ট্রাইব্যুনালে সাক্ষীকে ‘বৈরী’ ঘোষণার প্রস্তাব, পরে সরে গেল প্রসিকিউশন

আজাদ প্রতিবেদক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:

সালমান রহমান–আনিসুল হকের মামলায় জেরার সময় সাক্ষীর বক্তব্য নিয়ে আপত্তি; আইনে ‘হোস্টাইল’ ঘোষণার সরাসরি বিধান নেই বলে দাবি আসামিপক্ষের আইনজীবীর

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়া এক সাক্ষীকে জেরার সময় ‘বৈরী’ (হোস্টাইল) ঘোষণার প্রস্তাব দিয়েছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন। তবে দিনের শেষ দিকে সেই অবস্থান থেকে সরে এসে প্রসিকিউশন জানায়, সাক্ষীকে বৈরী ঘোষণা করা হবে না এবং এ বিষয়ে কোনো আবেদনও করা হবে না। মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে সাক্ষী আল আমিনের জেরা চলাকালে এ ঘটনা ঘটে।

জেরার একপর্যায়ে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম মৌখিকভাবে সাক্ষীকে ‘হোস্টাইল’ ঘোষণার কথা বলেন। এ সময় আদালত লিখিত আবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। পরে বিকেলে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা আর এমন কোনো আবেদন করবে না।

প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম বলেন, “সাক্ষী বৈরী হবে না। এটা মিজান ভাই না বুঝেই বলেছেন। আমরা কোনো আবেদন দিচ্ছি না।” তিনি জানান, আগামী ২৫ আগস্ট নতুন সাক্ষী আদালতে হাজির হবেন।

আরেক প্রসিকিউটর মার্জিনা রায়হান মদিনাও বলেন, মিজানুল ইসলাম বিষয়টি না বুঝে বলে ফেলেছিলেন। তার ভাষ্য, সাক্ষীর মধ্যে বৈরী হওয়ার মতো কিছু তারা দেখেননি।

যে বক্তব্যের পর ‘বৈরী’ ঘোষণার প্রসঙ্গ
আল আমিনকে জেরা করার সময় সালমান এফ রহমানের আইনজীবী পলাশ চন্দ্র রায় তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে আদালতে দেওয়া বক্তব্যের মিল আছে কি না, জানতে চান।

জবাবে আল আমিন বলেন, “আগে আমি সঠিকভাবে কথা বলতে পারি নাই, আজকে মন খুলে কথা বলতে পারছি।” এর পরপরই প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে তাকে ‘হোস্টাইল’ ঘোষণার মৌখিক প্রস্তাব দেওয়া হয় বলে জানান আসামিপক্ষের আইনজীবী। পলাশ চন্দ্র রায়ের ভাষ্য, আদালত লিখিত আবেদন দিতে বললেও শেষ পর্যন্ত প্রসিকিউশন আর আবেদন করেনি।

ট্রাইব্যুনাল আইনে ‘বৈরী সাক্ষী’র বিধান আছে কি?

প্রসিকিউশনের উদ্যোগের আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু। তার দাবি, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে কোনো সাক্ষীকে ‘হোস্টাইল’ বা বৈরী ঘোষণার সরাসরি বিধান নেই। তিনি বলেন, সাধারণ ফৌজদারি মামলায় সাক্ষ্য আইনের অধীনে কোনো সাক্ষী পক্ষের বিপরীতে অবস্থান নিলে তাকে জেরা করার সুযোগ থাকতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাধারণ সাক্ষ্য আইন সরাসরি প্রযোজ্য নয়। দুলুর মতে, ট্রাইব্যুনালের নিজস্ব বিধিতে এমন কোনো নির্দিষ্ট ব্যবস্থা করতে হলে সংশ্লিষ্ট রুল প্রণয়ন ও তা যথাযথ প্রক্রিয়ায় কার্যকর করতে হবে।

আসামিপক্ষের বক্তব্য

আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, জেরার শেষ পর্যায়ে এসে সাক্ষীকে বৈরী ঘোষণার উদ্যোগ প্রশ্ন তৈরি করে। সালমান এফ রহমানের আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরীর দাবি, রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী তাদের প্রত্যাশিত বক্তব্য না দেওয়ায় তাকে বৈরী ঘোষণা করার প্রসঙ্গ এসেছে। আনিসুল হকের আইনজীবী শাহরিয়ার কবির বিপ্লব বলেন, জেরা প্রায় শেষ হওয়ার পর এমন দাবি তোলা প্রচলিত নিয়মের বাইরে। তবে শেষ পর্যন্ত প্রসিকিউশন লিখিত আবেদন না করায় বিষয়টি আর আদালতের সিদ্ধান্তের পর্যায়ে গড়ায়নি।

মামলায় আল আমিনের জবানবন্দিতে কী ছিল?

এর আগে জবানবন্দিতে আল আমিন দাবি করেন, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অংশ নেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ১৮ জুলাই রাতে মিরপুর ১০ নম্বর এলাকায় আন্দোলনের সময় পুলিশের সদস্যরা আন্দোলনকারীদের ওপর রাবার বুলেট ও ছররা গুলি ছোড়েন। ওই সময় কয়েকজন সাদা পোশাকের ব্যক্তিকেও পুলিশের সঙ্গে দেখতে পান বলে দাবি করেন তিনি। আল আমিন আরও দাবি করেন, ওই ঘটনায় সিয়াম সর্দার নামে একজন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরদিনও আন্দোলনে যোগ দেওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি আরও কয়েকজনের নিহত হওয়ার খবর পাওয়ার কথা আদালতে জানান।

এ ছাড়া ৫ আগস্টের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি কল রেকর্ডে সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হকের কথোপকথন শুনেছেন বলেও জবানবন্দিতে দাবি করেন আল আমিন। তার ভাষ্য, ওই কথোপকথনে কারফিউ জারি করে আন্দোলনকারীদের দমনের বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। তবে এসব বক্তব্যের সত্যতা ও প্রমাণমূল্য শেষ পর্যন্ত আদালতের বিচারিক মূল্যায়নের বিষয়।

পাঁচ অভিযোগে বিচার চলছে

সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হকের বিরুদ্ধে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গত ১২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তাদের বিরুদ্ধে হত্যার নির্দেশ দেওয়াসহ পাঁচটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে আন্দোলন দমনে পরামর্শ, উসকানি ও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও রয়েছে।  বর্তমানে মামলাটিতে সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা চলছে। সাক্ষীর বক্তব্য, প্রসিকিউশনের অবস্থান এবং আসামিপক্ষের জেরা—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে শেষ পর্যন্ত আদালত কী সিদ্ধান্ত দেন, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। 

এলাকার খবর

সম্পর্কিত