বায়ার্নের হয়ে ৬১ গোল, ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে মৌসুমে ৭৩ গোল
ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে গোলের পর গোল করে অবশেষে ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি পেলেন হ্যারি কেইন। ইংল্যান্ডের অধিনায়ক ও বায়ার্ন মিউনিখের এই স্ট্রাইকার জিতেছেন ২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অর। ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে ও স্পেনের লামিন ইয়ামালকে পেছনে ফেলে ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো ফুটবলের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ এই পুরস্কার জিতলেন ৩৩ বছর বয়সী কেইন। ২৫ বছর পর তাঁর হাত ধরে পুরুষদের ব্যালন ডি’অর ফিরল ইংল্যান্ডে। নারী বিভাগে তৃতীয়বারের মতো সেরা হয়েছেন স্পেনের মিডফিল্ডার অ্যালেক্সিয়া পুতেয়াস।
সোমবার রাতে লন্ডনের প্যালাডিয়াম থিয়েটারে বসে ব্যালন ডি’অরের ৭০তম আসর। ১৯৫৬ সালে শুরু হওয়া এই পুরস্কারের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো লন্ডনে অনুষ্ঠিত হয় অনুষ্ঠানটি। ফরাসি সাময়িকী ‘ফ্রান্স ফুটবল’ প্রবর্তিত এই পুরস্কার ২০২৪ সাল থেকে উয়েফার সঙ্গে যৌথভাবে আয়োজন করা হচ্ছে। এবারের আসরে পুরুষ ও নারী বিভাগের পাশাপাশি তরুণ খেলোয়াড়, গোলরক্ষক, কোচ ও ক্লাবসহ বিভিন্ন বিভাগে পুরস্কার দেওয়া হয়।
কেইনের হাতে ব্যালন ডি’অর ওঠার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে ২০২৫-২৬ মৌসুমে তাঁর অবিশ্বাস্য গোলসংখ্যা ও ধারাবাহিক পারফরম্যান্স। বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৫১ ম্যাচে ৬১ গোল করেন তিনি। তাঁর নৈপুণ্যে জার্মান ক্লাবটি ঘরোয়া লিগ ও কাপের শিরোপা জেতে। ক্লাবের সাফল্যের পাশাপাশি ইংল্যান্ডের জার্সিতেও ছিলেন কার্যকর। বিশ্বকাপে ছয় গোল করে দলকে সেমিফাইনাল পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এই ফরোয়ার্ড।
ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে মৌসুম শেষে কেইনের গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ৭৩। গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরি, আক্রমণ গড়ে তোলা এবং গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষমতাও তাঁকে অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে এগিয়ে রাখে। ব্যালন ডি’অরের দৌড়ে এমবাপ্পে ও ইয়ামালের মতো তারকাদের সঙ্গে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল তীব্র। তবে পুরো মৌসুমজুড়ে ধারাবাহিকতা ও গোলের কার্যকারিতায় ভোটারদের আস্থা অর্জন করেন কেইন।

পুরস্কার জয়ের পর আবেগাপ্লুত কেইন বলেন, ‘বাহ, বাহ, বাহ! আমি প্রায় বাক্রুদ্ধ।’ লন্ডনে নিজের শহরের দর্শকদের সামনে এই স্বীকৃতি পাওয়া তাঁর কাছে বিশেষ আনন্দের বলেও জানান তিনি। ভোট দেওয়া ব্যক্তিদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে কেইন বলেন, এ বছর প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল কঠিন; অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশ্বমানের অনেক খেলোয়াড়।
