রাজধানীর ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাট থেকে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়াম বেগমের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় এমপি গাজী নজরুল ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামকে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। গতকাল ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলামের আদালত শুনানি শেষে গাজী নজরুলকে চার দিন এবং মাকছুদাকে এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
মরিয়ামের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহর করা মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাটে গাজী নজরুল ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম মরিয়ামকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করতেন। তবে গাজী নজরুল আদালতে সাংবাদিকদের কাছে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, অভিযোগ মিথ্যা এবং ঘটনার সময় তিনি বাসায় ছিলেন না। তাঁর দাবি, মরিয়াম আত্মহত্যা করেছেন।
রোববার রাতে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ-সংলগ্ন ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর ভবনের ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে মরিয়ামের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ সময় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গাজী নজরুল ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদাকে শেরেবাংলা নগর থানায় নেওয়া হয়। পরে তাঁদের ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
পুলিশের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গাজী নজরুল বলেছেন, দুপুরে খাওয়া শেষে মরিয়াম নিজের কক্ষে চলে যান। তিনি পাশের কক্ষে ছিলেন এবং প্রথম স্ত্রীও বাসায় ছিলেন। বিকেল ৫টার দিকে মরিয়ামের ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ দেখতে পান। ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া না পেয়ে জানালা দিয়ে তাঁকে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলতে দেখেন বলে পুলিশকে জানিয়েছেন নজরুল।
রোববার গভীর রাতে মরিয়ামের বাবা বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেন। মামলায় গাজী নজরুল, মাকছুদা এবং মরিয়ামের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়েছে। মামলার পর গাজী নজরুল ও মাকছুদাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে সোমবার দুপুরে আদালতে নেওয়া হয়।
এরপর মামলাটির তদন্তভার শেরেবাংলা নগর থানা থেকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়। রিমান্ড মঞ্জুরের পর দুই আসামিকে মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছে।
মামলার এজাহারে মরিয়ামের বাবা অভিযোগ করেছেন, গত জুনে তাঁর শ্যালক ওবায়দুর রহমানের প্রত্যক্ষ প্ররোচনায় গাজী নজরুলের সঙ্গে মরিয়ামের বিয়ে হয়। এরপর ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাটে গাজী নজরুল, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ও মরিয়াম একসঙ্গে বসবাস করতেন। সেখানে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গাজী নজরুল ও মাকছুদা মরিয়ামকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করতেন বলে এজাহারে দাবি করা হয়েছে।
মরিয়ামের বাবা মাসুম বিল্লাহ বলেন, গাজী নজরুল তাঁর আপন খালু। তাঁর ভাষ্য, নজরুলের সঙ্গে মরিয়ামের সম্পর্ক তৈরির পেছনে তাঁর শ্যালক ওবায়দুর রহমান ভূমিকা রেখেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, মরিয়াম নজরুলের কাছে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তবে মরিয়াম বিষয়টি তাঁকে আগে কিছু জানাননি বলেও তিনি জানান।
মরিয়ামের ঘর থেকে উদ্ধার হওয়া চিরকুট নিয়েও তদন্তে গুরুত্ব দিচ্ছে পুলিশ। মাসুম বিল্লাহ বলেন, চিরকুটটি মরিয়ামের হাতের লেখা কি না, তা তিনি নিশ্চিত নন। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া চিরকুটে বিশ্বাসভঙ্গ, প্রতারণা ও গাজী নজরুলকে ঘিরে হতাশার ইঙ্গিত রয়েছে। তবে লেখাগুলো মরিয়ামেরই কি না, তা ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার কথা।
রোববার সন্ধ্যা ৭টার দিকে পুলিশ ন্যাম ভবনের ওই ফ্ল্যাটে গিয়ে দরজা ভেঙে মরদেহ উদ্ধার করে। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এবং অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক ইউনিট ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে। পরে রাত ১০টার দিকে মরদেহ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়। সোমবার ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
রিমান্ড শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মামলার ঘটনার পাশাপাশি হত্যার সম্ভাবনাও তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথা আদালতে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা হলেও হত্যার বিষয়টিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আদালত অবশ্য রিমান্ড মঞ্জুরের মাধ্যমে তদন্তের স্বার্থে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের সুযোগ দিয়েছেন।
শেরেবাংলা নগর থানার ওসি মনিরুল ইসলাম বলেন, মামলাটি ডিবিতে স্থানান্তর করা হয়েছে। আদালত থেকে দুই আসামিকে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছে। সেখানে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
এদিকে মরিয়ামের মৃত্যুর ঘটনায় সাতক্ষীরার শ্যামনগরে গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ হয়েছে। উপজেলা সচেতন নাগরিক সমাজের ব্যানারে সোমবার সকালে পৌর সদরে আয়োজিত কর্মসূচিতে তাঁর শাস্তির দাবি জানানো হয়। বিক্ষোভকারীরা মিছিল শেষে উপজেলা প্রেস ক্লাবের সামনে গাজী নজরুলের কুশপুত্তলিকায় জুতাপেটা ও অগ্নিসংযোগ করেন।
সমাবেশে কয়েকজন স্থানীয় শিক্ষক, সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতাসহ বক্তারা মরিয়ামের মৃত্যুর জন্য গাজী নজরুলকে দায়ী করে বক্তব্য দেন। তাঁরা তাঁর শাস্তির দাবি জানান। তবে এসব বক্তব্য বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ ও দাবি; ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্তাধীন।
গাজী নজরুল সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য। এর আগে ১৯৯১ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সর্বশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে তিনি নির্বাচিত হন।
গত জুলাইয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গাজী নজরুলের ব্যক্তিগত মুহূর্তের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়। পরে ২২ জুলাই জামায়াতে ইসলামী তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করে। নজরুল তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ভিডিওতে থাকা তরুণীকে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেন এবং জানান, ১৭ জুন পারিবারিকভাবে ও প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে তাঁদের বিয়ে হয়েছিল।
মরিয়ামের মৃত্যুর ঘটনায় এখন মূলত কয়েকটি বিষয় তদন্তের আওতায় এসেছে—মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, মরিয়াম আত্মহত্যা করেছেন কি না, আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগের সত্যতা, তাঁর ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের কোনো প্রমাণ ছিল কি না, উদ্ধার হওয়া চিরকুটের লেখক কে এবং মৃত্যুর আগে তাঁর সঙ্গে কারা যোগাযোগ করেছিলেন। তদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতেই এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার কথা।