একজনের কর্নার থেকে অন্যজনের শেষ গোল। তারপর আলিঙ্গন। যেন দুই দশকের একটি গল্প কয়েক সেকেন্ডে এসে থেমে গেল বুয়েনস আয়ার্সের সেই রাতে
একটি কর্নার উড়ে গেল পেনাল্টি এলাকার দিকে। বল নামার আগেই ছুটে গেলেন নিকোলাস ওতামেন্দি। শরীরটা সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে এক ঝটকায় পা ছুঁইয়ে দিলেন বলে। জাল কাঁপল। মনুমেন্তাল গর্জে উঠল। আর গোলের পর যে মানুষটি ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরলেন, তিনি লিওনেল মেসি।
হয়তো আর্জেন্টিনার জার্সিতে বিদায়ের জন্য এর চেয়ে সুন্দর দৃশ্য আর হতে পারত না।
একজনের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ। আরেকজনেরও। একজনের কর্নার থেকে অন্যজনের শেষ গোল। তারপর আলিঙ্গন। যেন দুই দশকের একটি গল্প কয়েক সেকেন্ডে এসে থেমে গেল বুয়েনস আয়ার্সের সেই রাতে।
বেনিনের বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়ে আর্জেন্টিনা শুধু মেসিকে বিদায় জানায়নি, বিদায় জানিয়েছে তাদের সোনালি প্রজন্মের আরেক গুরুত্বপূর্ণ সৈনিককেও। ১৪০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচে গোল করে মাঠ ছাড়েন ৩৮ বছর বয়সী ওতামেন্দি। মেসি ২০৮ ম্যাচ ও ১২৬ গোলের আন্তর্জাতিক অধ্যায় শেষ করেন।
কিন্তু সংখ্যার ভেতরে যে গল্প, তার শুরুটা হয়েছিল আরও অনেক আগে।
২০০৯ সালে আর্জেন্টিনার জাতীয় দলে অভিষেক ওতামেন্দির। তখন মেসি দলের সবচেয়ে বড় তারকা হয়ে উঠছেন, কিন্তু জাতীয় দলের সাফল্যের গল্প তখনও অধরা। ২০১৪ বিশ্বকাপ সেই প্রজন্মের সামনে খুলে দিয়েছিল সবচেয়ে বড় দরজা। ব্রাজিলের মাটিতে ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছেও জার্মানির কাছে অতিরিক্ত সময়ে হেরে স্বপ্নভঙ্গ। মেসির চোখে অশ্রু, আর্জেন্টিনার কোটি মানুষের বুকভরা হতাশা। সেই দলেরই অংশ ছিলেন ওতামেন্দি।
এরপর আরও দুটি ক্ষত—২০১৫ ও ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনাল। দুবারই চিলির কাছে টাইব্রেকারে হার। ২০১৬ সালের পর মেসি তো জাতীয় দল থেকেই সরে দাঁড়ানোর কথা বলেছিলেন। মনে হয়েছিল, এই প্রজন্ম বুঝি কোনোদিনই আর্জেন্টিনাকে বড় কোনো আন্তর্জাতিক ট্রফি এনে দিতে পারবে না।
কিন্তু গল্প তখনও শেষ হয়নি। মেসি ফিরলেন। ওতামেন্দিও থেকে গেলেন। তাদের সঙ্গে যোগ হলো নতুন প্রজন্ম। ড্রেসিংরুমের পরিবেশ বদলাল, বদলাল দলের আত্মবিশ্বাস। লিওনেল স্কালোনির অধীনে আর্জেন্টিনা ধীরে ধীরে পরিণত হলো এমন এক দলে, যেখানে তারকার চেয়ে দলটাই বড়।
২০২১ কোপা আমেরিকার ফাইনালে ব্রাজিলকে হারিয়ে ২৮ বছরের অপেক্ষার অবসান। মেসির হাতে উঠল প্রথম বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি। ওতামেন্দি তখন রক্ষণে দাঁড়িয়ে সেই সাফল্যের অন্যতম প্রহরী। পরের বছর ফিনালিসিমায় ইতালিকে হারিয়ে আরেকটি শিরোপা। তারপর কাতার।
২০২২ বিশ্বকাপ যেন আগের সব ব্যর্থতার উত্তর হয়ে এল। সৌদি আরবের কাছে অপ্রত্যাশিত হার দিয়ে শুরু হয়েছিল অভিযান। তারপর একে একে মেক্সিকো, পোল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস, ক্রোয়েশিয়া। ফাইনালে ফ্রান্স। নাটক, উত্তেজনা, টাইব্রেকার—সব পেরিয়ে বিশ্বকাপ উঠল মেসির হাতে। আর সেই ছবিতে ওতামেন্দিও ছিলেন। রক্ষণে তার অভিজ্ঞতা, শক্তি ও লড়াইয়ের মানসিকতা ছিল স্কালোনির দলের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
