শেষ হলো বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। বুধবার বিদায় দেওয়া হয় দেবী দুর্গাকে। সেই সঙ্গে আসছে বছর আবারও মর্ত্যলোকে ফিরে আসবেন মা– এই প্রার্থনা জানান ভক্তরা।
সকাল থেকে ঢাকের বাদ্য আর উলুধ্বনির সঙ্গে মিশে ছিল বিদায়ের বিষাদ। দেবী দুর্গাকে বরণ করে নেওয়ার পর শেষবারের মতো তাঁর চরণে সিঁদুর ছুঁইয়ে প্রার্থনায় মগ্ন হন ভক্তরা। এর পর একে অপরের কপাল ও গালে সিঁদুর মাখিয়ে শুভ বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময়। নাচে-গানে উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করলেও মণ্ডপ ছেড়ে যাওয়ার সময় অনেকের চোখেমুখে ছিল বিষণ্নতা। দেবী বিসর্জনের দিনটিতে বিষাদের পাশাপাশি উৎসবমুখর হয়ে উঠেছিল সারাদেশ। হিন্দু সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে উৎসবে যোগ দেন অন্যান্য ধর্মের মানুষও। দেবীর চরণে সিঁদুর ছুঁইয়ে প্রার্থনা, একে অপরকে সিঁদুর পরানো এবং শুভ বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে কাটে দিনের প্রথম ভাগ। তবে মণ্ডপ ছেড়ে যাওয়ার সময় অনেকের চোখেমুখে ছিল বিষণ্নতা। ভক্তদের প্রত্যাশা, আগামী বছর আবারও মর্ত্যে ফিরে আসবেন দেবী দুর্গা।
এবার ঢাকা মহানগরীর ২৫৮টিসহ সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি পূজামণ্ডপে দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত শুক্রবার ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া উৎসব শেষ হলো ছয় দিন পর। সপ্তমী তিথি দুই দিন হওয়ায় এবার প্রচলিত পাঁচ দিনের পরিবর্তে ছয় দিন ধরে চলে দুর্গাপূজা।
সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস ও পঞ্জিকামতে, এবার দেবী দুর্গার আগমন ঘোটকে বা ঘোড়ায়, আর গমন নৌকায়। বিশ্বাস অনুযায়ী, ঘোটকে আগমনের ফল ফসল ও শস্যহানি এবং নৌকায় গমনের ফল শস্যবৃদ্ধি।
রাজধানীতে বর্ণিল আয়োজন
বিজয়া দশমীর সকালে রাজধানীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ছিল ভক্তদের ভিড়। বনানীর কামাল আতাতুর্ক পার্কের গুলশান-বনানী পূজামণ্ডপ, ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির, রমনা কালী মন্দির ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল মন্দিরে চলে দেবী বরণ, সিঁদুর খেলা ও বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা। সকাল ৯টা ৫৭ মিনিটের মধ্যে দশমী বিহিত পূজা শেষে দর্পণ বিসর্জন দেওয়া হয়। পরে নারীরা ফুল, পান, মিষ্টি ও সিঁদুর দিয়ে দেবীকে বরণ করেন। একে অপরের কপাল ও গালে সিঁদুর মাখিয়ে শুভ বিজয়ার শুভেচ্ছা জানান তাঁরা। ঢাকের তালে নাচ, উলুধ্বনি ও মিষ্টিমুখে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে মণ্ডপগুলো।
ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে ভক্তদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। দেবীকে বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে মণ্ডপে মণ্ডপে চলে শুভেচ্ছা বিনিময়। ছোটরা বড়দের প্রণাম করে আশীর্বাদ নেয়, সমবয়সীরা কোলাকুলি করে। আনন্দের মধ্যেও দেবীকে বিদায়ের বেদনা অনুভব করেন ভক্তরা।
বন্ধুদের সঙ্গে নাচে-গানে অংশ নেওয়া তরুণ সৌমিক মজুমদার বলেন, ‘বিদায়ের সময় মন খারাপ হয়। কিন্তু মা আবার আসবেন—এই বিশ্বাস আমাদের আনন্দ দেয়। আসছে বছর আবার দেখব মাকে—এই প্রত্যাশা নিয়েই বিদায়ের মুহূর্তটাকে স্মরণীয় করে রাখি।’
বুড়িগঙ্গায় প্রতিমা বিসর্জন
