ম্যাচ শেষ হয়েছে। জয় এসেছে। কিন্তু আর্জেন্টিনার জন্য শেষ হয়েছে আরও বড় কিছু—২১ বছরের এক মহাকাব্যিক অধ্যায়। বেনিনকে ৩-০ গোলে হারানোর পর বুয়েনস আয়ার্সের মনুমেন্টালের মাইক্রোফোন হাতে দাঁড়ালেন লিওনেল মেসি। সামনে ৮৫ হাজার মানুষ, পেছনে অসংখ্য স্মৃতি। অথচ যে বিদায়ের জন্য পুরো আয়োজন, সেটিই যেন মেনে নিতে পারছিলেন না বিদায়ী অধিনায়ক।
কথা বলতে গিয়েই বোঝা গেল, মুহূর্তটি কতটা কঠিন। মুখে হাসি, কণ্ঠে কৃতজ্ঞতা, চোখে জল। মেসির কথায় ফিরে এল পরিবার, সতীর্থ, শিরোপা, ব্যর্থতা, সমর্থকদের ভালোবাসা আর আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সি। সবশেষে এসে একটি কথাতেই যেন থেমে গেল তাঁর পুরো বিদায়—‘আমি যেতে চাই না। আমি এই মাঠ ছাড়তে চাই না।’
বিদায়ী ম্যাচটিও মেসির জন্য ছিল যেন তাঁর ২১ বছরের ক্যারিয়ারের সংক্ষিপ্ত প্রতিচ্ছবি। আর্জেন্টিনার তিন গোলেই ছিল তাঁর ছোঁয়া। নিকোলাস ওতামেন্দি ও নিকো পাজকে দিয়ে গোল করিয়েছেন, নিজে করেছেন পেনাল্টি থেকে গোল। কিন্তু পরিসংখ্যানের চেয়েও বড় হয়ে থাকল ম্যাচ শেষে তাঁর সেই বক্তব্য।
মাইক্রোফোন হাতে শুরুতেই বাবার কথা মনে পড়ে যায় মেসির। মাসখানেক আগে হারানো হোর্হে মেসির স্মরণে কিছুক্ষণ থেমে বলেন, ‘আজ কিছু বলাটা কঠিন। এত আবেগ, এত কিছু একসঙ্গে মাথায় ঘুরছে। সবার আগে আমার বাবার কথা মনে পড়ছে। আমি শুধু কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি।’
তারপর ফিরে তাকান দুই দশকের বেশি সময়ের পথচলার দিকে।
‘২০ বছরেরও বেশি সময় এই জার্সি পরতে পারা আমার জন্য অনেক বড় সম্মানের ছিল। আমরা সবচেয়ে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময়ও আমি কখনো লড়াই থামাইনি, নিজের সবটুকু দেওয়া থামাইনি, কখনো দলের পাশে থাকা বন্ধ করিনি।’
মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার যে সব সময় সাফল্যে মোড়া ছিল না, তা তিনি নিজেই মনে করিয়ে দিলেন। ছিল হতাশা, সমালোচনা, হার আর এমন সময়ও, যখন জাতীয় দলের জার্সিটিই হয়ে উঠেছিল তাঁর সবচেয়ে বড় বোঝা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই জার্সিতেই বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা ও ফাইনালিসিমার শিরোপা এসেছে।
বিদায়ের সবচেয়ে কঠিন জায়গাটি ছিল জাতীয় দলের হয়ে আর ফিরে না আসার বাস্তবতা।
‘ফিরে না আসাটা অনেক কষ্টের হবে। আমি শপথ করে বলছি, সারাজীবন এখানে ফিরে আসতে চাইব। কারণ আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে খেলা একজন মানুষের জীবনে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে সুন্দর বিষয়।’
তারপরই যেন নিজেকেই বোঝালেন, কেন থামতে হচ্ছে।
‘আমি সারাজীবন এখানে থাকতে চাই। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, এটাই সঠিক সময়।’
বিশ্বকাপের স্মৃতিও উঠে আসে তাঁর কথায়। শেষ বিশ্বকাপের কঠিন লড়াই, শিরোপার স্বপ্ন এবং সেই পথের প্রতিটি মুহূর্ত তিনি মনে রেখেছেন। কঠিন ম্যাচগুলোর কথা বলতে গিয়ে মেসি জানালেন, দল কখনো নিজেদের সর্বোচ্চটা দেওয়া থেকে পিছিয়ে যায়নি।
