মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সম্পর্ক ক্রমেই টানাপোড়েনের মধ্যে পড়েছে। বাণিজ্যযুদ্ধ, পাল্টাপাল্টি শুল্ক, কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার বিষয়ে ট্রাম্পের বারবার মন্তব্য এবং ভূখণ্ড-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যুতে দুই দেশের দীর্ঘদিনের মিত্রতার সম্পর্ক নতুন চাপের মুখে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের ঝুঁকিও মূল্যায়ন করেছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন, এমন সংঘাতের সম্ভাবনা অত্যন্ত কম।
২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কার্নি জানান, কানাডা এমন একটি সম্ভাবনাকে ‘চরম ঝুঁকি’ হিসেবে বিবেচনা করে দেখেছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে অস্বীকৃতি জানালেও তিনি বলেন, সম্ভাবনা কম হলেও বিষয়টি বিবেচনায় না নেওয়া দায়িত্বশীলতার পরিচয় হবে না। কানাডার প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটি মূলত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অংশ।
কার্নির মন্তব্যকে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডার মধ্যে আসন্ন যুদ্ধের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকেরা। বরং দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান অবস্থায় কানাডা তার জাতীয় নিরাপত্তা পরিকল্পনায় সবচেয়ে চরম সম্ভাবনাগুলোকেও হিসাবের মধ্যে রাখছে—এমন বার্তাই এতে উঠে এসেছে।
দুই দেশের সম্পর্কের সাম্প্রতিক অবনতির বড় কারণ বাণিজ্য বিরোধ। আগস্টে ওয়াশিংটন প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের কানাডীয় পণ্যে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করে। এর জবাবে কানাডাও সমপরিমাণ মার্কিন পণ্যে পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয়। ৮ সেপ্টেম্বর থেকে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের মার্কিন পণ্যে ১৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কানাডীয় শুল্ক কার্যকর হয়। এর আওতায় ইস্পাত, দুগ্ধপণ্য, ইলেকট্রনিকস, কৃষি সরঞ্জামসহ বিভিন্ন পণ্য রয়েছে।
এর আগে দুই দেশ বাণিজ্য আলোচনা চালিয়ে আসছিল। কিন্তু আগস্টে সেই আলোচনা ভেঙে পড়ে। এরপরই নতুন করে শুল্ক আরোপ ও পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনা সম্পর্ককে আরও জটিল করে তোলে। ব্যাংক অব কানাডাও সতর্ক করেছে, নতুন মার্কিন শুল্ক চলতি বছরের চতুর্থ প্রান্তিকে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিতে পারে।
বাণিজ্যিকভাবে কানাডার জন্য পরিস্থিতিটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে দীর্ঘস্থায়ী শুল্কযুদ্ধ কানাডার শিল্প, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও সরবরাহব্যবস্থায় চাপ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে কানাডা এখন যুক্তরাষ্ট্রনির্ভরতা কমিয়ে ইউরোপ ও এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য ও কৌশলগত সম্পর্ক বাড়ানোর চেষ্টা করছে। কার্নি সম্প্রতি ইউরোপ সফরে গিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সম্পর্কের ওপর জোর দিয়েছেন।
সম্পর্কের টানাপোড়েন শুধু বাণিজ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ট্রাম্প একাধিকবার কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার কথা বলেছেন। এ ছাড়া তিনি কানাডার সঙ্গে সীমান্তবর্তী লেক অন্টারিওর নাম ‘লেক আমেরিকা’ করার উদ্যোগ নেন। কানাডার পক্ষ থেকে এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। কার্নি বলেছেন, হ্রদটির নাম ৪০০ বছরেরও বেশি পুরোনো এবং কানাডীয়দের কাছে এর নাম লেক অন্টারিওই থাকবে।
এই পরিস্থিতিতে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কৌশলগত ও প্রযুক্তিগত নির্ভরতা কমানোর বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছে। দেশটির সরকার প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি সরবরাহের ক্ষেত্রে বিকল্প উৎস খুঁজছে। একই সঙ্গে অর্থনীতি ও বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে ইউরোপ ও এশিয়ার বাজারে প্রবেশ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সামরিক সংঘাতের প্রশ্নে অবশ্য বাস্তব চিত্র ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা দীর্ঘদিনের সামরিক মিত্র এবং উভয় দেশই ন্যাটোর সদস্য। উত্তর আমেরিকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় দুই দেশের বাহিনীর মধ্যে দীর্ঘদিনের সমন্বয় রয়েছে। ফলে সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনা নিয়ে কানাডার প্রধানমন্ত্রীর ঝুঁকি মূল্যায়নকে বর্তমান সময়ে যুদ্ধের পূর্বাভাস হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তবে কার্নির বক্তব্য থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের বর্তমান অনিশ্চয়তাকে কানাডা আগের মতো শুধু বাণিজ্যিক বিরোধ হিসেবে দেখছে না। জাতীয় নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, জ্বালানি ও আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব—সব ক্ষেত্রেই বিকল্প প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
এদিকে বাণিজ্য বিরোধের প্রভাব দুই দেশের অর্থনীতিতেও পড়ছে। কানাডার কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, নতুন মার্কিন শুল্ক বিনিয়োগ ও নিয়োগে অনিশ্চয়তা বাড়াতে পারে। যদিও ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে কানাডার অর্থনীতি বার্ষিক হিসাবে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ হারে বেড়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে বাণিজ্য উত্তেজনা সেই পুনরুদ্ধারের ওপর চাপ তৈরি করেছে।
সব মিলিয়ে ওয়াশিংটন-অটোয়ার বর্তমান দ্বন্দ্ব এখনো সামরিক সংঘাতের পর্যায়ে পৌঁছেনি। কিন্তু বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক বিরোধ যত দীর্ঘ হবে, ততই কানাডার জন্য যুক্তরাষ্ট্রনির্ভরতার ঝুঁকি কমানো এবং জাতীয় নিরাপত্তার বিকল্প পরিকল্পনা তৈরির প্রয়োজন বাড়বে। কার্নির ‘চরম ঝুঁকি’ মূল্যায়ন সেই বৃহত্তর পরিবর্তনেরই একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।