ফিফা আসিয়ান কাপে প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারার হতাশা পেছনে ফেলে এবার সামনে তাকাতে হচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলকে। আগামী মাসে অনুষ্ঠেয় সাফ চ্যাম্পিয়নশিপই এখন থমাস ডুলির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। আসিয়ান কাপের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে দলকে নতুনভাবে সাজানোর পরিকল্পনা করছেন বাংলাদেশ কোচ। সেই পরিকল্পনায় স্থানীয় ফুটবলারদের পাশাপাশি প্রবাসী খেলোয়াড়দের গুরুত্ব আরও বাড়ছে। এরই মধ্যে আরও চার প্রবাসী ফুটবলারকে পরখ করে দেখতে চেয়েছেন ৬৫ বছর বয়সী এই আমেরিকান কোচ।
ডুলির পছন্দের তালিকায় আছেন ক্রলি টাউনের লুই ওয়াটসন, স্ট্যানফোর্ড কার্ডিনালের ট্রেভর ইসলাম, সেন্ট জোসেফস হকসের রোনান সুলিভান এবং ওয়েলিংবরো টাউনের জায়ন হাকিম। চারজনের কাউকেই এখনো জাতীয় দলের জন্য নিশ্চিত করা হয়নি। তবে তাদের সঙ্গে যোগাযোগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অর্থাৎ সাফের দল গঠনে ডুলি যে নতুন মুখের সন্ধানে আছেন, সেটি এরই মধ্যে পরিষ্কার।
বাংলাদেশ ফুটবল দলে প্রবাসী খেলোয়াড়ের ব্যবহার অবশ্য নতুন নয়। সাম্প্রতিক সময়ে হামজা চৌধুরী, শমিত সোম, জায়ান আহমেদ, ফাহামেদুল ইসলাম ও তারিক রায়হান কাজীর মতো প্রবাসীরা লাল-সবুজ জার্সিতে নিয়মিত খেলেছেন। আসিয়ান কাপেও নতুন তিন প্রবাসী—জিদান ইউসুফ, শুকি ইতোফুসা ও ফারহান আলী ওয়াহিদকে অভিষেকের সুযোগ দিয়েছেন ডুলি। ফলে বোঝাই যাচ্ছে, জাতীয় দলের মান বাড়াতে দেশের বাইরে বেড়ে ওঠা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের খুঁজে বের করার নীতিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি।
প্রবাসী ফুটবলারদের সঙ্গে যোগাযোগের দায়িত্বে থাকা বাফুফের সহসভাপতি ফাহাদ করিম জানিয়েছেন, ডুলির চাহিদা অনুযায়ী নতুন চার ফুটবলারের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু হয়েছে। তার ভাষায়, ‘কোচ এই চার খেলোয়াড়কে দেখতে চান। বাফুফে থেকে আমাকে ডুলির চাহিদার কথা জানানো হয়েছে এবং পরবর্তী যোগাযোগের জন্য আমি ইতোমধ্যে ওই ফুটবলারদের বার্তা পাঠিয়েছি।’
তবে চাইলেই চারজনকে সাফের ক্যাম্পে পাওয়া যাবে না। ওয়াটসন চলতি মৌসুমে আয়ারল্যান্ড জাতীয় দলে জায়গা পাওয়ার শেষ চেষ্টা চালাতে চান। ট্রেভর ও রোনানও ব্যস্ত নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয় দলের হয়ে খেলায়। ফলে তাদের জাতীয় দলের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে সময়, খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র—সবকিছুর সমন্বয় জরুরি।
চারজনের মধ্যে বর্তমানে শুধু রোনান সুলিভানের বাংলাদেশের পাসপোর্ট রয়েছে। ওয়াটসন ও ট্রেভরের জন্মনিবন্ধনের প্রাথমিক কাজ অবশ্য শেষ করেছে বাফুফে। তারা বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে খেলতে রাজি হলে এক সপ্তাহের মধ্যেই পাসপোর্টের ব্যবস্থা করা সম্ভব বলে জানা গেছে। ফলে সিদ্ধান্তের বড় অংশ এখন খেলোয়াড়দের ওপরই নির্ভর করছে।
