ায়, সেদিকে সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের এগিয়ে আসা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ঋতুর জন্য শিক্ষা বৃত্তির ব্যবস্থা করা গেলে উচ্চশিক্ষার পথ অনেক সহজ হবে।
পাশে থাকার আশ্বাস উপজেলা প্রশাসনের
ঋতুর সাফল্যের খবরকে আনন্দের বলে উল্লেখ করেছেন চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা ইসলাম। তিনি বলেন, “প্রতিকূলতার মধ্যেও ঋতু যে ফল করেছে, তা সত্যিই অনুকরণীয়।” উপজেলা প্রশাসন তার পাশে থাকবে জানিয়ে ইউএনও বলেন, উচ্চশিক্ষার বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।
জিপিএ-৫-এর গল্পটি শুধু সাফল্যের নয়
ঋতুর গল্পটি তাই কেবল একজন শিক্ষার্থীর জিপিএ-৫ পাওয়ার গল্প নয়। এটি এক কিশোরীর শোককে শক্তিতে পরিণত করার গল্প; বাবাকে হারানোর পরও স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে থাকার গল্প। একদিকে বাবার শূন্যতা, অন্যদিকে উচ্চশিক্ষার অনিশ্চয়তা—এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ঋতু আজ নতুন পথের অপেক্ষায়। তার হাতে জিপিএ-৫। কিন্তু সেই ফল যেন তার স্বপ্নের শেষ নয়, বরং শুরু হয় নতুন অধ্যায়ের।
এখন প্রয়োজন শুধু একটি সুযোগ—যাতে আর্থিক সংকটের কাছে হার না মানে এই মেধাবী মেয়েটি।
বাবা নেই, কিন্তু বাবার স্বপ্নটুকু বাঁচিয়ে রাখতে পারে ঋতু। আর সেই স্বপ্ন বাস্তব করার দায়িত্ব শুধু তার পরিবারের নয়; সমাজেরও।