ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের পর এখন সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টনকে ঘিরে সরগরম রাজনীতি। মঙ্গলবার সকালে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ এবং বিকেলে ৪৯ সদস্যের মন্ত্রিসভার শপথের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে সংসদের প্রথম অধিবেশন বসতে পারে। অধিবেশন শুরু হলে সংসদ সচিবালয় সংরক্ষিত নারী আসনের ভোটার তালিকা প্রস্তুত করে নির্বাচন কমিশনে পাঠাবে; এরপর তফসিল ঘোষণা করা হবে।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনের মধ্যে বিএনপি পাবে ৩৬টি, জামায়াত ১২টি, এনসিপি ১টি এবং স্বতন্ত্ররা ১টি আসন। নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ২১২টি আসনে জয় পেয়েছে; ফল ঘোষণা বাকি থাকা দুই আসনেও বিএনপি প্রার্থীরা এগিয়ে। স্বতন্ত্র হিসেবে জয়ী সাতজনই দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে প্রার্থী হওয়া বিএনপি নেতা—ফলে সংরক্ষিত আসনে বিএনপির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে দলীয় সূত্রের ধারণা।
মনোনয়ন প্রক্রিয়া ও অগ্রাধিকার
বিএনপির একাধিক সূত্র জানায়, সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টনকে দলটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। দীর্ঘদিন রাজপথে সক্রিয়, কারাবরণকারী, আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী এবং তৃণমূল সংগঠন শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখা নেত্রীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার আলোচনা রয়েছে। পাশাপাশি পেশাজীবী, শিক্ষাবিদ ও সাবেক ছাত্রনেত্রীদেরও বিবেচনায় রাখা হতে পারে। যেসব আসনে বিএনপি প্রার্থী জয়ী হননি, সেসব এলাকার নারী নেত্রীদেরও প্রাধান্য দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে।
দলীয় একটি সূত্র জানায়, প্রাথমিকভাবে বড় একটি তালিকা তৈরি করে সেখান থেকে ধাপে ধাপে সংক্ষিপ্ত তালিকা করা হবে। পরে সংসদীয় বোর্ডে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হবে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের অনুমোদন ছাড়া কোনো তালিকা চূড়ান্ত হবে না।
তবে দলটির এক ভাইস চেয়ারম্যান নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নতুন মন্ত্রিসভা নিয়ে শতভাগ সন্তুষ্ট নন তারা; অনেক ত্যাগী নেতা মূল্যায়ন পাননি। সংরক্ষিত আসনেও একই চিত্র দেখা যেতে পারে—এমন আশঙ্কা তার।
দৌড়ে যাঁরা এগিয়ে
দলীয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সংরক্ষিত নারী আসনে সম্ভাব্য মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন— স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান, বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস আকতার জাহান শিরিন, হাসনা জসিম উদ্দিন মওদুদ, মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস, সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ, সাবেক সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা, হাসিনা আহমেদ, রুমানা মাহমুদ, শাম্মী আকতার, নাজমুন নাহার বেবী, সাবেক এমপি আসিফা আশরাফী পাপিয়া, সাবেক এমপি নিলুফার চৌধুরী মনি, রাশেদা বেগম হীরা, রেহেনা আকতার রানু।
এছাড়া আলোচনায় আছেন—ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নিপুণ রায় চৌধুরী, হেলেন জেরিন খান, সামিরা তানজিনা চৌধুরী, সৈয়দা আদিবা হোসেন, অপর্না রায়, মিনা বেগম মিনি, ফাহসিনা হক লিরা, অধ্যাপিকা রোকেয়া চৌধুরী বেবী, হাসনাহেনা হিরা, অ্যাডভোকেট রুনা লায়লা (রুনা), রুমা আক্তার, অ্যাডভোকেট আরিফা সুলতানা রুমা, শাহানা আকতার সানু, নিয়াজ হালিমা আর্লি, রাবেয়া আলম, রোকেয়া সুলতানা তামান্না, আমেনা বেগম ও জেবা আমিন খান।
রাজনৈতিক অঙ্গনের বাইরের পরিচিত মুখদের মধ্যেও আলোচনা রয়েছে। কণ্ঠশিল্পী Baby Naznin, Rizia Parveen ও Konok Chapa–এর নাম ঘুরছে সম্ভাব্য তালিকায়। এছাড়া সাবেক কাউন্সিলর ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি, বীথিকা বিনতে হোসাইন, সানজিদা ইসলাম তুলি, শাহিনুর নার্গিস, শওকত আরা উর্মি, সেলিনা সুলতানা নিশিতা, নাদিয়া পাঠান পাপন, শাহিনুর সাগর, সাবেক এমপি ইয়াসমিন আরা হক, চেমন আরা বেগম, জাহান পান্না, বিলকিস ইসলাম, ফরিদা ইয়াসমিন, ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কার নামও শোনা যাচ্ছে।
সামনে কী
ইসি সূত্র জানিয়েছে, সংসদ সচিবালয়ের তালিকা পেলেই তফসিল ঘোষণা করা হবে এবং ঈদের আগেই নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপির জন্য সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টন কেবল সাংগঠনিক ভারসাম্য নয়, ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বার্তাও বহন করবে।
দলীয় ত্যাগ, মাঠপর্যায়ের গ্রহণযোগ্যতা ও নেতৃত্বের আস্থা—এই তিন মানদণ্ডেই শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে কারা যাচ্ছেন সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে। এখন নজর সংসদীয় বোর্ডের বৈঠকের দিকে।