ডুলির এই উদ্যোগের আরেকটি দিক হলো জাতীয় দলের প্রতিযোগিতামূলক গভীরতা বাড়ানো। বাংলাদেশের ফুটবলে দীর্ঘদিন ধরে বড় সমস্যা ছিল একই মানের বিকল্প খেলোয়াড়ের ঘাটতি। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ম্যাচে কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় না থাকলে দলের পারফরম্যান্সে বড় প্রভাব পড়ত। প্রবাসী ফুটবলারদের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে সেই জায়গায় প্রতিযোগিতা বাড়াতে চাইছেন ডুলি। তবে শুধু বংশোদ্ভূত হলেই জাতীয় দলে জায়গা নিশ্চিত হবে না—মাঠের পারফরম্যান্সই শেষ কথা। ডুলির সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে অন্তত সেই বার্তাই পাওয়া যাচ্ছে।
আসিয়ান কাপ শেষ হওয়ার পর বিশ্রামে না গিয়ে সাফের প্রস্তুতিতে নেমে পড়েছেন ডুলি ও তার সহকারীরা। ইন্দোনেশিয়া থেকে গত শুক্রবার রাতে দেশে ফেরার পরদিনই বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনায় বাংলাদেশ ফুটবল লিগের (বিএফএল) ফর্টিস এফসি ও সিটি ক্লাবের ম্যাচ মাঠে বসে দেখেছেন কোচ। নতুন ফুটবলার খোঁজার পাশাপাশি স্থানীয় খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সও যে তার নজরে রয়েছে, এই ম্যাচ পর্যবেক্ষণ তারই ইঙ্গিত।
সময় অবশ্য খুব বেশি নেই। আগামী ২৮ অক্টোবর লিগের পঞ্চম রাউন্ড শেষ হওয়ার পর শুরু হবে আন্তর্জাতিক বিরতি। তার আগে আরও তিন রাউন্ড ম্যাচ দেখার সুযোগ পাবেন ডুলি। পরিকল্পনা অনুযায়ী, লিগ বন্ধ হওয়ার দিন থেকেই জাতীয় দলের সাফ ক্যাম্প শুরু হওয়ার কথা। তবে বাফুফে ও ক্লাবগুলো একমত হলে ক্যাম্প আরও আগেই শুরু হতে পারে।
সাফের প্রস্তুতির গুরুত্ব নিয়ে বাফুফে সভাপতি ও জাতীয় দল ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যান তাবিথ আউয়ালও স্পষ্ট অবস্থান জানিয়েছেন। তার ভাষায়, ‘সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের প্রস্তুতি অবশ্যই অনেক ভালো হতে হবে। ক্যাম্প শুরুর দিনক্ষণ নিয়ে আমরা প্রথমে ক্লাবগুলোর সঙ্গে আলোচনা করব।’
সব মিলিয়ে সাফের আগে বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি সমান্তরাল কাজ—বিদ্যমান দলকে আরও সংগঠিত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন খেলোয়াড় যুক্ত করা। ডুলির চোখে সেই নতুন সংযোজনের অন্যতম উৎস প্রবাসী ফুটবলাররা। তবে আসিয়ান কাপের অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু খেলোয়াড়ের নাম বা পরিচয় দিয়ে আন্তর্জাতিক সাফল্য আসে না; প্রয়োজন দীর্ঘ প্রস্তুতি, বোঝাপড়া ও মাঠের কার্যকর সমন্বয়।
সাফে বাংলাদেশ কতটা এগোতে পারবে, তার অনেকটাই নির্ভর করবে এই প্রস্তুতির ওপর। ডুলির হাতে স্থানীয় ও প্রবাসী—দুই উৎস থেকে খেলোয়াড় বাছাইয়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এখন সেই সম্ভাবনাকে কতটা কার্যকর দলীয় শক্তিতে রূপ দিতে পারেন তিনি, সেটিই হয়ে উঠছে সাফের আগে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।