জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ভাষণ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন বিভিন্ন দেশের কয়েক ডজন প্রতিনিধি। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ও ইরানের বিরুদ্ধে হামলা নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনার মধ্যেই বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কে এই নজিরবিহীন মাত্রার ওয়াকআউটের ঘটনা ঘটে। তবে কূটনীতিকদের বেরিয়ে যাওয়া উপেক্ষা করে বক্তব্য চালিয়ে যান নেতানিয়াহু। বরং প্রতিবাদকারীদের ‘নৈতিক কাপুরুষ’ আখ্যা দিয়ে ঘোষণা দেন, ইসরায়েল লড়াই চালিয়ে যাবে এবং শেষ পর্যন্ত জয়ী হবে।
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে নেতানিয়াহু মঞ্চে ওঠার পরপরই বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা সারিবদ্ধভাবে হল থেকে বেরিয়ে যেতে থাকেন। এতে অধিবেশন কক্ষের বড় একটি অংশ ফাঁকা হয়ে যায়। নেতানিয়াহু বেরিয়ে যাওয়া প্রতিনিধিদের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘আর কোনো নৈতিক কাপুরুষ যদি এই হলে থেকে থাকেন, তাহলে দয়া করে এখনই বেরিয়ে যান।’ এরপর তিনি বলেন, ‘আপনারা আমাকে এখানে আসা থেকে থামাতে চেয়েছিলেন। আপনারা আমাকে চুপ করাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আপনারা পারবেন না।’
প্রায় ৪০ মিনিটের ভাষণে নেতানিয়াহু গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে আত্মরক্ষার লড়াই হিসেবে তুলে ধরেন। ইসরায়েল গাজায় গণহত্যা চালিয়েছে—এমন অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন, ‘ইসরায়েল গণহত্যা করেনি; বরং ইসরায়েল গণহত্যা প্রতিহত করেছে।’ গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনার পাশাপাশি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান নিয়েও সাফাই দেন তিনি।
নেতানিয়াহুর ভাষণের কয়েক ঘণ্টা আগে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেন ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। যুক্তরাষ্ট্র ভিসা না দেওয়ায় তিনি নিউইয়র্কে সশরীরে উপস্থিত হতে পারেননি। সাধারণ পরিষদ ভোট দিয়ে তাঁকে ভিডিও লিংকের মাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার অনুমতি দেয়।
আব্বাস তাঁর বক্তব্যে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ এবং ফিলিস্তিনিদের ভূমি থেকে উচ্ছেদের অভিযোগ তোলেন। তাঁর ভাষ্য, এসব নীতি ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধানের অন্যতম ভিত্তি দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের সম্ভাবনাকে আরও সংকুচিত করছে। গাজার মানবিক পরিস্থিতি নিয়েও তিনি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তোলেন।
জাতিসংঘে নেতানিয়াহু শুধু ফিলিস্তিনের নেতৃত্ব নয়, তাঁর সমালোচক অন্যান্য বিশ্বনেতাকেও আক্রমণ করেন। ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মতো ইউরোপীয় দেশগুলো ইসরায়েলের বিরুদ্ধে উপনিবেশবাদের অভিযোগ তুলছে—এ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানকেও আক্রমণ করে হামাসকে সমর্থনের অভিযোগ তোলেন নেতানিয়াহু।
এরদোয়ান এর আগে জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে গাজা ও পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের পরিস্থিতির তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। তুরস্ক অবশ্য নেতানিয়াহুর অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানিও বাদ যাননি নেতানিয়াহুর সমালোচনা থেকে। মামদানি এর আগে বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতার মধ্যে তাঁর ক্ষমতা থাকলে নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নেবেন। পরে অবশ্য তিনি স্বীকার করেন, মেয়র হিসেবে তাঁকে গ্রেপ্তার করার আইনি ক্ষমতা নেই। চলতি সপ্তাহে মামদানি নেতানিয়াহুকে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ‘ভয়াবহ গণহত্যার স্থপতি’ বলে আখ্যা দেন। জবাবে নেতানিয়াহু তাঁর বিরুদ্ধে নিউইয়র্কের ইহুদি সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার অভিযোগ তোলেন। মামদানির কার্যালয় নেতানিয়াহুর বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছে।
জাতিসংঘের ভেতরে এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যেই ভবনের বাইরে চলছিল নেতানিয়াহুবিরোধী বিক্ষোভ। তাঁর ভাষণের আগে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদরদপ্তরের বাইরে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন প্রায় ২০০ মানুষ। ফিলিস্তিনপন্থি ইহুদি অধিকার সংগঠন ‘জুইশ ভয়েস ফর পিস’-এর আহ্বানে আয়োজিত কর্মসূচিতে অভিনেতা, রাজনীতিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বিভিন্ন অধিকারকর্মী অংশ নেন। তাঁদের টি-শার্টে ‘বোমা নয়, মানুষের পেছনে অর্থ ঢালুন’, ‘যুদ্ধ নয়’ এবং ‘ফিলিস্তিনের মুক্তি চাই’—এ ধরনের স্লোগান লেখা ছিল।
