জাতিসংঘের কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনা, নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার এবং বৈশ্বিক আস্থা পুনর্গঠনের ওপর জোর দিয়েছেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। ৮ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি বলেন, জাতিসংঘের প্রতি আস্থা শুধু চাইলেই ফিরবে না; কার্যকর সিদ্ধান্ত, প্রতিশ্রুতি রক্ষা এবং মানুষের জন্য বাস্তব ফল নিশ্চিত করার মাধ্যমে তা অর্জন করতে হবে।
চলতি অধিবেশনের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—‘আস্থা পুনরুদ্ধার, রূপান্তর ব্যবস্থাপনা: সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ’। জাতিসংঘের অফিসিয়াল তথ্য অনুযায়ী, ৮১তম অধিবেশন ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ শুরু হয়েছে এবং এর সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন বাংলাদেশের খলিলুর রহমান।
নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামোগত বৈষম্যের বিষয়টি তুলে ধরে খলিলুর রহমান আফ্রিকার প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তাঁর বক্তব্যে, জাতিসংঘের অন্যতম বৃহৎ আঞ্চলিক সদস্যগোষ্ঠী এবং শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও আফ্রিকা নিরাপত্তা পরিষদে কোনো স্থায়ী আসন পায়নি। তাঁর মতে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় আফ্রিকার যথাযথ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা ন্যায়বিচার ও জাতিসংঘের গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
তিনি নিরাপত্তা পরিষদকে আরও স্বচ্ছ, প্রতিনিধিত্বশীল এবং বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার ওপর গুরুত্ব দেন। এ ক্ষেত্রে সাধারণ পরিষদের আন্তঃসরকারি আলোচনা প্রক্রিয়ার প্রতি সমর্থন জানান তিনি।
জাতিসংঘের প্রতি বৈশ্বিক আস্থা পুনরুদ্ধারে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পাশাপাশি নিজেদের সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতা স্বীকার করার ওপরও জোর দেন সাধারণ পরিষদের সভাপতি। তিনি বলেন, জাতিসংঘকে বর্তমান ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও কার্যকর ও সক্ষম করে তুলতে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘আস্থা শুধু চাওয়া যায় না, তা অর্জন করতে হয়।’
খলিলুর রহমান জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম, শিল্প খাত, উদ্ভাবন ও একাডেমিয়ার মতো অংশীজনদের আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন। তাঁর মতে, জাতিসংঘকে ভবিষ্যতের উপযোগী করে তুলতে রাষ্ট্রগুলোর পাশাপাশি এসব পক্ষের অভিজ্ঞতা ও মতামতকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কাজে লাগানো প্রয়োজন।
বিশ্বব্যাপী বৈষম্য এবং সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়েও উদ্বেগ জানান তিনি। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে অগ্রগতি থমকে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে উন্নয়ন সহায়তা কমে যাওয়া এবং সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির মধ্যে যে বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে, তা তুলে ধরেন তিনি।
গাজা, সুদান, ইউক্রেন, মিয়ানমার ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রসঙ্গ টেনে খলিলুর রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক আইন এবং বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষার নীতি নির্বাচিতভাবে প্রয়োগ করা উচিত নয়। একই সঙ্গে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য মানবিক কার্যক্রম এবং হাইতিতে জাতিসংঘের কার্যক্রমের কথাও তিনি তুলে ধরেন।
প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়েও সতর্ক করেন সাধারণ পরিষদের সভাপতি। পানি সরবরাহ, বিদ্যুৎ ও সামরিক খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় এআইয়ের অপব্যবহার গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এআই-সংক্রান্ত ঝুঁকি মোকাবিলায় বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করে প্রমাণভিত্তিক বৈশ্বিক নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি।
জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির অগ্রাধিকারের মধ্যেও এআই ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রমাণভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টি রয়েছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘ সংস্কার ও আরও কার্যকর বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থাকে তাঁর কর্মসূচির অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে রাখা হয়েছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও অধিবেশনের উদ্বোধনে বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার প্রতি আস্থা পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তিনি খলিলুর রহমানের সভাপতিত্ব ও অধিবেশনের প্রতিপাদ্যকে স্বাগত জানান।
খলিলুর রহমানের উদ্বোধনী বক্তব্যের মূল বার্তা ছিল—বিশ্বব্যাপী সংকট মোকাবিলায় জাতিসংঘকে আরও কার্যকর করতে হলে আস্থা পুনর্গঠন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, অন্তর্ভুক্তিমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং নতুন প্রযুক্তির ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে।