বিভাগীয় মামলায় বরখাস্ত থেকে পদাবনতি; অভিযোগ প্রতিকার কমিটিতে থাকছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞের প্রতিনিধি
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) গঠন করেছে সরকার। ১০ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল, ২০২৬’ পাস হওয়ার পর ১৫ সেপ্টেম্বর গেজেটে প্রকাশিত হয় ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (SRB) আইন, ২০২৬’। সরকারি মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের গেজেট তালিকায় আইনটিকে ২০২৬ সনের ১০৯ নম্বর আইন হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে।
নতুন আইনে এসআরবির গঠন, ক্ষমতা, দায়িত্ব ও কার্যক্রমের পাশাপাশি সদস্যদের শৃঙ্খলা, অপরাধ, আটক, বিভাগীয় ব্যবস্থা, শাস্তি, আপিল এবং সাধারণ মানুষের অভিযোগ প্রতিকারের জন্য বিস্তারিত বিধান রাখা হয়েছে। অর্থাৎ র্যাবের নাম ও আইনি কাঠামো বদলালেও নতুন বাহিনীর সদস্যদের জবাবদিহির জন্য আইনে একটি পৃথক কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। গেজেট অনুযায়ী, র্যাবের বিদ্যমান জনবল, ক্ষমতা, সম্পদ, নথি, অর্থ ও দায়-দায়িত্বও এসআরবিতে স্থানান্তরিত হবে।
এসআরবি গঠনের উদ্দেশ্য হিসেবে আইনে বলা হয়েছে, জননিরাপত্তা রক্ষা, সন্ত্রাসবাদ ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সমুন্নত রাখতে পুলিশকে সহায়তার জন্য আধুনিক, পেশাদার, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক একটি বিশেষায়িত ইউনিট প্রয়োজন। একই সঙ্গে এই ইউনিটের ক্ষমতা প্রয়োগে স্বচ্ছতা, তদারকি ও কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও আইনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইন অনুযায়ী, সরকারের প্রয়োজন অনুসারে পুলিশ বাহিনী, শৃঙ্খলা বাহিনী এবং নির্ধারিত সংখ্যক কর্মকর্তা, আর্মড পার্সোনেল বা কর্মচারী পদায়ন কিংবা প্রেষণের মাধ্যমে এসআরবিতে নিয়োগ করা যাবে। বাহিনীর দায়িত্বের মধ্যে থাকবে জননিরাপত্তা রক্ষা, সন্ত্রাস ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন, অবৈধ অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক উদ্ধার, মাদক ও সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং গুম, ভূমিদস্যুতা, নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, মানবপাচার ও অপহরণের মতো অপরাধে ব্যবস্থা নেওয়া।
এ ছাড়া গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহায়তা এবং আদালত, সরকার বা পুলিশ মহাপরিদর্শকের নির্দেশে অপরাধের তদন্তও এসআরবির দায়িত্বের মধ্যে রাখা হয়েছে।
এসআরবির সদস্যরা অস্ত্র ও গোলাবারুদ বহন ও ব্যবহার করতে পারবেন। ফৌজদারি কার্যবিধি ও অন্যান্য প্রচলিত আইনের বিধান অনুযায়ী তাঁরা কোনো স্থানে প্রবেশ, তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তার করতে পারবেন। তবে কোনো সদস্য কাউকে গ্রেপ্তার বা কোনো আলামত জব্দ করলে তা দ্রুত সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করতে হবে এবং এ বিষয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন দিতে হবে।
নতুন আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো সদস্যদের শৃঙ্খলা ও আচরণসংক্রান্ত বিধান। ১৭ ধারায় একাধিক কর্মকাণ্ডকে শৃঙ্খলা লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দায়িত্ব পালনের সময় মাতাল বা নেশাগ্রস্ত থাকা, কোনো সহকর্মীকে আঘাত করা বা বলপ্রয়োগ, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আইনসঙ্গত আদেশ অমান্য করা, আইনসঙ্গত দায়িত্ব পালনে অস্বীকৃতি জানানো এবং দায়িত্বস্থল থেকে অনুমতি ছাড়া চলে যাওয়া।