ইংলিশ ফুটবলের ইতিহাসেও কেইনের এই অর্জন তাৎপর্যপূর্ণ। সর্বশেষ ২০০১ সালে ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন ইংল্যান্ডের সাবেক স্ট্রাইকার মাইকেল ওয়েন। এরপর দীর্ঘ ২৫ বছর কোনো ইংলিশ খেলোয়াড় পুরুষদের এই পুরস্কার জিততে পারেননি। সেই অপেক্ষার অবসান ঘটালেন কেইন। তিনি হলেন ব্যালন ডি’অরজয়ী পঞ্চম ইংলিশ ফুটবলার। এর আগে ১৯৫৬ সালে প্রথম আসরে স্যার স্ট্যানলি ম্যাথিউস, ১৯৬৬ সালে স্যার ববি চার্লটন এবং ১৯৭৮ ও ১৯৭৯ সালে কেভিন কিগান এই পুরস্কার জিতেছিলেন। ২০০১ সালে ওয়েনের পর এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলো কেইনের নাম।
কেইনের ব্যক্তিগত সাফল্য তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তরুণ বয়সে টটেনহাম হটস্পারে জায়গা পেতে তাঁকে একাধিকবার ধারে অন্য ক্লাবে খেলতে হয়েছিল। পরে নিজের গোল করার দক্ষতা, খেলার বোধ ও নেতৃত্বের গুণে বিশ্বের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান তিনি। ২০২৩ সালে বায়ার্ন মিউনিখে যোগ দেওয়ার পর ক্লাব পর্যায়ে শিরোপা জয়ের সুযোগ পান। ২০২৫-২৬ মৌসুমে দলীয় সাফল্যের সঙ্গে ব্যক্তিগত গোলের রেকর্ড গড়ে ব্যালন ডি’অর জয় তাঁর ক্যারিয়ারকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেল।
নারী বিভাগে ব্যালন ডি’অর জিতে আলোচনায় এসেছেন অ্যালেক্সিয়া পুতেয়াস। স্পেনের এই মিডফিল্ডার ২০২১ ও ২০২২ সালের পর এবার তৃতীয়বারের মতো পুরস্কারটি জিতলেন। বার্সেলোনার হয়ে ২০২৫-২৬ মৌসুমে একাধিক শিরোপা জয়ের অভিযানে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। দলটি ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সাফল্য পাওয়ার পাশাপাশি স্প্যানিশ সুপার কাপও জেতে। ১৪ বছর বার্সেলোনায় কাটানোর পর গত জুলাইয়ে নারী সুপার লিগের ক্লাব লন্ডন সিটি লায়নেসেসে যোগ দেন পুতেয়াস। নতুন ক্লাবে যাওয়ার আগে বার্সেলোনার হয়ে তাঁর সাফল্যই এবারের পুরস্কার জয়ে বড় ভূমিকা রাখে।
এবারের অনুষ্ঠানে তরুণ খেলোয়াড়দের বিভাগেও ছিল স্প্যানিশদের সাফল্য। পুরুষদের বর্ষসেরা তরুণ খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন লামিন ইয়ামাল। নারী বিভাগে এই পুরস্কার জিতেছেন বার্সেলোনার ভিকি লোপেজ। পুরুষদের বর্ষসেরা কোচ হয়েছেন স্পেন জাতীয় দলের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে এবং নারী বিভাগের পুরস্কার পেয়েছেন বার্সেলোনার কোচ পেরে রোমেউ। পুরুষদের সেরা গোলরক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন স্পেনের উনাই সিমন, নারী বিভাগে সেরা কাতা কোল। পুরুষদের বর্ষসেরা ক্লাব হয়েছে প্যারিস সাঁ জেরমাঁ এবং নারী বিভাগে বার্সেলোনা। পুরুষদের সেরা স্ট্রাইকারের পুরস্কারও পেয়েছেন কেইন।
সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অর কেইনের জন্য শুধু ব্যক্তিগত পুরস্কার নয়, দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসানও। ক্লাব ফুটবলে শিরোপা, জাতীয় দলের হয়ে বড় টুর্নামেন্টে গোল এবং মৌসুমজুড়ে ধারাবাহিকতা—এই তিনের সমন্বয় তাঁকে এনে দিয়েছে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম কাঙ্ক্ষিত স্বীকৃতি। অন্যদিকে, পুতেয়াসের তৃতীয়বারের জয় নারী ফুটবলে তাঁর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ও ধারাবাহিক সাফল্যের আরেকটি বড় স্বীকৃতি হয়ে থাকল।
টানা তৃতীয়বার সেরা তরুণ ইয়ামাল, নারী বিভাগে আবারও ভিকি লোপেস
