আর্জেন্টিনার হয়ে লিওনেল মেসির সম্ভাব্য শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ ঘিরে বুয়েন্স এইরেসে যখন উৎসবের আবহ, তখনও নিজের দায়িত্বে অটল বেনিনের গোলরক্ষক মার্সেল দানজিনু। মেসির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা থাকলেও মাঠের লড়াইয়ে কোনো ছাড় দিতে নারাজ ২৮ বছর বয়সী এই গোলরক্ষক। তার সাফ কথা, মেসিকে সম্মান জানাতেই তারা আর্জেন্টিনায় এসেছেন, কিন্তু কোনো গোল উপহার দিতে নয়। এমনকি ম্যাচের শেষ মুহূর্তে আর্জেন্টিনা পেনাল্টি পেলেও মেসির শট ঠেকাতে নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করবেন তিনি।
আগামী বুধবার বাংলাদেশ সময় ভোর ৫টায় বুয়েন্স এইরেসের মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হবে আফ্রিকার দেশ বেনিন। এরই মধ্যে আর্জেন্টিনা দলের অনুশীলনে যোগ দিয়েছেন মেসি। এখন অপেক্ষা জাতীয় দলের জার্সিতে তাকে শেষবারের মতো মাঠে দেখার মুহূর্তটির।
মেসির মুখোমুখি হওয়ার আগে স্প্যানিশ ক্রীড়া দৈনিক মার্কাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দানজিনু বলেন, ‘আমি গোলরক্ষক এবং গোল আটকানোই আমার কাজ। ম্যাচের শেষ মুহূর্তেও যদি আর্জেন্টিনা পেনাল্টি পায় এবং মেসি শট নিতে আসেন, আমি সেটা ঠেকানোরই চেষ্টা করব। বিষয়টা খুবই সহজ—এটা ফুটবল। আমরা এখানে মেসিকে সম্মান জানাতে এসেছি ঠিকই, কিন্তু তাকে কোনো গোল উপহার দিতে হবে—এমন কথা কেউ আমাদের বলেনি। আর মেসিকেও কোনো কিছু উপহার দেওয়ার দরকার নেই। গোল করতে হলে তাকে নিজের সেরাটা দিয়েই গোল করতে হবে।’
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ৯৩তম স্থানে থাকা বেনিনের জন্য ম্যাচটিকে জীবনের অন্যতম বড় সুযোগ হিসেবে দেখছেন দানজিনু। তবে মেসির বিদায়ী ম্যাচের আবহে বুয়েন্স এইরেসে শুধু উৎসবের অংশ হতে বা শহর ঘুরতে আসেনি বেনিন—এ কথাও স্পষ্ট করেছেন তিনি।
‘আমার কাছে এই ম্যাচ অন্য যেকোনো সাধারণ ম্যাচের মতো নয়। যেহেতু এটি মেসির শেষ ম্যাচ, তাই আমার মনে হয়, এটা জীবনে একবারই আসা এক সুযোগ। এটি বিশেষ একটি ম্যাচ। তবে আমরা এখানে আর্জেন্টিনা ও মেসির জন্য এসেছি ঠিকই, কিন্তু আমরা যে নিজেদের দেশের প্রতিনিধিত্ব করছি, সেটি ভুলে গেলে চলবে না। আমরা বেনিনের হয়ে খেলতে এসেছি। এটা তো ফুটবল—১১ জনের বিপক্ষে ১১ জনের লড়াই। আমরা জিততে পারি, ম্যাচ ড্র হতে পারে কিংবা ওরাও জিততে পারে। আমরা আর্জেন্টিনায় পর্যটক হয়ে ঘুরতে আসিনি; এসেছি খেলতে এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে। আমাদের জীবনে এটি দারুণ একটি দিন হয়ে থাকবে।’
ফুটবলের দুই মহাতারকা মেসি ও ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর খেলা দেখেই বেড়ে উঠেছেন দানজিনু। তার চোখে মেসি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা। একই মাঠে তার বিপক্ষে খেলার সুযোগকে তাই অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে বেনিনের এই গোলরক্ষকের।
‘আমার চোখে, তিনি ফুটবলের অন্যতম সম্রাট। আমরা তার খেলা দেখেই বড় হয়েছি। তিনি আমাদের পছন্দের খেলোয়াড়দের একজন। এখন একই মাঠে তার বিপক্ষে খেলতে পারাটা বিশ্বাস করা কঠিন। কখনো ভাবিনি এমনটা হতে পারে, কিন্তু বুধবার সেটাই ঘটতে যাচ্ছে। আমার কাছে, লিও এক জীবন্ত কিংবদন্তি, খাঁটি এক কিংবদন্তি।’
দক্ষিণ আফ্রিকার ক্লাব ক্রুগার ইউনাইটেডের এই গোলরক্ষক আরও বলেন, ‘আমরা মেসি ও ক্রিস্তিয়ানো—দুজনকে দেখেই বড় হয়েছি। তারা দুজনেই আমাদের ফুটবল সম্পর্কে অনেক কিছু শিখিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে তারা দুজন নিজেদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে যাচ্ছেন। আমার কাছে, লিও এই খেলার সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার। ফুটবলের সম্রাটদের একজন।’
ম্যাচের ফলের পাশাপাশি মেসির বিশেষ নকশার শেষ আন্তর্জাতিক জার্সি নিয়েও বেনিন শিবিরে চলছে আগ্রহ। ৩৯ বছর বয়সী আর্জেন্টাইন মহাতারকার সেই স্মারক জার্সিটি কে পাবেন, তা নিয়ে দলের খেলোয়াড়দের মধ্যেই তৈরি হয়েছে এক ধরনের প্রতিযোগিতা। দানজিনু অবশ্য বিষয়টি নিয়ে মজা করেই বলেছেন, ‘আমাদের দলের যেকোনো খেলোয়াড়কে জিজ্ঞেস করুন, সবাই মেসির জার্সি চাইবে। সবচেয়ে ভালো হতো, যদি তারা অনেকগুলো জার্সি বানিয়ে আমাদের দলের সবাইকে একটি করে দিয়ে দিত! কারণ মাত্র একজন যদি জার্সিটি নেওয়ার সুযোগ পায়, তবে সেটা পাওয়া সহজ হবে না—কারণ আমরা সবাই ওটা চাই।’
তর্কসাপেক্ষে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা তারকার বিদায়ী ম্যাচের অংশ হতে পারাটাকে নিজের ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় স্মৃতি হিসেবে দেখছেন দানজিনু। তার ভাষায়, ‘এখানে খেলতে পারাটা অনেক বড় এক সম্মান এবং এই স্মৃতি আজীবন আমার সঙ্গে থেকে যাবে। পরবর্তীতে নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে বলতে গিয়ে আমি গর্ব করে বলতে পারব, “আমি সেখানে ছিলাম, একজন কিংবদন্তির শেষ ম্যাচে। মেসির বিদায়ী ম্যাচে আমি মাঠে ছিলাম।” সত্যিই দারুণ এক অনুভূতি।’
মেসির প্রতি শ্রদ্ধা থাকবে, থাকবে আবেগও। কিন্তু বাঁশি বাজার পর সেই আবেগের জায়গা নেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা—দানজিনুর কথাতেই যার স্পষ্ট ইঙ্গিত। মনুমেন্টালের সেই রাতে তাই একদিকে থাকবে মেসির বিদায়ের আবেগ, অন্যদিকে বেনিন গোলরক্ষকের সামনে থাকবে ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলারের শট ঠেকানোর কঠিন পরীক্ষা।