ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের আরও বিস্তৃত এলাকায়। একদিকে ইরানকে ঘিরে হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সংকটে, অন্যদিকে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের অগ্রযাত্রায় লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার বাব আল-মানদেবও নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এর মধ্যেই ইরাক থেকে পরিচালিত ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর সৌদি আরব তাদের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক সহায়তা চেয়েছেন। তবে আপাতত সরাসরি মার্কিন সামরিক অভিযান চালানোর পরিবর্তে সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্য ও টার্গেটিং সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওয়াশিংটন।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনটি হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পাইপলাইনটির মাধ্যমে প্রতিদিন সর্বোচ্চ প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহন করা সম্ভব, যা বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ৫ শতাংশের সমান।
গত ১০ সেপ্টেম্বর ইরাক থেকে উৎক্ষেপণ করা ড্রোন সৌদি আরবের মদিনা অঞ্চলের দক্ষিণে পাইপলাইন ও সংশ্লিষ্ট পাম্পিং স্থাপনায় হামলা চালায়। এতে কয়েকজন আহত হন এবং স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি হয়। এরপর প্রকৌশলীরা ক্ষয়ক্ষতি পর্যালোচনা ও মেরামতের কাজ শুরু করলে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে পুরো পাইপলাইন নেটওয়ার্কের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় রিয়াদ।
হামলার উৎস ইরাকের ভূখণ্ডে ছিল বলে সৌদি আরব ও ইরাক উভয় পক্ষই জানিয়েছে। এ ঘটনার পর ইরাকের সরকার মাইসান প্রদেশের একজন সামরিক কমান্ডারকে বরখাস্ত করে এবং সীমান্তবর্তী একটি এলাকা বন্ধ করে দেয়। তবে হামলার পেছনে কারা ছিল, তা নিয়ে এখনো চূড়ান্তভাবে কোনো পক্ষের দায় নির্ধারণ করা হয়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অবশ্য বলেছেন, হামলার পেছনে ইরানের থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে ইরাকের বক্তব্যে হামলার উৎস হিসেবে তাদের ভূখণ্ডের কথা বলা হয়েছে।
পেরিম দ্বীপে হুথিদের নিয়ন্ত্রণ
সৌদি তেল অবকাঠামোর ওপর হামলার পাশাপাশি ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে দ্রুত অগ্রসর হয়েছে ইরান-সমর্থিত হুথি বাহিনী। ইয়েমেনের সরকারি কর্মকর্তাদের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, হুথিরা বাব আল-মানদেব প্রণালির মাঝখানে অবস্থিত কৌশলগত পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। একই সঙ্গে তারা বাব আল-মানদেবের কাছের উপকূলীয় শহর ধুবাবেও প্রবেশ করেছে।
পেরিম বা মায়ুন দ্বীপটি লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ হুথিদের আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ওপর নজরদারি ও হামলার সক্ষমতা বাড়াতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ার পর বাব আল-মানদেব এখন সৌদি আরব ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পেরিম দ্বীপ ও আশপাশের উপকূলে অবস্থান সুসংহত করতে পারলে হুথিরা জাহাজ চলাচলের ওপর চাপ বাড়াতে সক্ষম হবে। কারণ দ্বীপটি থেকে প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের ওপর নজরদারি এবং স্বল্পপাল্লার ড্রোন বা অন্যান্য অস্ত্র ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রায় ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের বড় অংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। এতে প্রায় ২০২২ সাল থেকে চলা যুদ্ধবিরতির কাঠামোও কার্যত ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
ট্রাম্পের কাছে সৌদি যুবরাজের আবেদন
হুথিদের অগ্রযাত্রা এবং সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলার আশঙ্কা বাড়ায় মোহাম্মদ বিন সালমান ট্রাম্পের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেন। সৌদি পক্ষ হুথিদের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের অনুরোধ জানালেও ট্রাম্প প্রশাসন আপাতত সরাসরি হামলায় যেতে রাজি হয়নি।
মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, ওয়াশিংটন সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণে সহায়তা করছে। তবে ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি মার্কিন সামরিক হামলার পরিকল্পনা এখনো নেই। লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হুমকি আরও বড় আকার ধারণ করলে পরিস্থিতি পরিবর্তন হতে পারে।
সৌদি আরবের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে কারণ একই সময়ে দেশের পূর্ব-পশ্চিম তেল পরিবহন ব্যবস্থা এবং পশ্চিমে লোহিত সাগরের বিকল্প রপ্তানি পথ—দুই দিকেই ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, সংঘাতের কারণে সৌদি অপরিশোধিত তেল সরবরাহ কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে নিচু পর্যায়ে নেমেছে।
হরমুজ নিয়ে ওমানের বৈঠক
হরমুজ প্রণালির সংকট সমাধানে সোমবার ওমানে ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতিনিধিদের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ওমান কয়েক মাস ধরে এ বিষয়ে মধ্যস্থতা করছে। বৈঠকে ইরান, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের দেশগুলো এবং ইরাকের প্রতিনিধিদের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। তবে আলোচনার ফল নিয়ে আশাবাদ খুব সীমিত। রয়টার্সকে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা বলেছেন, সোমবারের বৈঠক থেকে হরমুজ নিয়ে কোনো স্বাক্ষরিত চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ইরান চায় প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনায় তাদের ভূমিকা স্বীকৃত হোক এবং জাহাজ চলাচলের বিষয়ে তেহরানের শর্তগুলো মানা হোক।
ইরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, সামরিক হুমকি বন্ধ, ইরানের বিরুদ্ধে হামলা বন্ধ, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং জব্দ করা সম্পদ মুক্তিসহ একাধিক শর্ত পূরণ করতে হবে। আগস্টে ইরান যে শর্তগুলো প্রকাশ করেছিল, তার সঙ্গে হরমুজের ব্যবস্থাপনা ও জাহাজ চলাচলের প্রশ্নটিও যুক্ত হয়েছে।
তবে ইরান–ওমানের সম্ভাব্য সমঝোতা মানেই হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে যাচ্ছে না। সর্বশেষ এক ইরানি সূত্র জানিয়েছে, ওয়াশিংটন তেহরানের শর্তগুলো মেনে না নেওয়া পর্যন্ত প্রণালির পূর্ণ পুনরায় উন্মুক্ত করার প্রশ্নে অগ্রগতি হবে না।
ফলে একদিকে হরমুজ প্রণালির সংকট, অন্যদিকে বাব আল-মানদেবের ওপর হুথিদের নিয়ন্ত্রণ এবং সৌদি তেল অবকাঠামোর ওপর হামলা—এই তিনটি পরিস্থিতি একসঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন চাপ তৈরি করেছে। গত কয়েক দিনে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ১০০ ডলারের কাছাকাছি বা তার ওপরে উঠেছে। বিশ্বের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ একই সময়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ায় জ্বালানি ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের ঝুঁকিও দ্রুত বাড়ছে।