রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শেষে বিএনপিতে নেতৃত্ব পুনর্গঠন, মন্ত্রিসভায় রদবদলের আভাস

আজাদ প্রতিবেদক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:

দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপি ও সরকারের ভেতরে সম্ভাব্য একাধিক পরিবর্তনের আলোচনা শুরু হয়েছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ায় তিনি নির্বাচিত হলে দলীয় মহাসচিবের পাশাপাশি সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও ছাড়তে হবে। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শেষ হওয়ার পরপরই বিএনপির নেতৃত্বে পুনর্বিন্যাস এবং মন্ত্রিসভায় সীমিত পরিসরে রদবদল হতে পারে বলে দলীয় ও সরকারি সূত্রে জানা গেছে।

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, আগামী ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শেষ হওয়ার পর বিএনপির সাংগঠনিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়া দৃশ্যমান হতে পারে। একই সময়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের বিষয়েও আলোচনা রয়েছে। তবে এসব পরিবর্তনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপরই নির্ভর করছে।

মহাসচিব পদে রিজভীকে নিয়ে আলোচনা
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে বিএনপির মহাসচিব পদটি শূন্য হবে। আপাতত এই পদে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে সদ্য জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হওয়া রুহুল কবির রিজভীকে দায়িত্ব দেওয়ার আলোচনা সবচেয়ে জোরালো বলে দলীয় একটি সূত্র জানিয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কার্যক্রম, দলীয় কার্যালয় পরিচালনা, রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং গণমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন রিজভী। দলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে তাঁকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করা হলে সাংগঠনিক কার্যক্রমে বড় ধরনের ছন্দপতন হবে না বলে মনে করছেন দলের একাংশের নেতারা।

তবে স্থায়ীভাবে মহাসচিব কে হবেন, সে বিষয়ে আলোচনায় রয়েছে একাধিক নাম। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ ও এ জেড এম জাহিদ হোসেনের নামও আলোচনায় আছে। দল পুনর্গঠনের পর কাউন্সিলে মহাসচিব পদে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

রিজভীকে স্থায়ী কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে তিনি বলেছেন, দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাঁদের কাজ করার জন্য নতুন করে স্থায়ী কমিটিতে যুক্ত করেছেন। দেশের ও দলের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

মহাসচিবের পাশাপাশি সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এবং দপ্তর সম্পাদক পদেও পরিবর্তনের আলোচনা রয়েছে। সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদে হাবিব উন নবী খান সোহেল ও আবদুস সালাম আজাদের নাম এবং দপ্তর সম্পাদক পদে সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, রকিবুল ইসলাম বকুল, আজিজুল বারী হেলাল, কৃষিবিদ শামীমুর রহমান শামীম, মুনির হোসেন, আবদুল লতিফ জনি ও এ বি এম মোশাররফ হোসেনের নাম আলোচনায় রয়েছে।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে আসতে পারেন সালাহউদ্দিন
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে তাঁর হাতে থাকা স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়েও পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে পড়বে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের দুজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই মন্ত্রণালয়ে পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি সরকারের ছয় মাসের কাজ পর্যালোচনা করে আরও কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের বিষয়েও আলোচনা চলছে।

দলীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে সালাহউদ্দিন আহমদের নাম। বর্তমানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা তাঁকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে আনা হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নতুন কোনো অভিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতাকে দায়িত্ব দেওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হবে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্ভাব্য নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসেবে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানির নাম জোরালোভাবে আলোচনায় রয়েছে। পাশাপাশি রাকিবুল ইসলাম বকুলের নামও রয়েছে আলোচনায়।

আরও কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে পরিবর্তনের আলোচনা
মন্ত্রিসভার সম্ভাব্য রদবদলের আলোচনায় স্থানীয় সরকার ও স্বরাষ্ট্রের পাশাপাশি পররাষ্ট্র, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নামও রয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়ার নাম আলোচনায় এসেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়েও পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। বর্তমান প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিতকে এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার কথা শোনা যাচ্ছে।

এ ছাড়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সেলিমা রহমান, জয়নুল আবদিন ফারুক ও শামসুজ্জামান দুদুসহ আরও কয়েকজন নেতাকে মন্ত্রিসভায় নতুন দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা রয়েছে। কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বাবুলের নামও সম্ভাব্য নতুন মুখ হিসেবে আলোচনায় এসেছে।

শরিকদেরও মন্ত্রিসভায় জায়গা?
বিএনপির সঙ্গে দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে থাকা মিত্র ও শরিক দলগুলোর কয়েকজন নেতাকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনা নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে।

টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হিসেবে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এবং লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএলডিপির চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিমের নাম আলোচনায় রয়েছে।

গত ২০ জুলাই রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বিএনপি ও তাদের মিত্র-শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ওই বৈঠকে দেশের সামগ্রিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় শরিকদের সহযোগিতা চাওয়া হয়। এরপর থেকেই মন্ত্রিসভায় শরিকদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর বিষয়টি রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।

শূন্য হতে পারে ঠাকুরগাঁও-১ আসন
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে তাঁর সংসদীয় আসন ঠাকুরগাঁও-১-ও শূন্য হবে। ওই আসনে উপনির্বাচন হলে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে তাঁর পরিবারের সদস্যদের নাম নিয়েও আলোচনা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি।

অন্যদিকে সংসদ উপনেতার পদটিও নতুন করে আলোচনায় আসতে পারে। পরবর্তী সংসদ অধিবেশনে এ পদে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সম্ভাব্য হিসেবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও সালাহউদ্দিন আহমদের নাম আলোচনায় রয়েছে।

তবে দল ও সরকারে সম্ভাব্য এসব পরিবর্তন এখনো মূলত আলোচনা ও সম্ভাবনার পর্যায়েই রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, দল ও সরকারের পুনর্গঠন বা রদবদল একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। প্রয়োজনের তাগিদে সরকারপ্রধান এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কার্যসম্পাদনের মূল্যায়নও এ ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া হয়।

ফলে ২০ আগস্টের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শুধু বঙ্গভবনের নতুন বাসিন্দা নির্ধারণ করবে না, এর পরপরই বিএনপির সাংগঠনিক নেতৃত্ব ও সরকারের মন্ত্রিসভাতেও নতুন সমীকরণের সূচনা হতে পারে—এমন সম্ভাবনাই এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রে।

এলাকার খবর

সম্পর্কিত