ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক বলছেন, রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় দেশে ফেরার সুযোগ নেই সাবেক অধিনায়কের
বাংলাদেশ ক্রিকেটের অন্যতম সফল অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানের দেশে ফেরা এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রত্যাবর্তন নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি আওয়ামী লীগের ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেওয়ার পর তার দেশে ফেরার পথ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। তার ভাষ্য, এখন সাকিবকে দেশে ফিরতে হলে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় নয়, আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই ফিরতে হবে।
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বলেন, সাকিবকে একজন ক্রিকেটার হিসেবে বিবেচনা করে এতদিন সরকার বিষয়টি নমনীয়ভাবে দেখার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পর সেই অবস্থান বদলেছে। তার ভাষায়, ‘যে স্বৈরাচারের মঞ্চে উঠেছে, তার তো আর আসার সুযোগ আছে বলে মনে হয় না।’ সাকিব দেশে ফিরলে তাকে আইনগত প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে বলেও জানান তিনি।
এর ফলে জাতীয় দলের হয়ে সাকিবের আরেকটি ম্যাচ খেলার সম্ভাবনা কার্যত আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ল। অথচ সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে ৩৯ বছর বয়সী সাকিব নিজেই জানিয়েছিলেন, তিনি এখনো আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর নেননি। দেশে ফিরে একটি বিদায়ী সিরিজ খেলা এবং ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের হয়ে খেলার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছিলেন তিনি।
দেশে ফিরতে চান সাকিব
শ্রীলঙ্কায় ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট খেলার সময় আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাকিব বলেছিলেন, সরকার তার নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিলে তিনি দেশে ফিরতে প্রস্তুত। তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা ও অন্যান্য অভিযোগ থাকলেও সেগুলোর আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতেও আপত্তি নেই বলে জানান তিনি।
সাকিবের বক্তব্য ছিল, তিনি কোনো অন্যায় করেননি এবং আদালতের মাধ্যমে নিজের অবস্থান প্রমাণ করতে চান। দেশে ফেরার ক্ষেত্রে তার প্রধান উদ্বেগ নিরাপত্তা। সরকারের কাছ থেকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পেলেই তিনি দেশে ফিরতে চান বলে জানান সাবেক এই অধিনায়ক।
এমনকি প্রয়োজনে যত দ্রুত সম্ভব দেশে ফেরার ইচ্ছার কথাও জানান তিনি। দেশে ফেরা সম্ভব না হলে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে দেশে ফেরার চেষ্টা করবেন—এমন কথাও বলেছেন সাকিব।
কিন্তু ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, সরকার এখন তাকে শুধুমাত্র একজন ক্রিকেটার হিসেবে দেখছে না। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তার সক্রিয় উপস্থিতিকে গুরুত্ব দিয়েই দেশে ফেরার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলনেই বদলে গেল পরিস্থিতি?
সাম্প্রতিক সময়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের একটি ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলনে যুক্ত হন সাকিব। সেখানে তিনি বক্তব্যও দেন। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাংলাদেশে তার বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাকিবের দেশে ফেরার নিরাপত্তা নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়। তবে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে বোঝা যাচ্ছে, শুধু নিরাপত্তার বিষয় নয়, সাকিবের রাজনৈতিক অবস্থানও এখন দেশে ফেরার ক্ষেত্রে বড় বিবেচনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এর আগে ক্রিকবাজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও আমিনুল হক বলেছিলেন, সাকিবের দেশে ফিরে খেলার কোনো সুযোগ তিনি দেখছেন না। তার মতে, একজন ক্রিকেটারের পরিচয়ের পরিবর্তে সাকিব যেভাবে রাজনৈতিক পরিচয়কে সামনে এনেছেন, তাতে তাকে আইনের মুখোমুখি হয়েই দেশে ফিরতে হবে।
বিসিবিতেও অনিশ্চয়তার সুর
সাকিবের ক্রিকেটে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক সিরাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীরও ইতিবাচক কোনো ইঙ্গিত দেননি।
তার মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে সাকিবের ক্রিকেটার পরিচয়ের চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয়ই বড় হয়ে উঠেছে। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে একই ভার্চ্যুয়াল মঞ্চে তার উপস্থিতিকে তিনি সাকিবের রাজনৈতিক অবস্থানের স্পষ্ট বার্তা হিসেবে দেখছেন। আলমগীরের ভাষায়, প্রতিটি সিদ্ধান্তেরই মূল্য দিতে হয় এবং সাকিব যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তার মূল্য সম্পর্কেও তিনি অবগত। তার মতে, রাজনৈতিক পরিচয়কে সামনে আনার কারণে সাকিব নিজের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ক্যারিয়ারকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছেন।
