বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘জুলাই অভ্যুত্থান দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বুধবার সকাল ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শুরু হওয়া এ সংঘর্ষে উভয় পক্ষই অন্তত ২০ জন আহত হওয়ার দাবি করলেও আহত ১০ জনকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনার জন্য পরস্পরকে দায়ী করেছে দুই ছাত্রসংগঠন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে ক্যাম্পাসে পৃথক কর্মসূচি পালনের সময় দুই সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রথমে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে তা ধাক্কাধাক্কি, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া এবং সংঘর্ষে রূপ নেয়। সংঘর্ষের সময় ক্যাম্পাসে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণ শিক্ষার্থীরা নিরাপদ স্থানে সরে যান।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মেহেদি হাসান সোহাগ বলেন, দুই পক্ষের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি থেকেই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে প্রশাসনের সদস্যরাও আহত হয়েছেন। তিনি বলেন, “দুই পক্ষের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। এ নিয়ে দুই পক্ষই একে অপরকে আঘাত করেছে। আমরা দুই পক্ষকেই থামিয়েছি। থামাতে গিয়ে আমরাও আহত হয়েছি।”
আহতদের মধ্যে সাফওয়ান (২১), শিফাত (২৭), আল আমিন (২৫), হেলাল (২৬), রবিউল (২৩), মনিরুল ইসলাম (২৬), হাফিজ (২৩), আব্দুল্লাহ আল বাকি (২৪), হৃদয় (২৩) ও তরিকুল ইসলাম (২৪) বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের ইন্টার্ন চিকিৎসক মো. সাইফ জানান, আহতদের মধ্যে কয়েকজন মাথায় আঘাত পেয়েছেন। তাদের সিটি স্ক্যান করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে প্রাথমিকভাবে কারও আঘাত আশঙ্কাজনক বলে মনে হয়নি।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সহ-সাধারণ সম্পাদক তরিকুল ইসলাম আজমাইন অভিযোগ করেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে ছাত্রদলের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ চলাকালে ছাত্রশিবির বহিরাগতদের নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করে। বাধা দিলে শিবিরের নেতাকর্মীরা লাঠি ও রড দিয়ে হামলা চালায়। এতে ছাত্রদলের ১০ থেকে ১১ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।
একই ধরনের অভিযোগ করেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসিবুর রহমান সিফাত। তিনি বলেন, শিবিরের বহিরাগতদের মিছিল করতে নিষেধ করায় ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালানো হয়।
অন্যদিকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছাত্রশিবিরের কর্মী মো. আল আমিন অভিযোগ করেন, শহীদদের স্মরণে শান্তিপূর্ণ মিছিল চলাকালে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা অতর্কিত হামলা চালায়। তিনি দাবি করেন, ভিসি, প্রক্টর ও শিক্ষকরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও ছাত্রদলের হামলায় শাখা শিবিরের সভাপতি মনিরুল ইসলামসহ ৯ থেকে ১০ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।
শিবিরের মিছিলে বহিরাগতদের অংশগ্রহণের অভিযোগ প্রসঙ্গে আল আমিন বলেন, ক্যাম্পাসসংলগ্ন এলাকায় থাকা কয়েকজন সমর্থক মিছিলে যুক্ত হয়ে থাকতে পারেন। তবে তাদের বহিরাগত হিসেবে চিহ্নিত করে মারধর করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
ঘটনার সময় উপস্থিত থাকা বরিশাল মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার বেলাল হোসাইন বলেন, সংঘর্ষের খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহযোগিতায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বর্তমানে ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে এবং পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, সংঘর্ষের প্রকৃত কারণ উদঘাটনে ঘটনাটি তদন্ত করা হবে। ক্যাম্পাসের সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে। তদন্তে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে আইনগত ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় শিক্ষাঙ্গনের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শিক্ষাবিদরা বলছেন, মতপার্থক্য ও সাংগঠনিক বিরোধ যেন সহিংসতায় রূপ না নেয়, সে জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং ছাত্রসংগঠনগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি।