মুরালি-অশ্বিন-হারভাজান-জাদেজারা পারেননি, মিরাজ পেরেছেন

ক্রীড়া প্রতিবেদক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:

মেহেদী হাসান মিরাজকে নিয়ে প্রশ্নটা নতুন নয়। ব্যাট হাতে খুব বেশি নজরকাড়া নন, বোলিংয়েও অনেক সময় ধার খুঁজে পাওয়া যায় না। সাদা বলের ক্রিকেটে তো তাঁর জায়গা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। কিন্তু মিরাজের আসল পরিচয়টা যেন অন্য কোথাও; বিপদে পড়লে তিনি দলকে বিপদে ফেলে যান না।

ডারউইনেও সেটাই আবার প্রমাণ করলেন মিরাজ। তবে এবার গল্পটা শুধু বিপদ থেকে বাংলাদেশকে টেনে তোলার নয়; এবার মিরাজ নিজেই ইতিহাসের অন্যতম বড় মঞ্চ তৈরি করে তার কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে গেলেন।

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জয়। বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক সাফল্যের নেপথ্যে মিরাজের অবদান দুই ইনিংসেই। প্রথম ইনিংসে যখন অস্ট্রেলিয়ার দারুণ বোলিং আক্রমণের সামনে বাংলাদেশের লেজের ব্যাটিং ধসে যাওয়ার কথা, তখন ১৫৪ বলে ৬৫ রানের লড়াকু ইনিংস খেলেছেন তিনি। তাঁর ব্যাটে ভর করেই বাংলাদেশের লিড পেরিয়েছে ২০০ রান। শেষ পর্যন্ত ৪২৬ রানে থেমেছে বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে যা তাদের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ টেস্ট ইনিংস।

মিরাজের এই ফিফটি কাদের বিপক্ষে এসেছে? যেখানে প্রতিপক্ষ টেস্ট ক্রিকেটের শীর্ষ দল অস্ট্রেলিয়ার চার বোলার প্যাট কামিন্স, মিচেল স্টার্ক, নাথান লায়ন এবং হ্যাজেলউডের উইকেট ৩০০ বা এর বেশি। চারজন বোলারের সম্মিলিত উইকেট ১৭১৮টি! কিন্তু আসল মিরাজকে দেখা গেল দ্বিতীয় ইনিংসে।

অস্ট্রেলিয়া যখন ধীরে ধীরে ম্যাচে ফিরছিল, স্টিভ স্মিথ ক্রিজে থিতু হচ্ছিলেন। ৪৪ রান করে ব্যাট করছিলেন অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম নির্ভরযোগ্য ব্যাটার। তখনই বল হাতে এগিয়ে এলেন মিরাজ। রান আটকে রেখে স্মিথকে অস্থির করে তোলার পরিকল্পনাটা কাজে দিল। শেষ পর্যন্ত নিজের বলেই দুর্দান্ত ক্যাচ নিয়ে ফিরিয়ে দিলেন তাঁকে।

এরপর চতুর্থ দিনের সকালে যেন মিরাজেরই মঞ্চ। অ্যালেক্স ক্যারি, বো ওয়েবস্টার ও প্যাট কামিন্সকে ফিরিয়েছেন তিনি। ওয়েবস্টারকে যেভাবে সোজা বলে বোকা বানিয়ে বোল্ড করেছেন, সেটি ছিল অফ স্পিনের নিখুঁত উদাহরণ। এরপর কামিন্সের উইকেট। সবশেষে নাথান লায়নকে এলবিডব্লিউ করে পাঁচ উইকেট পূর্ণ। অস্ট্রেলিয়া অলআউট ২৮৪ রানে, বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭।

৫ উইকেট, ৬৬ রান। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে কোনো বাংলাদেশি স্পিনারের এমন পারফরম্যান্সের অপেক্ষা ছিল দীর্ঘদিনের। ২০১৯ সালে ভারতীয় স্পিনার কুলদীপ যাদবের পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ৫ উইকেট নেওয়া প্রথম সফরকারী স্পিনার মেহেদী হাসান মিরাজ। মুত্তায়া মুরালিধরন, রাভিচন্দ্র অশ্বিন, হারভাজান সিং, রাবীন্দ্র জাদেজা, ইয়াসির শাহরা কখনই অস্ট্রেলিয়াতে ৫ উইকেট পাননি! কিন্তু মিরাজ পেলেন প্রথম টেস্টেই।

যারা ম্যাচটা লাইভ দেখেননি, তারা বুঝতে পারেবন না, কী অসাধারণ বোলিং মিরাজ করেছেন। কতটা দারুণ কীর্তি গড়েছেন সেটা বুঝতে হলে ম্যাচটার ফুল হাইলাইটস দেখতে হবে। অস্ট্রেলিয়াতে কোনো সফরকারী স্পিনারের সেরা বোলিং পারফরম্যান্সের এটি।

মিরাজকে যখনই প্রয়োজন হয়েছে, তখনই তিনি সামনে এসেছেন। কখনো ব্যাট হাতে, কখনো বল হাতে। কখনো লিটনের সঙ্গে, কখনো টেলএন্ডারদের সঙ্গে। আর ডারউইনে তো দুই ভূমিকাতেই।

বাংলাদেশের ক্রিকেটে হয়তো সবচেয়ে আলোচিত ক্রিকেটার তিনি নন। কিন্তু প্রয়োজনের সময়ে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্যদের একজন। এই পরিচয়টা মিরাজ বহুদিন ধরেই তৈরি করেছেন। ডারউইনে সেটাই আরও একবার প্রমাণ হলো।

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারানোর সেই ইতিহাসে তাঁর ব্যাটে ৬৫ রান, বলের ঘূর্ণিতে ৫ উইকেট নেওয়ার গল্প ইতিহাস হয়ে থাকবে। একটা আক্ষেপও অবশ্য থাকবে, কারণ ম্যান অব দা ম্যাচের পুরষ্কারটা পাননি।

দুই ইনিংস মিলিয়ে বল হাতে ৯ উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ের পাঁজর ভেঙে দেওয়া হাসান মাহমুদ পেয়েছেন ম্যাচ সেরার পুরষ্কার। তবে তাতে কি? মিরাজের অবদান তো আর মুছে ফেলা যাবে না। বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় টেস্ট জয়গুলোর একটির নায়ক হিসেবে এবার মিরাজের নামটাও স্থায়ীভাবে লেখা হয়ে গেল।

এলাকার খবর

সম্পর্কিত