জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর ৩৪ জন সংসদ সদস্য একসঙ্গে বিদেশ সফরে রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২৬ জনের সঙ্গে তাঁদের সহধর্মিণী রয়েছেন। এ ছাড়া দলের আরও কয়েকজন নেতা ও তাঁদের পরিবারের সদস্য এবং একজন লেখকও এই সফরে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
জামায়াতের পক্ষ থেকে ১৬ দিনের এই সফরকে ‘শিক্ষা সফর’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দলের নেতাদের ভাষ্য, বিভিন্ন দেশের সংসদীয় ব্যবস্থা, নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা কাছ থেকে দেখা এবং সেসব অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের কাজে লাগানোর লক্ষ্যেই এই সফরের আয়োজন।
বর্তমানে সফরকারী এমপিরা ফিলিপিন্সে অবস্থান করছেন। তাঁদের প্রথম গন্তব্য ছিল মালয়েশিয়া। ১৩ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া সফরে এরপর তাঁরা সিঙ্গাপুর হয়ে ফিলিপিন্সে যান। সেখান থেকে সৌদি আরবে গিয়ে ওমরাহ পালনের কথা রয়েছে। এরপর বেশির ভাগ সফরকারীর বাহরাইন যাওয়ার কথা রয়েছে। ১ অক্টোবরের মধ্যে তাঁদের দেশে ফেরার কথা।
জামায়াতের ৩৪ সংসদ সদস্য এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সফরসূচি সম্পর্কে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম অন্তত ১০ জন এমপির সরকারি আদেশ (জিও) পর্যালোচনা করেছে। তাতে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ফিলিপিন্স, সৌদি আরব, ওমান, বাহরাইন ও থাইল্যান্ডের নাম রয়েছে। কয়েকজন সংযুক্ত আরব আমিরাত ও অস্ট্রেলিয়া সফরের অনুমতিও নিয়েছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ৭৭টি আসনে জয় পেয়েছিল। সেই হিসাবে বর্তমানে বিদেশে থাকা ৩৪ জন এমপি দলটির সংসদীয় দলের প্রায় অর্ধেক।
এদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের কর্মসূচিতে অংশ না নিয়ে এতজন এমপির একসঙ্গে বিদেশ সফর রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে সরকারকে চাপ দেওয়ার কর্মসূচির অংশ হিসেবে ১৯ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় দফায় রংপুর অভিমুখী লংমার্চ অনুষ্ঠিত হওয়ার সময় জামায়াতের বিপুলসংখ্যক এমপির বিদেশে অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে দলটির প্রচার বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেছেন, এটি কোনো গোপন সফর নয়। প্রবাসীদের আমন্ত্রণ এবং বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের জন্যই সফরটি হচ্ছে। তিনি বলেন, সফরকারীরা একসঙ্গে দেশ ছাড়েননি। প্রত্যেকে নিজেদের সুবিধামতো সময়ে বিদেশে গেছেন। সফরে সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি তাঁদের পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনও রয়েছেন।
জামায়াতের সংসদীয় দলের মুখপাত্র নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, এটি ‘নলেজ শেয়ারিংয়ের একটি ট্যুর’। বিভিন্ন দেশের সংসদ পদ্ধতি, নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা বোঝার চেষ্টা করা হচ্ছে।
দলের আন্তর্জাতিক কমিটির একজন সদস্য বলেন, প্রায় দুই মাস আগে এই সফরের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়। দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকায় দলের অনেক সংসদ সদস্য বিদেশের সংসদীয় কার্যক্রম কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাননি। তাই বিভিন্ন দেশের রাজনীতি, সংসদীয় ব্যবস্থা ও সামাজিক কাঠামো সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন এই সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য।
সফরে থাকা সংসদ সদস্য অবসরপ্রাপ্ত মেজর আখতারুজ্জামান বলেন, তাঁদের লক্ষ্য হলো দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত করা এবং বিভিন্ন দেশের উন্নয়ন ও কাজের পদ্ধতি সম্পর্কে জানা।
জামায়াতের প্রচার বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের জানান, ফিলিপিন্সে সফরকারী এমপিরা স্থানীয় সরকার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিদর্শন করেছেন।
### মালয়েশিয়ায় সেমিনার
সফরের শুরুতে ১৬ সেপ্টেম্বর কুয়ালালামপুরে একটি সেমিনারে অংশ নেন জামায়াতের সংসদ সদস্যরা। এতে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্স ইসলামিক স্টাডিজের (আইএআইএস) চেয়ারম্যান ও দেশটির সাবেক শিক্ষামন্ত্রী অধ্যাপক ড. মাজলি বিন মালিক বক্তব্য দেন।
মাজলি বিন মালিক তাঁর ফেসবুক পোস্টে জানান, পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত চিন্তাবিদ অধ্যাপক জিয়াউদ্দিন সরদারের ‘পোস্ট-নরমাল টাইমস’ তত্ত্ব এবং মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের ‘মাদানি’ নীতির আলোকে সমকালীন সংসদ সদস্যদের নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র পরিচালনার নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সেমিনারে আলোচনা হয়েছে।
আইএআইএস নিজেদের ওয়েবসাইটে মালয়েশিয়া সরকারের নীতিনির্ধারণী থিঙ্কট্যাংক হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিয়েছে।
### বাকিদের ইউরোপ সফরের পরিকল্পনা
জামায়াতের আন্তর্জাতিক শাখার একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা জানিয়েছেন, ডিসেম্বরের মধ্যে দলের বাকি সংসদ সদস্যদের এক বা একাধিক প্রতিনিধি দল ইউরোপ সফরে যেতে পারে। সম্ভাব্য ওই সফরে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশের সংসদ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
দলের কেন্দ্রীয় এক নেতা জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে দলের মধ্যে আলোচনা চলছে। সংসদীয় দলের মুখপাত্র নাজিবুর রহমানও বলেছেন, সুযোগ হলে দলের অন্য সদস্যরাও বিদেশ সফরে যাবেন। এ ছাড়া ডিসেম্বরের মধ্যে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানেরও একাধিক দেশ সফরের সম্ভাবনা রয়েছে বলে দলের উচ্চপর্যায়ের দুই নেতা জানিয়েছেন। দলের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের আগামী ২৬ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্র সফরের জন্য অনাপত্তিপত্র নিয়েছেন বলেও জানা গেছে।
এবারের সফরে ৩৪ সংসদ সদস্যের পাশাপাশি জামায়াতের ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিন, বিএনপি থেকে জামায়াতে যোগ দেওয়া অবসরপ্রাপ্ত মেজর আখতারুজ্জামান, তাঁর স্ত্রী এবং লেখক জিয়াউল হক রয়েছেন।
জামায়াতের নেতারা বলছেন, বিদেশ সফরের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের সংসদীয় কাঠামো, নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে ধারণা নেওয়াই তাঁদের মূল উদ্দেশ্য। তবে একই সময়ে দলের একটি বড় অংশের সংসদ সদস্যের বিদেশে অবস্থান এবং দেশের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তাঁদের অনুপস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, সে বিষয়ে দলটির পক্ষ থেকে সফরটিকে শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের কর্মসূচি হিসেবেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে।