পশ্চিমবঙ্গের নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর বিধানসভা আসনের উপনির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছে বিজেপি। শুক্রবার ঘোষিত ফলাফলে নন্দীগ্রামে দলটির প্রার্থী হাসিরানি রথ ১ লাখ ২২ হাজার ৭৫৩ ভোটের ব্যবধানে এবং মুর্শিদাবাদের রেজিনগরে শাখারভ সরকার ৭৫ হাজার ৮১৬ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। মুসলিম-অধ্যুষিত রেজিনগরেও বিজেপির এই জয়কে রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। তবে বিরোধী দলগুলো নির্বাচনে কারচুপি ও ভোট লুটের অভিযোগ তুলেছে।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দুই আসনের ফলকে বিজেপির প্রতি মানুষের আস্থার প্রতিফলন হিসেবে তুলে ধরেছেন। সংখ্যালঘু ভোটারদের সমর্থন পাওয়ার দাবি করে তিনি ৬ অক্টোবরের ভোটগ্রহণের দিনটিকে ‘বন্ধুত্ব দিবস’ বলে উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য, সংখ্যালঘুদের সামনে বিজেপির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ ছিল, তাঁরা সেই সুযোগ গ্রহণ করেছেন।
রেজিনগরে সংখ্যালঘু ভোটারের হার প্রায় ৭৪ শতাংশ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বিজেপির শাখারভ সরকার পেয়েছেন ১ লাখ ২৯ হাজার ৯১৪ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আম জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রার্থী গোলাম নবি আজাদ পেয়েছেন ৫৪ হাজারের কিছু বেশি ভোট। জয়ের ব্যবধান ৭৫ হাজার ৮১৬। গত বিধানসভা নির্বাচনে এই আসনে আম জনতা উন্নয়ন পার্টির হুমায়ুন কবীর ৫৮ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন।
নন্দীগ্রামেও বিজেপির জয় হয়েছে বড় ব্যবধানে। দলটির প্রার্থী হাসিরানি রথ পেয়েছেন ১ লাখ ৬৪ হাজার ৪২৭ ভোট। কংগ্রেসের মিলন প্রধান পেয়েছেন ৪১ হাজার ৬৭৪ ভোট। সিপিআইয়ের শান্তিগোপাল গিরি পেয়েছেন ৫ হাজার ৭৮৯ ভোট। আইএসএফের প্রার্থী সবেমিরাজ আলি খান পেয়েছেন ১ হাজার ৬০৭ ভোট। গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী এহেতাশমুল হক পেয়েছেন ৮৫৩ ভোট।
সংখ্যালঘু ভোট নিয়ে শুভেন্দুর বক্তব্য
নন্দীগ্রাম শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিকভাবে পরিচিত আসন। গত বিধানসভা নির্বাচনে তিনি এই আসন থেকে জয়ী হলেও পরে ভবানীপুর আসন রেখে নন্দীগ্রামের বিধায়ক পদ ছেড়ে দেন। ফলে সেখানে উপনির্বাচনের প্রয়োজন হয়। প্রচারের সময় শুভেন্দু সংখ্যালঘু ভোটারদের উদ্দেশে বিজেপির সঙ্গে ‘বন্ধুত্বের’ আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাঁর দাবি, নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে অন্নপূর্ণা যোজনার সুবিধা পাওয়া প্রায় ৭০ হাজার নারী পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন। এই ভোট বিজেপির জয়ের অন্যতম কারণ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রেজিনগরের ফল নিয়ে শুভেন্দু বিশেষভাবে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কথা জানিয়ে তিনি নারকেলবেড়িয়া সেতু নির্মাণ, সরকারি হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা ২০০-তে উন্নীত করা এবং রেজিনগর শিল্পতালুকে আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে শিল্প স্থাপনের পরিকল্পনার কথা বলেছেন। সেখানে আমুলের দুধ সংগ্রহকেন্দ্র স্থাপনের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
বিজয়ী প্রার্থী হাসিরানি রথ এই জয়কে নন্দীগ্রামবাসী ও মুখ্যমন্ত্রীর জয় বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর দাবি, সংখ্যালঘু ভোটাররা আগের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে এসে বিজেপির দিকে সমর্থনের হাত বাড়িয়েছেন। তবে ভোটের ফলাফল থেকে নির্দিষ্ট কোনো সম্প্রদায়ের সব ভোটারের পছন্দ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
ভোট লুটের অভিযোগ বিরোধীদের
নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর—দুই আসনেই বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে ভোট লুট ও অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছে। নন্দীগ্রামে কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানের দাবি, অনেক ভোটার ভোট দিতে পারেননি। যেখানে অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোট হয়েছে, সেখানে তাঁদের দল ভালো ভোট পেয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। আইএসএফ প্রার্থী সবেমিরাজ আলি খান গণনার মাঝপথে কেন্দ্র ছেড়ে চলে যান। তাঁর অভিযোগ, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে নির্বাচন প্রভাবিত করা হয়েছে। সিপিআই প্রার্থী শান্তিগোপাল গিরিও দাবি করেন, নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হলে তিনি আরও বেশি ভোট পেতেন।
রেজিনগরেও পুনর্নির্বাচনের দাবি জানিয়েছিল বিরোধী পক্ষের কয়েকটি দল। আম জনতা উন্নয়ন পার্টির নেতা হুমায়ুন কবীর নির্বাচনে পক্ষপাতের অভিযোগ তুলে রাজনীতি ছাড়ার এবং দুবাইয়ে থাকার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজেপির জয়কে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, এই ফলাফল বিজেপি ও এনডিএর সুশাসনের কর্মসূচির প্রতি মানুষের সমর্থনের প্রতিফলন।
দুই আসনের ফল পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে রেজিনগরের মতো সংখ্যালঘু-অধ্যুষিত আসনে বিজেপির বড় জয় রাজনৈতিক দলগুলোর ভোটের হিসাব নতুন করে পর্যালোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে। তবে নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগের নিষ্পত্তি এবং ভোটারদের আচরণ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য বিশ্লেষণ ছাড়া ফলাফলের পূর্ণ রাজনৈতিক তাৎপর্য নির্ধারণ করা কঠিন।