কলাবউ স্নান ও নবপত্রিকা স্থাপনে পূজার আনুষ্ঠানিকতা
ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি ও মন্ত্রপাঠে গতকাল শুক্রবার উদ্যাপিত হয়েছে শারদীয় দুর্গোৎসবের ষষ্ঠী। সন্ধ্যায় দেবী দুর্গার আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মূল পূজার আনুষ্ঠানিকতা। আজ শনিবার মহাসপ্তমীতে রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরসহ দেশের বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ভক্তদের সমাগম হয়েছে। সকালে কলাবউয়ের মহাস্নান ও নবপত্রিকা স্থাপনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় সপ্তমীর পূজা।
শুভ শক্তির জয়, সুন্দর ও মানবিক বাংলাদেশ এবং সব ধর্মের মানুষের মধ্যে শান্তি-সম্প্রীতি বজায় রাখার প্রার্থনা নিয়ে দেবীর আরাধনায় অংশ নিচ্ছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। সমাজ থেকে হানাহানি দূর করা এবং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার আকুতিও রয়েছে তাঁদের প্রার্থনায়।
ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের মেলাঙ্গনের বেলতলায় গতকাল সকাল ৯টায় ষষ্ঠীপূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। ফুল দিয়ে সাজানো বেলগাছের নিচে রাখা হয় ফলমূল, দই, আমপাতা, বেলপাতা, দূর্বা, ফুল ও পূজার অন্যান্য উপকরণ। প্রদীপের আলো ও ধূপের ধোঁয়ার মধ্যে পুরোহিতেরা মন্ত্রপাঠ করেন। ঢাক, শঙ্খ, ঘণ্টা ও কাঁসরের বাদ্যের সঙ্গে ভক্তদের উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে মন্দির প্রাঙ্গণ।
সকাল ৯টা ৫৭ মিনিটের মধ্যে ষষ্ঠাদি কল্পারম্ভ ও ষষ্ঠীবিহিত পূজা শেষ হয়। পরে পুরোহিতেরা ভক্তদের মধ্যে শান্তির জল ছিটিয়ে দেন। অঞ্জলি শেষে পুরোহিত ধর্মদাস চট্টোপাধ্যায় সবার মঙ্গল, অমঙ্গল দূর হওয়া এবং ঘরে ঘরে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রার্থনা করেন।
সন্ধ্যায় হয় দেবী দুর্গার আমন্ত্রণ ও অধিবাস। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, কৈলাস থেকে কন্যারূপে দেবী দুর্গা মর্ত্যে আসেন অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠার জন্য। পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী, অসুরের কাছে পরাভূত দেবতাদের সম্মিলিত তেজ থেকে আবির্ভূত হন অসুরবিনাশী দেবী দুর্গা।
আজ মহাসপ্তমীতে সকাল ৭টা ৩৯ মিনিট থেকে ৯টা ৫৭ মিনিটের মধ্যে নবপত্রিকা প্রবেশ ও স্থাপন, সপ্তমাদি কল্পারম্ভ এবং বিহিত পূজার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার কথা। লালপাড় সাদা শাড়িতে সাজানো নবপত্রিকা বা কলাবউকে মন্দিরসংলগ্ন জলাশয়ে নিয়ে মন্ত্রোচ্চারণের মধ্য দিয়ে মহাস্নান করানো হয়। পরে দেবীপ্রতিমার ডান পাশে স্থাপন করে শুরু হয় মূল পূজা।
‘নবপত্রিকা’ শব্দের অর্থ নয়টি উদ্ভিদ। প্রচলিত আচার অনুযায়ী কলা, কচু, হলুদ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মানকচু ও ধান—এই নয়টি উদ্ভিদ পাতাসহ একটি কলাগাছের সঙ্গে একত্র করা হয়। বেলসহ শ্বেত অপরাজিতা লতা দিয়ে বেঁধে লালপাড় সাদা শাড়ি পরিয়ে বধূরূপ দেওয়া হয়। প্রচলিত ভাষায় এর নাম ‘কলাবউ’।
মহানগর পূজা কমিটির উপদেষ্টা মনীন্দ্র কুমার নাথ বলেন, দুর্গোৎসবের মধ্য দিয়ে তাঁরা একটি সুন্দর, সমৃদ্ধ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার বার্তা ছড়িয়ে দিতে চান। সব ধর্মের মানুষ যেন শান্তিতে বসবাস করতে পারে, সেই প্রার্থনাই করেন ভক্তরা। তাঁর ভাষ্য, মাতৃশক্তির আরাধনার পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা ও দেশের সমৃদ্ধির জন্য প্রার্থনা করা হয়। বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণ এ উৎসবকে সম্প্রীতির মিলনমেলায় পরিণত করে।
ঢাকা মহানগর পূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি গোপাল চন্দ্র দেবনাথ জানান, অঞ্জলি শেষে বাংলাদেশের সব ধর্মের মানুষের মধ্যে শান্তি, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য বজায় রাখা এবং বিশ্বজুড়ে হানাহানি বন্ধের জন্য প্রার্থনা করা হয়েছে।