জাতীয় দলে ফেরার সম্ভাবনা নিয়েও বিসিবির এই পরিচালকের বক্তব্য বেশ কঠোর। তার মতে, সাকিবকে আগে তার বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলো থেকে আইনি মুক্তি পেতে হবে। এরপর জাতীয় দলে ফিরতে হলে তাকে ফিটনেস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। তবে বয়স বিবেচনায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার ফেরার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ।
সাকিবের সামনে এখন তিন বাধা
সাকিবের জাতীয় দলে ফেরার পথে মূলত তিনটি বড় বাধা দেখা দিয়েছে— আইনি জটিলতা, রাজনৈতিক অবস্থান এবং বয়স ও ম্যাচ ফিটনেস। প্রথমত, তার বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলোর আইনি নিষ্পত্তি প্রয়োজন। সাকিব নিজেও বলেছেন, তিনি আদালতের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত। অর্থাৎ আইনি প্রক্রিয়া এড়িয়ে দেশে ফেরার কোনো পথ তিনি চাইছেন না। দ্বিতীয়ত, তার রাজনৈতিক অবস্থান এখন ক্রিকেটীয় পরিচয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য হিসেবে তার রাজনৈতিক ভূমিকা আগে থেকেই ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেওয়ার ফলে সেই পরিচয় আবারও সামনে এসেছে। তৃতীয়ত, বয়স। ৩৯ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরে দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার গড়া যে কঠিন, সেটি ক্রিকেটীয় বাস্তবতা। সাকিব নিজেও রয়টার্সকে বলেছেন, বয়স এখন তার পক্ষে নেই এবং খুব বেশি অপেক্ষা করার সুযোগ তার নেই।
২০২৭ বিশ্বকাপ কি শুধুই স্বপ্ন?
সাকিবের সবচেয়ে বড় ক্রিকেটীয় ইচ্ছা এখন ২০২৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের হয়ে খেলা। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে তিনি এখনো আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে আনুষ্ঠানিক অবসরের ঘোষণা দেননি। তবে ২০২৭ বিশ্বকাপ পর্যন্ত যেতে হলে তাকে শুধু আইনি ও রাজনৈতিক জটিলতা কাটালেই হবে না; ক্রিকেটীয়ভাবেও নিজেকে প্রমাণ করতে হবে। দীর্ঘ সময় জাতীয় দলের বাইরে থাকার পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য প্রয়োজনীয় ম্যাচ ফিটনেস ও পারফরম্যান্সে ফিরতে হবে তাকে। এর সঙ্গে রয়েছে জাতীয় দলে জায়গা পাওয়ার প্রশ্ন। বাংলাদেশ ক্রিকেটে এখন নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়রা নিজেদের জায়গা তৈরি করছেন। ফলে শুধু অভিজ্ঞতার কারণে সাকিবের জন্য জায়গা নিশ্চিত হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
বিদায়ী সিরিজের ইচ্ছাও অনিশ্চিত
সাকিবের আরেকটি ইচ্ছা ছিল দেশে ফিরে বাংলাদেশের মাটিতে একটি বিদায়ী সিরিজ খেলা। দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষটা দেশের দর্শকদের সামনে করতে চেয়েছেন তিনি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই স্বপ্নও অনিশ্চয়তায় পড়েছে। একজন ক্রিকেটার হিসেবে সাকিব বাংলাদেশের ক্রিকেটের ইতিহাসে অনন্য উচ্চতায় অবস্থান করছেন। তিন ফরম্যাটেই দীর্ঘ সময় ধরে জাতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন তিনি। অধিনায়কত্ব করেছেন, ব্যাট ও বল হাতে অসংখ্য ম্যাচে বাংলাদেশের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তাই তার ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায় কীভাবে লেখা হবে, সেটি শুধু সাকিবের ব্যক্তিগত বিষয় নয়; বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্যও তা গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ সিদ্ধান্ত কার?
বর্তমান পরিস্থিতিতে সাকিবের দেশে ফেরা ও জাতীয় দলে ফেরার বিষয়টি কয়েকটি আলাদা প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছে। আইনি বাধা কাটানো, দেশে নিরাপদে প্রবেশের সুযোগ, ক্রিকেট বোর্ডের অবস্থান এবং জাতীয় দলের নির্বাচকদের সিদ্ধান্ত—সবকিছুই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সাকিব নিজে দেশে ফিরতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন। তিনি আদালতের মুখোমুখি হতেও ভয় পাচ্ছেন না। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে তাকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় দেশে ফেরার সুযোগ দেওয়া হবে না। ফলে আপাতত সাকিবের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ক্রিকেট নয়— তিনি কবে এবং কীভাবে দেশে ফিরতে পারবেন। সেই প্রশ্নের উত্তর মিললেই পরিষ্কার হবে, বাংলাদেশের ক্রিকেটে সাকিবের শেষ অধ্যায়টি কি দেশের মাটিতে লেখা হবে, নাকি ২০২৭ বিশ্বকাপ ও একটি বিদায়ী সিরিজের স্বপ্ন নিয়েই আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের পর্দা নামবে।