সেপ্টেম্বরে কর্মী ছাড়পত্র কমেছে ২৯ শতাংশ, ২০২৭ সালে ইতালি নেবে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৮৫০ বিদেশি
বৈদেশিক কর্মসংস্থানের বাজারে একদিকে বড় ধাক্কা, অন্যদিকে নতুন কিছু সুযোগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে বিদেশে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশি কর্মীদের ছাড়পত্র কমেছে প্রায় ২৯ শতাংশ। বছরের প্রথম নয় মাসেও বিদেশে কর্মী পাঠানো কমেছে প্রায় ৩২ শতাংশ। এর মধ্যে লাওস বাংলাদেশি কর্মীদের নিয়োগ, ওয়ার্ক পারমিট ও শ্রম ভিসা সাময়িকভাবে বন্ধ করেছে। বিপরীতে ইউরোপের ইতালি ২০২৭ সালে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৮৫০ বিদেশি কর্মী নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, যার সুযোগ পাবে বাংলাদেশও।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য ৭০ হাজার ৩০৪ জন কর্মী ছাড়পত্র পেয়েছেন। গত বছরের একই মাসে এ সংখ্যা ছিল ৯৯ হাজার ২৪ জন। অর্থাৎ এক বছরে ছাড়পত্র কমেছে ২৮ হাজার ৭২০ জন বা ২৯ শতাংশ। তবে আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর চিত্র রয়েছে। আগস্টে ছাড়পত্র পেয়েছিলেন ৬২ হাজার ৯২৪ জন; এক মাসে বেড়েছে ৭ হাজার ৩৮০ জন বা ১১ দশমিক ৭ শতাংশ।
বছরের প্রথম নয় মাসের হিসাব আরও উদ্বেগজনক। জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২০২৬ সালে বাংলাদেশ থেকে ৫ লাখ ৬৯ হাজার ৯৭৯ জন কর্মী বিদেশে গেছেন। গত বছরের একই সময়ে গিয়েছিলেন ৮ লাখ ৩৮ হাজার ৮৯২ জন। অর্থাৎ এক বছরে কর্মী যাওয়া কমেছে ২ লাখ ৬৮ হাজার ৯১৩ জন, প্রায় ৩২ শতাংশ।
মালয়েশিয়া, ওমান ও বাহরাইনসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার বন্ধ বা সীমিত থাকায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতও বাংলাদেশ থেকে স্বল্পদক্ষ কর্মী নেওয়া পুরোপুরি স্বাভাবিক করেনি। নিয়োগদাতা ও রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিও শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে।
তবে সংকুচিত বাজারের মধ্যেও সৌদি আরব বাংলাদেশি কর্মীদের প্রধান গন্তব্য হিসেবে রয়েছে। সেপ্টেম্বরে দেশটিতে যাওয়ার জন্য ৩২ হাজার ৯১৫ জন ছাড়পত্র পেয়েছেন। সিঙ্গাপুরে ৮ হাজার ৩০৬, কাতারে ৬ হাজার ২৮২, মালদ্বীপে ৫ হাজার ১৫, কুয়েতে ৪ হাজার ৫৩৮ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৪ হাজার ৪৪২ জন কর্মী যাওয়ার ছাড়পত্র পেয়েছেন। ইউরোপের পর্তুগাল ও ইতালিতেও সেপ্টেম্বরে কর্মী যাওয়ার সংখ্যা আগস্টের তুলনায় বেড়েছে।
বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব টিপু সুলতান বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বৈদেশিক কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলেও মূল সমস্যা শ্রমবাজারের বৈচিত্র্য না বাড়ানো। তাঁর মতে, উপসাগরীয় অঞ্চল ও মালয়েশিয়ায় সুযোগ কমে এলেও সম্ভাবনাময় নতুন বাজারে বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর প্রবেশাধিকার সীমিত। সব শ্রমবাজার যোগ্য রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য উন্মুক্ত করারও দাবি জানান তিনি।
সরকার অবশ্য নতুন শ্রমবাজার তৈরির উদ্যোগের কথা বলছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক নূর জানিয়েছেন, আগামী পাঁচ বছরে ১ কোটি কর্মক্ষম মানুষের জন্য বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিভিন্ন দেশের চাহিদা অনুযায়ী ভাষা ও কারিগরি দক্ষতায় কর্মীদের প্রশিক্ষণের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
এর মধ্যেই লাওসের শ্রমবাজার বন্ধ হওয়ায় নতুন করে সতর্কতা জারি করেছে সরকার। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, লাওস বাংলাদেশি নাগরিকদের শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ, ওয়ার্ক পারমিট এবং প্রবেশ ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। মন্ত্রণালয়ের ২৮ সেপ্টেম্বরের বিজ্ঞপ্তিতেও এ বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।
লাওসে যেতে ইচ্ছুক বাংলাদেশিদের পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সেখানে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে ভুয়া ভিসা, চাকরির প্রলোভন ও অননুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির প্রতারণা থেকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। চাকরি বা ভিসার প্রস্তাব পাওয়ার আগে সরকারি অনুমোদিত সূত্রে তা যাচাই করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
তবে ইউরোপের ইতালিতে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। দেশটির ২০২৭ সালের বৈধ শ্রমিক প্রবেশ কর্মসূচিতে মোট ১ লাখ ৬৫ হাজার ৮৫০ জন বিদেশি কর্মী নেওয়া হবে। এর মধ্যে ৭৬ হাজার ২০০ জন নন-সিজনাল, ৮৯ হাজার জন সিজনাল এবং ৬৫০ জন স্বনিয়োজিত কর্মী হিসেবে প্রবেশের সুযোগ পাবেন। বাংলাদেশসহ মোট ৩৭টি দেশ এ কর্মসূচির আওতাভুক্ত।
ইতালির সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, ২৩ অক্টোবর থেকে ৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ইতালীয় নিয়োগকর্তা বা অনুমোদিত মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে অনলাইনে আবেদনপত্র প্রস্তুত করা যাবে। এরপর ২০২৭ সালের ১২ জানুয়ারি কৃষি, ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যটন, ১৬ ফেব্রুয়ারি নন-সিজনাল এবং ১৮ ফেব্রুয়ারি গৃহস্থালি খাতের জন্য নির্ধারিত ‘ক্লিক ডে’-তে আবেদন জমা দেওয়া যাবে।
তবে ইতালির এই কোটা বাংলাদেশের জন্য আলাদা করে নির্ধারিত নয়। ফলে সুযোগ পেতে হলে প্রকৃত ইতালীয় নিয়োগকর্তা, বৈধ চাকরির প্রস্তাব ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। দালাল বা অননুমোদিত এজেন্সির মাধ্যমে আবেদন করে প্রতারণার শিকার না হওয়ার বিষয়ে অভিবাসনসংশ্লিষ্টরা সতর্ক করেছেন।
বৈদেশিক কর্মসংস্থানের এই সংকটের প্রভাব রেমিট্যান্সেও কিছুটা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে দেশে ২ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের মাসের ২ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে কম। তবে চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে রেমিট্যান্স এসেছে ৮ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি।
ফলে পুরোনো শ্রমবাজারে সংকোচন এবং নতুন বাজারে সীমিত প্রবেশাধিকার—এই দুই বাস্তবতার মধ্যে বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান এখন বড় ধরনের রূপান্তরের মুখে। ইতালির মতো নতুন সুযোগ কাজে লাগানোর পাশাপাশি বন্ধ ও সীমিত বাজারগুলো পুনরুদ্ধার এবং শ্রমবাজারের বহুমুখীকরণই এখন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।