দুপুরের পর রাজধানীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপ থেকে ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহনে প্রতিমা নিয়ে ভক্তরা সমবেত হন ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির এলাকায়। বিকেল ৪টার দিকে রাজঘট ও নবপত্রিকা আনার পর শুরু হয় কেন্দ্রীয় বিজয়া শোভাযাত্রা। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ও মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটিসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতাদের নেতৃত্বে শোভাযাত্রায় অংশ নেন নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর ও তরুণেরা। অনেকে দুর্গা, শিব ও মহিষাসুরসহ পৌরাণিক চরিত্রের সাজে যোগ দেন।
ঢাকঢোল, নাচ-গান ও উলুধ্বনিতে মুখর শোভাযাত্রাটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, দোয়েল চত্বর, হাইকোর্ট মাজার, নগর ভবন, গুলিস্তান ও বাহাদুর শাহ পার্ক হয়ে বুড়িগঙ্গার ওয়াইজঘাটে পৌঁছায়। নদীতে নৌকায় করে প্রতিমা নিয়ে মাঝনদীতে বিসর্জন দেওয়া হয় দেবী দুর্গাকে। এ আনুষ্ঠানিকতা চলে রাত পর্যন্ত। পরে শান্তিজল গ্রহণ, শুভেচ্ছা বিনিময় ও মিষ্টি বিতরণের মধ্য দিয়ে শেষ হয় উৎসব।
বিজয়া দশমী উপলক্ষে রাজধানীতে নেওয়া হয় কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা। পুলিশ, বিজিবি, এসআরবি ও গোয়েন্দা সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির থেকে ওয়াইজঘাট পর্যন্ত শোভাযাত্রার পথে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। দুপুর থেকে পলাশীর মোড়ের আশপাশে যান চলাচলও নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
কক্সবাজারে সাগরে বিসর্জন
কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, বিকেলে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের লাবণী পয়েন্টে দেবী দুর্গার প্রতিমা বিসর্জন দেন ভক্তরা। এ সময় সৈকতে বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম ঘটে। পর্যটকেরাও বালুচরে দাঁড়িয়ে বিসর্জনের দৃশ্য উপভোগ করেন। বিসর্জনের আগে বিকেল ৪টায় বিজয়ামঞ্চে জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি উদয় শংকর পাল মিঠুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান হয়। এতে ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল উদ্দীন, কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য শামীম আরা স্বপ্না, জেলা প্রশাসক আ. মান্নান, পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান, জেলা বিএনপির সভাপতি শাহজাহান চৌধুরীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
উদয় শংকর পাল মিঠু জানান, এবার জেলায় ৩২৪টি পূজামণ্ডপের মধ্যে ১৫৫টিতে প্রতিমা পূজা এবং ১৬৯টিতে ঘটপূজা হয়েছে। বুধবার বিকেল থেকে সৈকতে অন্তত ৪০০টি প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়।
পতেঙ্গায় প্রতিমা বিসর্জন
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, বুধবার দুপুরের পর থেকে নগরের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে প্রতিমা বিসর্জন শুরু হয়। নগর ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ট্রাক, মিনি ট্রাকসহ নানা যানবাহনে প্রতিমা নিয়ে আসেন ভক্তরা। বিসর্জন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। সার্বিক কার্যক্রম তদারকি করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞাসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা। পূজা কমিটির তথ্যমতে, এবার চট্টগ্রামে ২ হাজার ২৭৪টি মণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে দুর্গোৎসব। ভক্তদের প্রার্থনা—অশুভ শক্তির বিনাশ, শান্তি ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠা এবং আগামী বছর আবারও দেবী দুর্গার আগমন।