কোনো সদস্য আটক বা গ্রেপ্তার অবস্থায় পলায়ন করলে, দায়িত্ব পালনে ইচ্ছাকৃত বা অবহেলাজনিত ব্যর্থতা ঘটালে, অসুস্থতার ভান করে দায়িত্ব এড়ানোর চেষ্টা করলে কিংবা নিজেকে বা অন্য কাউকে ইচ্ছাকৃতভাবে আহত করলে সেটিও শৃঙ্খলা লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে।
এ ছাড়া বলপূর্বক অর্থ আদায়, আইনের বাইরে কারও যানবাহন বা সেবা ব্যবহার, জোর করে জমি দখল বা বেআইনিভাবে জমির দখল হস্তান্তর, সম্পদ চুরি বা ধ্বংস করা, কোনো অপরাধীকে আটক করতে ইচ্ছাকৃত বা অবহেলাজনিতভাবে ব্যর্থ হওয়া, জুয়া বা মাদকে জড়িত থাকা এবং নৈতিক স্খলনমূলক কর্মকাণ্ডেও শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো, দায়িত্ব পালনকালে কোনো অধস্তন সদস্যের বিরুদ্ধে আঘাত, দুর্ব্যবহার, নির্যাতন, দাঙ্গা বা অনধিকার প্রবেশের অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পরও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে আইনগত সহায়তা দিতে ব্যর্থ হওয়াকেও শৃঙ্খলা লঙ্ঘন হিসেবে ধরা হয়েছে।
শৃঙ্খলা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে সদস্যকে আটকেরও সুযোগ রাখা হয়েছে। ১৮ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো সদস্য শৃঙ্খলা লঙ্ঘন করলে বা তাঁর দ্বারা এমন লঙ্ঘনের আশঙ্কা থাকলে কমান্ডার, কোম্পানি কমান্ডার বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নির্দিষ্ট শর্তে তাঁকে আটক রাখতে পারবেন।
তবে আটকের ক্ষেত্রে কয়েকটি সুরক্ষাও রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে দ্রুত জানাতে হবে, আটক সদস্যকে লিখিতভাবে আটকের কারণ জানাতে হবে এবং অনুসন্ধান শুরু করতে হবে। প্রয়োজনে অভিযোগও গঠন করতে হবে। কোনো সদস্য ১৫ দিনের বেশি আটক থাকলে প্রতি সাত দিন পরপর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন দিতে হবে। প্রাথমিকভাবে অভিযোগের কোনো প্রমাণ না পাওয়া গেলে তাঁকে দ্রুত মুক্তি দিতে হবে।
কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা লঙ্ঘনের অভিযোগ পাওয়া গেলে মহাপরিচালক নিজে অথবা তাঁর নির্দেশে কোনো কর্মকর্তা দ্রুত প্রাক্-তদন্ত করবেন বা করাবেন। প্রাক্-তদন্তে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে প্রেষণে থাকা সদস্যকে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তাঁর মূল বাহিনী বা সংস্থায় ফেরত পাঠানো হবে।
শাস্তির ক্ষেত্রেও আইনে গুরুদণ্ড ও লঘুদণ্ড—দুই ধরনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বিভাগীয় কার্যধারায় দোষী সাব্যস্ত হলে গুরুদণ্ড হিসেবে চাকরি থেকে বরখাস্ত, অপসারণ, বাধ্যতামূলক অবসর বা অব্যাহতি দেওয়া যেতে পারে। নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পদাবনতি, পদোন্নতি বন্ধ, জ্যেষ্ঠতা বা বেতন-ভাতা বাজেয়াপ্ত এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বেতন বৃদ্ধি স্থগিতের ব্যবস্থাও রয়েছে।
লঘুদণ্ডের মধ্যে রয়েছে অনূর্ধ্ব এক মাসের বেতনের সমপরিমাণ জরিমানা, তিরস্কার, সর্বোচ্চ ৩০ দিনের জন্য কোয়ার্টার গার্ড বা ব্যাটালিয়নে আটক রাখা এবং অতিরিক্ত ড্রিল, গার্ড, ফ্যাটিগ বা অন্য দায়িত্ব দেওয়া। দৈনিক দুই ঘণ্টা করে সর্বোচ্চ ১৪ দিনের শাস্তিমূলক ড্রিলের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
তবে শাস্তির ক্ষেত্রে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে কোনো সদস্যকে এসব ধারায় শাস্তি দেওয়া যাবে না।