‘আমরা সব সময়ের মতোই লড়াই করেছি। এই জার্সির জন্য, যেসব সতীর্থের সঙ্গে আমি খেলেছি, তাদের সঙ্গে মিলে সবটুকু দিয়েছি। আমার পাশে যে সতীর্থই ছিল, বিশ্বাস করুন, তারা সবাই এই জার্সির জন্য নিজেদের সর্বস্ব দিয়েছে।’
সেই সতীর্থদের প্রতিই ছিল মেসির সবচেয়ে গভীর কৃতজ্ঞতা। কারণ শৈশবে যে স্বপ্ন নিয়ে ফুটবল শুরু করেছিলেন, তার সবচেয়ে বড় পূর্ণতা এসেছে তাঁদের সঙ্গেই।
‘এই দলের সঙ্গে যে সময়টা কাটিয়েছি, তার জন্য আমার সতীর্থদের ধন্যবাদ দিতে চাই। তারা আমাকে ছোটবেলার সেই স্বপ্ন পূরণে সাহায্য করেছে—বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া, আমেরিকার চ্যাম্পিয়ন হওয়া, ফাইনালিসিমার চ্যাম্পিয়ন হওয়া।’
মাঠে তাঁদের পাশে পাওয়ার অনুভূতিও ছিল আলাদা।
‘আমি যেকোনো প্রতিপক্ষের বিপক্ষে লড়াই করতে প্রস্তুত থাকতাম, কারণ জানতাম, আমার পাশে এমন কিছু যোদ্ধা আছে যারা নিজেদের সবটুকু দিয়ে লড়বে।’
শুধু সতীর্থ নয়, আর্জেন্টিনার মানুষের ভালোবাসাও মেসির বিদায়ী বক্তব্যের বড় অংশজুড়ে ছিল। দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন তিনি। শহর বদলেছে, স্টেডিয়াম বদলেছে, প্রতিপক্ষ বদলেছে—কিন্তু সমর্থকদের ভালোবাসা বদলায়নি।
‘এখানে খেলা আমি ভীষণ মিস করব। আমি সৌভাগ্যবান যে পুরো দেশ ঘুরে খেলার সুযোগ পেয়েছি এবং প্রতিবারই মানুষের কাছ থেকে অসাধারণ ভালোবাসা পেয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এত বছর ধরে আমি যেখানে গিয়েছি, স্টেডিয়াম সব সময় পূর্ণ দেখেছি। মানুষ অনেক কষ্ট করে এসেছে। তাই আমরা সব সময় অনুভব করেছি, আমরা যেন দেশের প্রতিটি জায়গাতেই নিজেদের ঘরের মাঠে খেলছি।’
এই ভালোবাসার সবচেয়ে উজ্জ্বল স্মৃতিগুলোর একটি বিশ্বকাপ জয়ের পর মনুমেন্টালে ফিরে আসার দিন। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে দেশে ফেরার পর সেই মাঠে আবার আর্জেন্টিনার জার্সিতে নামার অভিজ্ঞতাকে নিজের ক্যারিয়ারের অন্যতম আনন্দের মুহূর্ত হিসেবে মনে করেন মেসি।
‘সেদিনের অভিজ্ঞতা আমি কখনো ভুলব না। অসাধারণ ছিল। আজও আমি সেই দিনের ভিডিও দেখি এবং আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি। সেই দিনটি আমার ইতিহাসে, আমার সতীর্থদের ইতিহাসে, আমার পরিবারের ইতিহাসে চিরকাল লেখা থাকবে।’
কয়েক বছর পর সেই একই মাঠে এবার সম্পূর্ণ বিপরীত অনুভূতি নিয়ে দাঁড়াতে হলো তাঁকে।
‘আজ আবার এখানে ফিরে এসে আমি নিশ্চিতভাবেই আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে দুঃখের দিনটি অনুভব করছি। কারণ আজ আমি জাতীয় দল এবং আপনাদের সবার কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছি।’
তবে বিদায় মানেই আর্জেন্টিনা থেকে দূরে সরে যাওয়া নয়। এবার থেকে গ্যালারির অন্য পাশে দাঁড়িয়ে জাতীয় দলকে সমর্থন করতে চান তিনি।
‘জাতীয় দলের রং ধারণ করে খেলাটা আমি ভীষণ মিস করব। তবে এখন আমি ওই পাশে থাকব। আপনাদের সঙ্গেই। এই ছেলেদের এবং সামনে যা আসছে, সবকিছুকে সমর্থন করব।’