বর্ষসেরা ফুটবলারের ব্যালন ডি’অর জিতবেন কি না, তা নিয়ে অপেক্ষা থাকছেই। তবে পুরুষ ফুটবলের সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের স্বীকৃতিতে আর কারও জন্য জায়গা রাখলেন না লামিন ইয়ামাল। টানা তৃতীয়বারের মতো ব্যালন ডি’অরের কোপা ট্রফি জিতেছেন বার্সেলোনা ও স্পেনের এই তরুণ ফরোয়ার্ড। নারী বিভাগেও সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের পুরস্কার ধরে রেখেছেন তাঁর বার্সেলোনা সতীর্থ ভিকি লোপেস।

সোমবার রাতে লন্ডনের প্যালাডিয়াম থিয়েটারে আয়োজিত ব্যালন ডি’অরের জমকালো অনুষ্ঠানে ইয়ামালের হাতে কোপা ট্রফি তুলে দেওয়া হয়। ২০১৮ সালে চালু হওয়া এই পুরস্কারের ইতিহাসে তিনিই প্রথম খেলোয়াড়, যিনি টানা তিনবার সেরা তরুণের স্বীকৃতি পেলেন। এর আগে কোনো ফুটবলার একাধিকবার এই পুরস্কার জিততে পারেননি।
গত মৌসুমে বার্সেলোনার সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন ইয়ামাল। তাঁর নৈপুণ্যে স্প্যানিশ ক্লাবটি জেতে লা লিগা, কোপা দেল রে ও স্প্যানিশ সুপার কাপের শিরোপা। ক্লাবের হয়ে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের পাশাপাশি স্পেন জাতীয় দলের হয়েও নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেন এই তরুণ। ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে গত মৌসুমে ৫৭ ম্যাচে ২৫ গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে ২০টি গোল করিয়েছেন ১৯ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড।
পুরস্কার গ্রহণের পর উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন ইয়ামাল। তিনি বলেন, ‘এখানে উপস্থিত থাকতে পারা এবং এই পুরস্কার গ্রহণ করতে পারা সম্মানের। তৃতীয়বার এই পুরস্কার জিতলাম। আমার ক্লাব এবং জাতীয় দলকে ধন্যবাদ জানাতে চাই।’
নিজের অর্জনের আনন্দের মধ্যেও সতীর্থ পাউ কুবার্সির কথা ভুলে যাননি ইয়ামাল। তাঁর মতে, এই পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য ছিলেন বার্সেলোনার তরুণ ডিফেন্ডারও। ইয়ামাল বলেন, ‘আমার সতীর্থ কুবার্সি এটা জিতলে ভালো লাগত। কারণ, আমি মনে করি এই পুরস্কারটি তার পাওয়া উচিত। সে বেশ অনেক দিন ধরে দারুণ একটি স্তরে খেলছে।’
ইয়ামালের এই স্বীকৃতি তাঁর দ্রুত উত্থানেরই আরেকটি প্রমাণ। অল্প বয়সেই বার্সেলোনার আক্রমণভাগের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে ওঠা এই ফুটবলার গতি, ড্রিবলিং, বল নিয়ন্ত্রণ ও গোলের সুযোগ তৈরির দক্ষতায় আলাদা পরিচিতি গড়েছেন। প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙার পাশাপাশি নিজে গোল করা এবং সতীর্থদের গোলের সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার ক্ষমতাও তাঁকে ইউরোপের অন্যতম আলোচিত তরুণ খেলোয়াড়ে পরিণত করেছে।
এদিকে নারী বিভাগে টানা দ্বিতীয়বারের মতো কোপা ট্রফি জিতেছেন বার্সেলোনার ভিকি লোপেস। ফলে পুরুষ ও নারী—দুই বিভাগেই তরুণ ফুটবলারদের পুরস্কার গেল একই ক্লাবের খেলোয়াড়দের হাতে।
ব্যালন ডি’অরের মূল পুরস্কারের দৌড়েও রয়েছেন ইয়ামাল। তবে বর্ষসেরা ফুটবলারের স্বীকৃতি শেষ পর্যন্ত তাঁর হাতে উঠবে কি না, তা নির্ভর করছে ভোটের ফলের ওপর। আপাতত তরুণদের বিভাগে টানা তিনবার সেরা হওয়ার অনন্য কীর্তিই তাঁর অর্জনের তালিকায় নতুন মাত্রা যোগ করল।