মেসি আর ওতামেন্দির সম্পর্কও তখন কেবল মাঠের সতীর্থের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। দীর্ঘদিনের একসঙ্গে পথচলা তাদের মধ্যে তৈরি করেছে অন্যরকম ঘনিষ্ঠতা। কঠিন সময়ে একে অন্যকে পাশে পেয়েছেন, সাফল্যের মুহূর্ত ভাগ করেছেন। ওতামেন্দির বিদায়ী ম্যাচের আগে মেসির একটি ফোনই তাকে আবার জাতীয় দলের দরজায় ফিরিয়ে আনে—নিজের বিদায়ের দিনটিতে বন্ধুর পাশে থাকার জন্য।
সেই বন্ধুত্বের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচের দৃশ্যটি তাই আরও অর্থবহ। ৪৮ মিনিটে মেসির কর্নার। ওতামেন্দির গোল। চার মিনিট পরই মাঠ থেকে বিদায়। গ্যালারি দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানাচ্ছে। সতীর্থরা এগিয়ে আসছেন। আর শেষ আলিঙ্গনটা মেসির সঙ্গে। ওতামেন্দি পরে বলেছেন, শেষ ম্যাচে জাতীয় দলের হয়ে শেষ গোল করা এমন কিছু, যা তিনি সারাজীবন সঙ্গে নিয়ে চলবেন। ১৭ বছর জাতীয় দলের সঙ্গে কাটানোর পর এমন সমাপ্তি তার কাছে ছিল অবিশ্বাস্য।
আসলে এই একটি গোলের মধ্যেই যেন লুকিয়ে ছিল আর্জেন্টিনার একটি যুগ।
২০২১-এর কোপা আমেরিকা, ২০২২-এর ফিনালিসিমা ও বিশ্বকাপ, ২০২৪-এর কোপা আমেরিকা—চারটি বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা জয়ের সেই দলে ছিলেন ওতামেন্দি। ২০২৪-এ কলম্বিয়াকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয় কোপা আমেরিকা জিতে আর্জেন্টিনা তাদের আধিপত্যের আরেকটি অধ্যায় লিখেছিল।
তারপর ধীরে ধীরে বিদায়ের পালা।
২০২৪ কোপা আমেরিকাতেই অ্যাঞ্জেল দি মারিয়া জাতীয় দলকে বিদায় জানান। এখন মেসি ও ওতামেন্দিও সরে দাঁড়ালেন। অর্থাৎ যে প্রজন্ম একসময় ব্যর্থতার ভারে নুয়ে পড়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেই প্রজন্মই আর্জেন্টিনাকে ফিরিয়ে দিয়েছে আন্তর্জাতিক ফুটবলের শীর্ষে।
এই গল্পের সৌন্দর্য এখানেই—তারা জিতেছে শুধু শিরোপা নয়, সময়কেও। সমালোচনা থেকে ভালোবাসায়, কান্না থেকে উৎসবে, ব্যর্থতার স্মৃতি থেকে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের গৌরবে পৌঁছেছে একটি প্রজন্ম।
আর ওতামেন্দির শেষ দৃশ্যটি যেন সেই গল্পের সবচেয়ে মানবিক ছবি।
মেসির কর্নার থেকে গোল। গোলের পর আলিঙ্গন। তারপর বিদায়।
আর্জেন্টিনার জার্সিতে ওতামেন্দির শেষ গোলটি তাই শুধু ১০ নম্বর গোল নয়। এটি ছিল একটি বন্ধুত্বের শেষ স্বাক্ষর, ১৭ বছরের আনুগত্যের পুরস্কার এবং এক সোনালি প্রজন্মের ধীরে ধীরে মঞ্চ ছাড়ার প্রতীক।
মেসি যখন শেষবারের মতো মনুমেন্তালের দিকে হাত তুললেন, পাশে তখন আরেক বিদায়ী সৈনিক নেই। কিন্তু ইতিহাসে তাদের নাম পাশাপাশি থাকবে—একজন ছিলেন আর্জেন্টিনার স্বপ্নের মুখ, অন্যজন সেই স্বপ্নের পেছনের প্রহরী।
একদিন হয়তো মানুষ শুধু মনে রাখবে, আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিতেছিল। কিন্তু সেই জয়ের গল্প যারা জানে, তারা মনে রাখবে—একটি সময় ছিল, যখন মেসি সামনে থেকে আলো দেখাতেন, আর ওতামেন্দি পেছন থেকে সেই আলোকে পাহারা দিতেন।
শেষ রাতে সেই দুজনের গল্পও শেষ হলো একই ছবিতে—মেসির কর্নার, ওতামেন্দির গোল, আর এক দীর্ঘ আলিঙ্গন।