পরবর্তী প্রজন্মের জন্য শুভকামনার পাশাপাশি একটি সতর্কবার্তাও দিয়ে গেছেন মেসি। তাঁর মতে, সাফল্যের সবচেয়ে বড় শক্তি ঐক্য।
‘আমরা যখন একসঙ্গে থাকি, ঐক্যবদ্ধ থাকি, তখন আমরা যেকোনো দলের চেয়ে শক্তিশালী এবং যেকোনো বাধা পেরিয়ে যেতে পারি। নিশ্চিতভাবেই কঠিন সময় আসবে। সেই কঠিন সময়ে আমাদের আরও বেশি করে একে অন্যের পাশে দাঁড়াতে হবে।’
জাতীয় দলের ব্যর্থতা দেখতে চায়—এমন মানুষের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তবে তাঁদের জবাব দেওয়ার পথ হিসেবে বিভাজন নয়, ঐক্যকেই বেছে নেওয়ার আহ্বান জানান।
‘বড় লক্ষ্য অর্জন করতে হলে আমাদের শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ দল তৈরি করতে হবে। কারণ কিছু মানুষ আছে যারা জাতীয় দলকে ব্যর্থ দেখতে চায়। আমরা তাদের সেই আনন্দ দিতে পারি না।’
শেষদিকে এসে মেসির কণ্ঠ আরও ভারী হয়ে ওঠে। এত বছর চাপের মুহূর্তে সতীর্থদের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলা মানুষটিই এবার নিজের আবেগ সামলাতে পারছিলেন না।
‘সত্যি বলতে, আমি আজ অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি কথা বলছি। আমি যেতে চাই না। আমি এই মাঠ ছাড়তে চাই না।’
তারপর আর কোনো বিশ্লেষণ নয়। শুধু ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতা।
‘আমি শুধু আপনাদের বলতে চাই, আমি আপনাদের সবাইকে ভালোবাসি। আপনাদের খুব মিস করব। আর ঈশ্বরের কাছে আমি ভীষণ কৃতজ্ঞ যে আমি একজন আর্জেন্টাইন। আমি আর্জেন্টাইন হতে পেরে গর্বিত। আর আপনাদের সবার সঙ্গে আমার স্বপ্নগুলো পূরণ করতে পেরেছি, এ জন্যও আমি গর্বিত।’
ম্যাচের আগেও আবেগে ভেসেছিলেন মেসি। জাতীয় সংগীতের সময় চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। ওয়ার্মআপে দুই হাত তুলে গ্যালারিকে অভিবাদন জানালে মনুমেন্টাল গর্জে ওঠে। ঘোষকের কণ্ঠে যখন শেষবারের মতো উচ্চারিত হলো—আর্জেন্টিনার অধিনায়ক, সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা, লিওনেল আন্দ্রেস মেসি—তখন ৮৫ হাজার কণ্ঠ একসঙ্গে তাঁকে বিদায় জানায়।
ম্যাচের দশম মিনিটে বেনিনের কয়েকজন খেলোয়াড়ও এগিয়ে এসে তাঁকে শুভেচ্ছা জানান। পুরো স্টেডিয়াম দাঁড়িয়ে হাততালি দেয়। আর মেসি তখন হাসছিলেন। যেন চোখের জল আর হাসির মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিজের শেষ রাতটাকে মনে গেঁথে নিচ্ছিলেন।
শৈশবের স্বপ্ন থেকে বিশ্বকাপজয়—মেসির ২১ বছরের আন্তর্জাতিক পথচলায় ছিল প্রায় সবকিছু। ছিল হার, কান্না, প্রত্যাবর্তন, সমালোচনা, ভালোবাসা এবং শেষ পর্যন্ত পূর্ণতা।
এখন সেই পথের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে তাঁর কণ্ঠে একটাই আক্ষেপ—‘আমি যেতে চাই না।’
কিন্তু ফুটবল কখনো কখনো সবচেয়ে প্রিয় মানুষকেও বিদায় নিতে বাধ্য করে। মনুমেন্টালের রাত তাই শুধু একজন অধিনায়কের বিদায় নয়; এটি ছিল একটি প্রজন্মের স্বপ্নের সঙ্গে শেষবারের মতো একই মাঠে দাঁড়িয়ে থাকার মুহূর্ত।
মেসি চলে গেলেন। কিন্তু তাঁর কণ্ঠের শেষ কথাগুলো থেকে গেল—‘আমি আপনাদের সবাইকে ভালোবাসি।’