লিওনেল মেসির বিদায়ের দিনে বিস্ফোরক বিবৃতি দিয়ে আলোচনায় ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। পর্তুগাল জাতীয় দলের শিবির ছেড়ে যাওয়ার নেপথ্যের ঘটনা প্রকাশ্যে এনে কোচ জর্জ জেসাসের বিরুদ্ধে ‘কথা না রাখার’ অভিযোগ তুলেছেন পর্তুগিজ মহাতারকা। প্রায় দুই হাজার শব্দের দীর্ঘ বিবৃতিতে নিজের আচরণের জন্য সতীর্থ, সমর্থক ও সংশ্লিষ্ট সবার কাছে ক্ষমাও চেয়েছেন তিনি। তবে একই সঙ্গে স্পষ্ট করেছেন, কেন এতটা ক্ষুব্ধ হয়ে জাতীয় দলের শিবির ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
রোনালদোর ভাষ্য, জাতীয় দলের সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক সূচি নিয়ে জর্জ জেসাসের সঙ্গে তাঁর একটি গোপন সমঝোতা হয়েছিল। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী নরওয়ে ও ডেনমার্কের বিপক্ষে ম্যাচে না খেললেও পর্তুগালেই থাকার কথা ছিল তাঁর। অধিনায়ক হিসেবে সতীর্থরা যখন দলের সঙ্গে সফরে যাবেন, তখন নিজে দেশে থেকে গেলে সেটি ভুল বার্তা দিতে পারে—এমন চিন্তা থেকেই তিনি দলের সঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে জানান রোনালদো।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনায় পরিবর্তন আসে। রোনালদোর দাবি, জেসাস তাঁকে নরওয়ের বিপক্ষে অন্তত ৩০ মিনিট খেলানোর কথা জানান। কোচের কথায় আস্থা রেখে ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নামার প্রস্তুতিও নেন তিনি। নিয়ম মেনে ওয়ার্ম-আপ করার পরও শেষ পর্যন্ত তাঁকে মাঠে নামানো হয়নি।
রোনালদোর মতে, ওই ঘটনায় কোচের প্রতি তাঁর আস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। তাঁর দাবি, কোচের দেওয়া কথা অনুযায়ী প্রস্তুতি নেওয়ার পরও মাঠে নামার সুযোগ না পাওয়ায় তিনি নিজেকে প্রতারিত মনে করেন। এখান থেকেই জেসাসের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও বাড়তে থাকে।
এরপর পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলেও জানান রোনালদো। তাঁর ভাষ্য, জেসাসের সঙ্গে পরবর্তী বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, ডেনমার্ক ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনে কোচ পুরো বিষয়টি পরিষ্কার করবেন। সেখানে তিনি এটিও স্বীকার করবেন যে রোনালদো নিজে থেকে খেলার জন্য কোনো চাপ দেননি।
কিন্তু সংবাদ সম্মেলনে জেসাসের বক্তব্য আগের আলোচনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না বলে দাবি রোনালদোর। বরং কোচের আচরণে তিনি ‘আগ্রাসন’ অনুভব করেছিলেন। রোনালদোর ভাষায়, এটিই ছিল তাঁর সঙ্গে কোচের দ্বিতীয়বার কথা না রাখার ঘটনা। এরপরই জাতীয় দলের শিবির ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
তবে নিজের সিদ্ধান্তের দায় এড়াননি পর্তুগিজ তারকা। রাগ ও অভিমানের বশে শিবির ছেড়ে যাওয়া উচিত হয়নি—এ কথা স্বীকার করে সতীর্থ, কোচিং স্টাফ এবং দেশের সমর্থকদের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছেন তিনি। ফেডারেশন তাঁর বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিলে সেটিও মেনে নেবেন বলে জানিয়েছেন।
অধিনায়ক হিসেবে নিজের দায়িত্বের কথাও স্বীকার করেছেন রোনালদো। তাঁর মতে, ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা মতপার্থক্য যতই থাকুক, জাতীয় দলের অধিনায়ক হিসেবে আরও দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত ছিল। সেই জায়গায় নিজের সিদ্ধান্তকে ভুল হিসেবে দেখছেন তিনি।
তবে দীর্ঘ বিবৃতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল জাতীয় দলের হয়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর অবস্থান। ৪১ বছর বয়সী রোনালদো স্পষ্ট করেছেন, পর্তুগালের জার্সিতে খেলার ইচ্ছা এখনো শেষ হয়ে যায়নি। দেশের হয়ে মাঠে নামা এবং দলের হয়ে জয়ের স্বপ্ন তাঁর কাছে আগের মতোই গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থাৎ কোচের সঙ্গে সাম্প্রতিক বিরোধের কারণে জাতীয় দলে তাঁর অধ্যায় শেষ হয়ে যাচ্ছে—এমন কোনো বার্তা দেননি রোনালদো। বরং নিজের ভুল স্বীকারের পাশাপাশি দেশের হয়ে খেলার আগ্রহও স্পষ্ট করেছেন। এখন তাঁর সঙ্গে জেসাসের সম্পর্ক কীভাবে এগোয়, সেটিই হয়ে উঠেছে পর্তুগাল ফুটবলের অন্যতম আলোচিত বিষয়।
রোনালদোর এই বিবৃতির সময়টিও ঘটনাটিকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা। যেদিন আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির শেষ ম্যাচ ঘিরে আবেগ, স্মৃতি আর বিদায়ের আবহে ভাসছিল বিশ্ব ফুটবল, সেদিনই রোনালদোর কণ্ঠে উঠে এল ক্ষোভ, অভিমান ও নিজের অবস্থান ব্যাখ্যার তাগিদ।
দুই মহাতারকার ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায় তাই যেন দুই ভিন্ন দৃশ্যপট। মেসির বিদায়ে যেখানে ছিল আবেগঘন সম্মান আর স্মৃতিচারণ, সেখানে রোনালদোর বক্তব্যে ফুটে উঠল অভিমান, ভুল স্বীকার এবং জাতীয় দলে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে দৃঢ় অবস্থান। তবে একটি জায়গায় দুজনের গল্প এখনো একই—দুজনের কাছেই জাতীয় দলের জার্সির গুরুত্ব এখনো অমলিন।