যুক্তরাজ্যের লন্ডনে ব্যস্ত সড়কের পাশে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজপরিবারের সঙ্গে বৈবাহিক সূত্রে যুক্ত ৩২ বছর বয়সী মেহরা আল নাহিয়ানকে। তাঁর কাছেই খালি পায়ে ঘুরছিল তিন বছর বয়সী একটি শিশু। পাশে পড়ে ছিলেন আরও এক অচেতন ব্যক্তি। শিশুটি একপর্যায়ে চলন্ত যানবাহনের কাছাকাছি চলে গেলে পথচারীরা এগিয়ে এসে তাকে নিরাপদে রাখেন। পরে এ ঘটনায় শিশু অবহেলার অভিযোগে আদালতে দোষ স্বীকার করেন মেহরা। তাঁকে দুই বছরের কমিউনিটি অর্ডার, পুনর্বাসন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের নির্দেশ এবং ৬ হাজার ১১৪ পাউন্ড জরিমানা করা হয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ, দ্য টাইমস ও দ্য স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৩ জুন পশ্চিম লন্ডনের একটি রাস্তায় এ ঘটনা ঘটে। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) লন্ডনের সাউথওয়ার্ক ক্রাউন কোর্টে মামলার শুনানিতে মেহরা শিশু অবহেলার একটি অভিযোগ স্বীকার করেন। আদালতে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, তিনি অচেতন হয়ে পড়ায় শিশুটি অভিভাবকের তত্ত্বাবধান ছাড়াই রাস্তায় ঘুরছিল।
চলন্ত গাড়ির কাছাকাছি শিশু
আদালতে কৌঁসুলি রিও পাহলাভানপুর জানান, পথচারীরা শিশুটিকে জুতা ছাড়া রাস্তায় ঘুরতে দেখেন। তার সঙ্গে একটি স্কুটার ছিল। একপর্যায়ে শিশুটি দ্রুতগতির যানবাহনের কাছাকাছি চলে যায়। দুর্ঘটনার আশঙ্কায় পথচারীরা এগিয়ে এসে তাকে দেখাশোনা করতে থাকেন এবং পুলিশকে খবর দেন।
আদালতে বলা হয়, পুলিশ পৌঁছানোর পরও মেহরা প্রায় ৩০ মিনিট অচেতন ছিলেন। তাঁকে রাস্তার পাশে রেলিংয়ে হেলান দিয়ে মাথা নিচু করে বসে থাকতে দেখা যায়। কাছেই আরেক ব্যক্তি অচেতন অবস্থায় পড়ে ছিলেন। পথচারীদের হস্তক্ষেপ না থাকলে শিশুটি সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হতে পারত কিংবা হারিয়ে যাওয়া বা অপরিচিত কারও দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারত।
দ্য টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চেতনা ফিরে পাওয়ার পর মেহরা উপস্থিত ব্যক্তিদের উদ্দেশে বলেন, ‘এটা তো কোনো কসাইখানা নয়, আপনারা এত চিন্তা করছেন কেন?’ তাঁর এ আচরণের কথাও আদালতে তুলে ধরা হয়।
কোকেন সেবন নিয়ে কী বললেন আইনজীবী
মেহরার বিরুদ্ধে মামলায় কোকেন সেবনের প্রসঙ্গ উঠে এলেও ঘটনার দিন তিনি মাদক নিয়েছিলেন কি না, তা নিয়ে তাঁর আইনজীবীর বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। আইনজীবী স্টিফেন ভুলো কেসি আদালতে বলেন, ঘটনার দিন মেহরা কোকেন সেবন করেননি; এর আগের কয়েক দিনে মাদক সেবনের কারণে তিনি অত্যন্ত ক্লান্ত ছিলেন।
আদালতে জানানো হয়, মেহরার কাছে তল্লাশি চালিয়ে মাদক সেবনের সরঞ্জাম পাওয়া গেলেও কোনো অবৈধ মাদক পাওয়া যায়নি। ঘটনার পর তিনি মাদকাসক্তি নিরাময়ের জন্য চিকিৎসা কর্মসূচিতে অংশ নেন। আইনজীবী বলেন, মেহরা নিজের ভুলের জন্য অনুতপ্ত এবং মাদকাসক্তি থেকে বেরিয়ে আসার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিন মাসের পুনর্বাসন কর্মসূচি শেষ করে পরবর্তী সময়ে নিয়মিত চিকিৎসা ও নারকোটিকস অ্যানোনিমাসের কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনাও তাঁর রয়েছে বলে আদালতকে জানানো হয়।
আদালতের দণ্ড
বিচারক জাস্টিস জনসন কেসি বলেন, পথচারীরা এগিয়ে না এলে শিশুটি গুরুতর শারীরিক ক্ষতির শিকার হতে পারত। সে হারিয়ে যেতে পারত, অপরিচিত কারও হাতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারত কিংবা রাস্তায় অচেতন অবস্থায় দুজন প্রাপ্তবয়স্ককে দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়তে পারত।
আদালত মেহরাকে দুই বছরের কমিউনিটি অর্ডার দিয়েছেন। এর সঙ্গে পুনর্বাসনসংক্রান্ত শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি তাঁকে মোট ৬ হাজার ১১৪ পাউন্ড জরিমানা ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক দায় পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেহরা যুক্তরাজ্যে প্রতি মাসে ৮ হাজার পাউন্ড ভাতা পান। তবে এ ভাতার উৎস ও শর্ত সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত প্রতিবেদনে স্পষ্ট নয়।
মামলাটি রাজপরিবারের পরিচয়ের কারণে আলোচনায় এলেও আদালতের পর্যবেক্ষণের কেন্দ্রে ছিল শিশুটির নিরাপত্তা। ব্যক্তিগত পরিস্থিতি বা সামাজিক অবস্থান যা-ই হোক, শিশুর দায়িত্বে থাকা কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি অচেতন হয়ে পড়লে শিশুটি কী ধরনের বিপদের মুখে পড়তে পারে, তা এ ঘটনায় স্পষ্ট হয়েছে।
সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ, দ্য টাইমস, দ্য স্ট্যান্ডার্ড ও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।