বিক্ষোভকারীদের কারণে আশপাশের সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে পুলিশ লাউডস্পিকারে তাঁদের সরে যেতে নির্দেশ দেয়। কেউ কেউ ফুটপাতে চলে গেলেও একটি বড় অংশ সড়কে বসে স্লোগান দিতে থাকেন। পরে পুলিশ একে একে তাঁদের আটক করে হাত পেছনে বেঁধে বাসে তুলে নেয়। Reuters-এর হিসাবে, ওই ঘটনায় অন্তত ৩০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন অস্কারজয়ী অভিনেত্রী সুসান সারানডন, এমিজয়ী অভিনেত্রী হান্না আইনবাইন্ডার, ডেমোক্রেটিক পার্টির কংগ্রেস প্রার্থী ডারিয়ালিজা অ্যাভিলা শেভালিয়ের এবং নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিলের সদস্য চি অসে।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মানিজে মোরাদিয়ান বলেন, গাজায় যা ঘটছে এবং জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক মঞ্চ ব্যবহার করে নেতানিয়াহু যেভাবে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পক্ষে বক্তব্য দিচ্ছেন, তার বিরুদ্ধে কথা বলা তাঁদের দায়িত্ব।
সুসান সারানডন দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনপন্থি বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে আসছেন। ‘ডেড ম্যান ওয়াকিং’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি অস্কার পেয়েছেন। অন্যদিকে ‘হ্যাক্স’ সিরিজের অভিনেত্রী হান্না আইনবাইন্ডারও গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের প্রকাশ্য সমালোচক।
জাতিসংঘে নেতানিয়াহুর ভাষণের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর এটিই দেশটির প্রথম সাধারণ নির্বাচন। Reuters-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক সমালোচনা মোকাবিলার পাশাপাশি দেশের ভোটারদের উদ্দেশেও বার্তা দেওয়ার সুযোগ হিসেবে নেতানিয়াহু জাতিসংঘের মঞ্চটি ব্যবহার করেছেন। তাঁর ভাষণ ইসরায়েলের প্রধান চারটি টেলিভিশন চ্যানেলে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।
ভাষণে নেতানিয়াহু ইসরায়েলকে ঘিরে আন্তর্জাতিক সমালোচনার জবাব দেওয়ার পাশাপাশি তাঁর সরকারের সামরিক নীতির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বেরও প্রশংসা করেন। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানকে তিনি নিজেদের নিরাপত্তার পাশাপাশি বৃহত্তর আন্তর্জাতিক স্বার্থ রক্ষার পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরেন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ ইসরায়েলি নিহত এবং ২৫১ জন জিম্মি হন বলে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। এর পর গাজায় ইসরায়েলের ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু হয়। গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের হিসাবে, যুদ্ধে নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা ৭৩ হাজার ছাড়িয়েছে। এই হিসাবে যোদ্ধা ও বেসামরিক নিহতদের আলাদা করা হয়নি। ইসরায়েল গণহত্যার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলছে, তাদের সামরিক অভিযান হামাসের বিরুদ্ধে পরিচালিত।
গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে আখ্যা দেওয়ার বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন অবস্থান রয়েছে। International Association of Genocide Scholars (IAGS) ২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট গৃহীত এক প্রস্তাবে বলেছে, গাজায় ইসরায়েলি সরকারের নীতি ও কর্মকাণ্ড গণহত্যার আইনি সংজ্ঞার আওতায় পড়ে। সংগঠনটি একই প্রস্তাবে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগও তোলে। ইসরায়েল ওই মূল্যায়ন প্রত্যাখ্যান করেছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ২০২৪ সালের নভেম্বরে গাজা-সংক্রান্ত কথিত যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল। ইসরায়েল এসব অভিযোগ অস্বীকার করে।
জাতিসংঘের ভেতরে কূটনীতিকদের ওয়াকআউট এবং বাইরে গ্রেপ্তার পর্যন্ত গড়ানো বিক্ষোভ—দুটি ঘটনাই গাজা যুদ্ধকে ঘিরে ইসরায়েলকে নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গভীর বিভাজনকে সামনে এনেছে। আর সেই বিভাজনের মধ্যেই নেতানিয়াহু তাঁর ভাষণে সমালোচকদের উদ্দেশে কঠোর অবস্থান নিয়ে জানিয়ে দিয়েছেন, আন্তর্জাতিক চাপ সত্ত্বেও ইসরায়েল তার সামরিক নীতি থেকে সরে আসছে না।