ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে নিহত ও আহতদের পরিবারের সদস্যদের আশ্বস্ত করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য উপায়ে আন্দোলনে সংঘটিত প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করা হবে।
বুধবার (৫ আগস্ট) সকালে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের উদ্বোধন শেষে ‘জুলাই ৩৬’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে প্রতিটি অপরাধের বিচার অত্যন্ত জরুরি। তিনি জানান, গত ১৭ বছর এবং জুলাই আন্দোলনে নিহত ও গুম-খুনের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে তাদের নিজ নিজ এলাকায় একটি করে প্রতিষ্ঠানের নামকরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর একক রাজনৈতিক বয়ান প্রতিষ্ঠার স্থান হওয়া উচিত নয়। তার ভাষায়, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত নায়ক বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী জনগণ।
তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রাম, আর ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার আন্দোলন। একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধাদের মতোই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদেরও জনগণ কখনো ভুলবে না।
দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টা সম্পর্কে সতর্ক করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন ইস্যুতে অযথা উত্তেজনা সৃষ্টি করে কেউ যেন অনিচ্ছাকৃতভাবে পতিত স্বৈরাচারের পুনরুত্থানের পথ সুগম না করেন।
তিনি দীর্ঘ দেড় দশকের শাসনামলে গুম, খুন, অপহরণ, নির্যাতন ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের কথা উল্লেখ করে বলেন, জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে হাজারো ছাত্র-জনতা, নারী ও শিশু প্রাণ হারিয়েছেন। গণতন্ত্রকামী মানুষের ওপর হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণসহ নানা নৃশংসতার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে জনগণের সংগ্রাম, আত্মত্যাগ, সাহস ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার ইতিহাস তুলে ধরবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, শুধু জুলাই গণঅভ্যুত্থান নয়, বাংলাদেশের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাসও জাদুঘরে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
তিনি ইতিহাস উপস্থাপনে নিরপেক্ষতা ও সত্যতার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, অসম্পূর্ণ, অতিরঞ্জিত বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বয়ান ইতিহাসকে দুর্বল করে। তাই জাদুঘরের তথ্য বাংলা ছাড়াও ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষায় উপস্থাপনের আহ্বান জানান তিনি।
আহত জুলাই যোদ্ধাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকারি হাসপাতালে তাদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। গুরুতর আহতদের থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, তুরস্ক ও রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বর্তমানে ৫০ জন জুলাই যোদ্ধা বিদেশে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
তিনি আরও জানান, গেজেটভুক্ত ১৩ হাজারের বেশি জুলাই যোদ্ধাকে নিজস্ব ব্যাংক হিসাবে শ্রেণিভিত্তিক মাসিক সম্মানী ভাতা দেওয়া হচ্ছে এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে।
রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশ পুনর্গঠনের লক্ষ্যে বিএনপির ৩১ দফা, নির্বাচনী ইশতেহার এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি গণভোটের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটিও কাজ করছে।
বক্তব্যের শেষে তিনি গণঅভ্যুত্থানে জনগণের পাশে দাঁড়ানো সেনাবাহিনীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ আর কখনো কোনো তাবেদার রাষ্ট্রে পরিণত হবে না।”
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। অনুষ্ঠানে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, কূটনীতিক, জুলাই যোদ্ধা, শহীদ পরিবারের সদস্য, গণমাধ্যমকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
শু/আজা