সৌদি আরবের বিভিন্ন কারাগারে বন্দি রয়েছেন ২ হাজার ৪৬১ জন বাংলাদেশি। তাঁদের মধ্যে ২২ জনের নামের পাশে ‘দণ্ডপ্রাপ্ত’ লেখা থাকলেও কী সাজা দেওয়া হয়েছে, তা উল্লেখ নেই। কারও কারাদণ্ড হয়েছে কি না, হলে কত বছরের, কিংবা কারও মৃত্যুদণ্ড হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পায়নি জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেট। সম্প্রতি দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ওই দুই বাংলাদেশি হলেন নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সুইটি আক্তার। সৌদি আরবের কর্তৃপক্ষ গত ১৪ অক্টোবর মক্কা অঞ্চলে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কথা জানায়। কিন্তু তার আগে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাঠানো বন্দিদের তালিকায় তাঁদের নাম থাকলেও সাজা সম্পর্কে কোনো তথ্য ছিল না বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ কনস্যুলেট। বিষয়টি সামনে আসার পর সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে বিচারিক নথি ও রায়ের বিস্তারিত জানতে চেয়েছে বাংলাদেশ।
সৌদি আরবে বন্দি অন্য ২০ বাংলাদেশির ক্ষেত্রেও একই ধরনের তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। তাঁদের কী সাজা হয়েছে, তা জানতে গত ১৯ অক্টোবর জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেট সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মক্কা অঞ্চল শাখায় চিঠি পাঠায়। চিঠিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে রায়ের সারসংক্ষেপ দ্রুত পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়। কনস্যুলার দায়িত্ব পালন এবং বন্দিদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে এসব তথ্য জরুরি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
কনস্যুলেটের পাঠানো চিঠির সঙ্গে নয় পৃষ্ঠার একটি তালিকাও সংযুক্ত ছিল। তালিকায় সংশ্লিষ্ট বন্দিদের বিবরণ রয়েছে। তবে চিঠিতে কতজনের সাজা সম্পর্কে তথ্য নেই, তা আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়নি। তালিকাটি পর্যালোচনা করে ২২ জনের ক্ষেত্রে রায়ের সারসংক্ষেপের ঘর ফাঁকা পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দণ্ডপ্রাপ্ত লেখা, কিন্তু রায়ের বিবরণ নেই
গত ৩০ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেটকে ২ হাজার ৪৬১ জন বাংলাদেশি বন্দির তালিকা পাঠায়। তালিকায় পশ্চিম সৌদি আরবের বিভিন্ন কারাগারে আটক বাংলাদেশিদের তথ্য রয়েছে। তাঁদের কারও বিরুদ্ধে মামলা বিচারাধীন, আবার কারও ক্ষেত্রে আদালতের রায় হয়েছে।
তালিকাটি পরীক্ষা করতে গিয়ে কনস্যুলেটের কর্মকর্তারা দেখতে পান, কয়েকজনের ‘অবস্থা’ বা স্ট্যাটাসের ঘরে ‘দণ্ডপ্রাপ্ত’ লেখা থাকলেও ‘রায়ের সারসংক্ষেপ’ ঘরে কোনো তথ্য নেই। ফলে ওই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আদালত কী রায় দিয়েছেন, শাস্তির ধরন কী এবং কারাদণ্ড হয়ে থাকলে তার মেয়াদ কত—এসব জানা সম্ভব হয়নি।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ‘দণ্ডপ্রাপ্ত’ শব্দটি নিজে থেকে মৃত্যুদণ্ডের প্রমাণ নয়। এর অর্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো আদালত সাজা দিয়েছেন; কিন্তু সাজাটি কারাদণ্ড, অন্য কোনো শাস্তি, নাকি মৃত্যুদণ্ড—তা জানতে রায়ের নথি প্রয়োজন। ফলে ২২ জনের মধ্যে কারও মৃত্যুদণ্ড হয়েছে কি না, তা সরকারি নথি ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের ঘটনা এই তথ্যের ঘাটতির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করেছে। তাঁদের নামও সৌদি কর্তৃপক্ষের পাঠানো বন্দিদের তালিকায় ছিল। কিন্তু তালিকায় মৃত্যুদণ্ডের উল্লেখ না থাকায় কনস্যুলেট আগে থেকে তাঁদের চূড়ান্ত সাজা সম্পর্কে জানতে পারেনি বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর সামনে আসে তথ্যের ঘাটতি
সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ১৪ অক্টোবর দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তথ্য প্রকাশ করে। সৌদি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, মক্কার একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কর্মকাণ্ডে’ জড়িত থাকার অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল। আদালত তাঁদের দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেন এবং পরবর্তী প্রক্রিয়া শেষে তা কার্যকর করা হয় বলে সৌদি কর্তৃপক্ষের বিবৃতিতে জানানো হয়।
তবে প্রকাশিত বিবৃতিতে অভিযোগের সুনির্দিষ্ট বিবরণ, সংশ্লিষ্ট মসজিদের পরিচয় কিংবা মামলায় উপস্থাপিত প্রমাণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়নি। বাংলাদেশের কনস্যুলেটও সংশ্লিষ্ট বিচারিক নথি হাতে না পাওয়া পর্যন্ত মামলার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেনি।
দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশ্যে আসার পর বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ জানতে পারে, তাঁদের নাম আগে পাঠানো বন্দিদের তালিকায় থাকলেও সাজা সম্পর্কে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। এরপর রায় ও বিচারপ্রক্রিয়ার বিস্তারিত জানতে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু হয়।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা হয়েছিল, আদালত কী রায় দিয়েছিলেন এবং কী প্রক্রিয়ায় সেই রায় চূড়ান্ত হয়েছিল। এসব তথ্য পাওয়া গেলে দুই বাংলাদেশির মামলার পাশাপাশি একই তালিকায় থাকা অন্য বন্দিদের পরিস্থিতি সম্পর্কেও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
কনস্যুলার সহায়তা কেন গুরুত্বপূর্ণ
বিদেশে কোনো বাংলাদেশি নাগরিক গ্রেপ্তার হলে তাঁর পরিবারের পক্ষে মামলার অগ্রগতি, আইনজীবী নিয়োগ, আদালতের রায় কিংবা আপিলের সুযোগ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন হতে পারে। ভাষাগত সমস্যা, আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং বিদেশের বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে অজ্ঞতা এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট দেশের আইন ও নিয়মের মধ্যে থেকে দূতাবাস বা কনস্যুলেট বন্দির খোঁজ নেওয়া, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগে সহায়তা করা, আইনগত সহায়তা পাওয়ার সুযোগ সম্পর্কে তথ্য দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে কনস্যুলেট নিজে অন্য দেশের আদালতের রায় বাতিল করতে পারে না কিংবা সে দেশের বিচারিক প্রক্রিয়ার বিকল্প হতে পারে না।
নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের ঘটনা নিয়ে প্রকাশিত কনস্যুলার নথির বরাতে সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, তাঁদের পরিবার বা তাঁরা নিজেরা কনস্যুলেটের কাছে আইনি সহায়তার আবেদন করেছিলেন—এমন কোনো তথ্য কনস্যুলেটের কাছে ছিল না। একই সঙ্গে সৌদি কর্তৃপক্ষ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেটকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছিল কি না, সে প্রশ্নও সামনে এসেছে।
তবে কোনো বন্দি কনস্যুলার সহায়তার আবেদন না করলেও তাঁর সাজা সম্পর্কে তথ্য জানার গুরুত্ব কমে যায় না। বিশেষত মৃত্যুদণ্ডের মতো চূড়ান্ত শাস্তির ক্ষেত্রে মামলার নথি, রায়ের বিবরণ ও বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকা জরুরি। এসব তথ্য ছাড়া পরিবার যেমন অনিশ্চয়তায় থাকে, তেমনি সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
আরও বন্দির মামলা নিয়ে প্রশ্ন
সৌদি আরবের বিভিন্ন কারাগারে আটক বাংলাদেশিদের মধ্যে অপরাধের ধরন ও মামলার অবস্থা এক নয়। কারও বিচার চলছে, কারও সাজা হয়েছে, আবার কারও বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রকৃতি ও বিচারিক অগ্রগতি সম্পর্কে পরিবারের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য নাও থাকতে পারে। তাই ২২ জনের রায়ের সারসংক্ষেপ চাওয়ার পাশাপাশি বন্দিদের তালিকার তথ্য কতটা পূর্ণাঙ্গ, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
কনস্যুলেটের হাতে রায়ের অনুলিপি ও বিস্তারিত তথ্য এলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শাস্তির ধরন, কারাদণ্ডের মেয়াদ, আপিলের সুযোগ এবং অন্যান্য আইনি বিষয় যাচাই করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি যেসব বন্দির সাজা চূড়ান্ত হয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ ও প্রয়োজনীয় কনস্যুলার সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রেও তথ্যগুলো কাজে আসতে পারে।
সৌদি কর্তৃপক্ষের পাঠানো তালিকায় ২২ জনের সাজা সম্পর্কে তথ্য না থাকার বিষয়টি এখন শুধু প্রশাসনিক নথির ঘাটতি নয়; এটি বিদেশে বন্দি বাংলাদেশিদের বিচারিক অবস্থার বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়ার প্রশ্নও সামনে এনেছে। বিশেষ করে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর অন্য বন্দিদের সাজা নিয়ে অনিশ্চয়তা দূর করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেটের চিঠির জবাবে সৌদি কর্তৃপক্ষ কী তথ্য দেয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। সেই জবাব না পাওয়া পর্যন্ত ওই ২২ জনের কার কী সাজা হয়েছে, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তবে রায়ের সারসংক্ষেপ ও সংশ্লিষ্ট বিচারিক নথি পাওয়া গেলে তাঁদের প্রত্যেকের আইনি অবস্থান স্পষ্ট হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী কনস্যুলার পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।