বিভাগীয় শাস্তির বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগও রাখা হয়েছে। আদেশের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল করা যাবে। মহাপরিচালকের দেওয়া আদেশের বিরুদ্ধে পুলিশ মহাপরিদর্শকের কাছে আপিল করার সুযোগ রয়েছে।
সাধারণ মানুষের অভিযোগের ক্ষেত্রেও নতুন আইনে পৃথক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ২৪ ধারায় অভিযোগ প্রতিকার কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে। এতে এসআরবির একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিনিধি, পুলিশ অধিদপ্তরের অন্যূন এআইজি পদমর্যাদার একজন প্রতিনিধি, আইন বা বিচার প্রশাসনে অন্তত ১০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সরকার মনোনীত একজন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা, মানবাধিকার সংরক্ষণ ও বাস্তবায়নে অন্তত ১০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন এবং এসআরবির একজন পরিচালক (লিগ্যাল ও মিডিয়া) থাকার কথা বলা হয়েছে।
এই কমিটি সাধারণ মানুষের অভিযোগ এবং এসআরবি সদস্যদের অভ্যন্তরীণ সংক্ষোভ তদন্ত করে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে পারবে। প্রয়োজন হলে নিরপেক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে অনুসন্ধান দলও গঠন করা যাবে। অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করতে পারবে কমিটি।
এসআরবির কার্যক্রমে বিধিবহির্ভূত প্রভাব, পদোন্নতি ও পদায়ন, বিভাগীয় শাস্তি, হয়রানি বা অন্যায্য আচরণসংক্রান্ত অভিযোগও এই ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছে।
তবে র্যাব বিলুপ্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো মামলা বা বিভাগীয় ব্যবস্থা শেষ হয়ে যাচ্ছে—এমন নয়। গেজেট অনুযায়ী, র্যাবের ২০০৫ সালের কোর্ট প্রসিডিউর ও বিভাগীয় কার্যধারার বিধি বহাল থাকবে। র্যাব সদস্যদের বিরুদ্ধে আগে থেকে শুরু হওয়া বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং চলমান আদালতের কার্যক্রমও বৈধ ও কার্যকর থাকবে। অর্থাৎ বাহিনীর নাম ও আইনি কাঠামো বদলালেও অতীতের বিচারিক বা বিভাগীয় প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে না।
একই সঙ্গে র্যাবের সংশ্লিষ্ট জনবল, ক্ষমতা, সম্পদ, অর্থ, নথি, চুক্তি ও দায়-দায়িত্ব এসআরবিতে স্থানান্তরের বিধান রয়েছে। ফলে নতুন বাহিনীটি সম্পূর্ণ নতুন জনবল ও অবকাঠামো দিয়ে শুরু করছে না; বিদ্যমান কাঠামোর একটি বড় অংশই নতুন আইনি কাঠামোর অধীনে এসআরবিতে স্থানান্তরিত হচ্ছে।
র্যাব ২০০৪ সালে বিশেষায়িত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হিসেবে যাত্রা শুরু করার পর সন্ত্রাস ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও বিভিন্ন সময়ে বাহিনীটির বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র র্যাব এবং বাহিনীর কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। পরবর্তী সময়ে র্যাব বিলুপ্ত বা সংস্কারের দাবি আরও জোরালো হয়।
এই প্রেক্ষাপটে এসআরবি আইনে স্বচ্ছতা, তদারকি, জবাবদিহি এবং অভিযোগ প্রতিকারের জন্য পৃথক বিধান রাখা হয়েছে। এখন মূল প্রশ্ন হবে—আইনে থাকা এসব সুরক্ষা ও শাস্তির বিধান মাঠপর্যায়ে কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হয়। কারণ নাম ও কাঠামো বদলের পাশাপাশি বিশেষায়িত এই বাহিনীর ক্ষমতা প্রয়োগে বাস্তব জবাবদিহিই শেষ পর্যন্ত নতুন ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ধারণ করবে।