পুরান ঢাকা থেকে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আসা পুণ্যার্থী সুস্মিতা দে বলেন, “সকাল সকাল এসে কলাবউ স্নান দেখেছি। ঢাকের শব্দ আর ধূপের গন্ধে সত্যি মন ভরে যায়। মায়ের কাছে একটাই প্রার্থনা, সবাই যেন শান্তিতে ও সুস্থ থাকে।”
মোহাম্মদপুর থেকে আসা শুভাশিস রায় বলেন, প্রতিবছর সপ্তমীর সকালে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে আসা তাঁদের পারিবারিক রীতিতে পরিণত হয়েছে। এখানে এলে দুর্গাপূজার প্রকৃত আবহ অনুভব করা যায়।
মন্দির প্রাঙ্গণ ও আশপাশের সড়ক সাজানো হয়েছে বর্ণিল আলো ও নানা রঙের তোরণে। মন্দিরের বাইরের অংশে বসেছে পূজার মেলা। শাঁখা, সিঁদুর, পূজার সামগ্রী, শিশুদের খেলনা, খাজা-গজা ও বাতাসাসহ নানা পণ্যের পসরা সাজিয়েছেন দোকানিরা। দর্শনার্থীদের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে মন্দিরজুড়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবকেরাও দায়িত্ব পালন করছেন।
এবার মহাসপ্তমীর তিথি শনিবার ও রোববার দুই দিন বিস্তৃত। আগামী সোমবার মহাষ্টমী, মঙ্গলবার মহানবমী এবং বুধবার বিজয়া দশমী। দশমীর দিন প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবে।
বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ ও মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, এ বছর সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা হচ্ছে। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৩৩ হাজার ৩৫৫। সে হিসাবে এবার মণ্ডপ বেড়েছে ৪৯৬টি। ঢাকা মহানগরে এবার ২৫৮টি মণ্ডপে পূজার আয়োজন করা হয়েছে। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ২৬১টি।
দুর্গাপূজায় ২৬ দফা নির্দেশনা, ডিজে ও আতশবাজি পরিহারের আহ্বান
শারদীয় দুর্গাপূজা ২০২৬ শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব করতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের পূজা উদ্যাপন কমিটিগুলোর জন্য ২৬ দফা নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ।
নির্দেশনায় পূজামণ্ডপে প্লাস্টিকের ব্যবহার পরিহার, অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা বন্ধ, উচ্চ শব্দে ডিজে ও সাউন্ড সিস্টেম বাজানো এবং আতশবাজি ও পটকা ফোটানো থেকে বিরত থাকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ-বিভ্রাট মোকাবিলায় বিকল্প বিদ্যুৎব্যবস্থা, নিরাপদ বৈদ্যুতিক সংযোগ, সিসিটিভি ক্যামেরা ও অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম রাখার নির্দেশনাও রয়েছে।
বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ শর্মা বলেন, পূজামণ্ডপে উচ্চ স্বরে ডিজে বাজানো নিষেধ করা হয়েছে। এর পরিবর্তে ধর্মীয় গান বাজানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়, নারী-পুরুষের পৃথক যাতায়াতের ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করতে বলা হয়েছে। স্বেচ্ছাসেবকদের পরিচয়পত্র ব্যবহার ও তাঁদের তালিকা সংশ্লিষ্ট থানা বা ফাঁড়িতে জমা দিতে হবে।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, বিসর্জনের সময় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে এবং সম্ভব হলে সন্ধ্যার মধ্যে বিসর্জন সম্পন্ন করতে হবে। কোনো দুর্ঘটনা বা অপরাধ ঘটলে গুজব না ছড়িয়ে পুলিশ ও কেন্দ্রীয় মনিটরিং সেলকে জানাতে হবে। জরুরি প্রয়োজনে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
সন্তোষ শর্মা স্বাক্ষরিত নির্দেশনায় দুর্গাপূজাকে শান্তি, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার উৎসব হিসেবে উল্লেখ করে সবার সহযোগিতায় আয়োজনটি নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব করার আহ্বান জানানো হয়েছে।