মেয়াদ শেষ হতে যাওয়া ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কারিগরি পর্যায়ের বৈঠক অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে নয়াদিল্লি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, গঙ্গাসহ অভিন্ন নদীগুলোর পানি বণ্টনসংক্রান্ত বিষয় দুই দেশের যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) কাঠামোর মধ্যেই আলোচনা করা হবে। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির নবায়নের পরিবর্তে বাংলাদেশ নতুন চুক্তি চায়—সম্প্রতি পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানির এমন বক্তব্যের বিষয়ে ভারতের অবস্থান জানতে চাওয়া হলে জয়সওয়াল বলেন, দুই দেশের যৌথ নদী কমিশন রয়েছে। গঙ্গাসহ অভিন্ন নদীগুলোর পানি বণ্টনসংক্রান্ত বিষয় সেখানে আলোচনা করা হবে। একই সঙ্গে গঙ্গা চুক্তি নিয়েও কারিগরি পর্যায়ের বৈঠক চলমান রয়েছে।
বাংলাদেশের পানিসম্পদমন্ত্রী গত ২৪ সেপ্টেম্বর ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ঢাকা পুরোনো চুক্তি শুধু নবায়ন না করে গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে ভারতের সঙ্গে নতুন চুক্তি করতে চায়। নতুন চুক্তিতে গ্যারান্টি ক্লজ রাখার পাশাপাশি বাংলাদেশের স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
এর আগে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদও বলেছিলেন, গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে ভারত সিদ্ধান্ত নেবে বলে বাংলাদেশ আশা করে। তিনি জানিয়েছিলেন, দুই দেশের মধ্যে এ বিষয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে এবং সব আলোচনা প্রকাশ্যে আসে না।
১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও ভারত গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে ৩০ বছরের চুক্তি সই করে। চুক্তিটি প্রতিবছর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ফারাক্কায় গঙ্গার প্রবাহের ভিত্তিতে পানি বণ্টনের কাঠামো নির্ধারণ করে। বাংলাদেশ সরকারের যৌথ নদী কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, চুক্তিটি ২০২৬ সালে শেষ হওয়ার কথা।
চুক্তির আওতায় ফারাক্কায় গঙ্গার পানির প্রবাহ নির্দিষ্ট মাত্রা অনুযায়ী দুই দেশের মধ্যে ভাগ করা হয়। প্রবাহ ৭০ হাজার কিউসেক বা তার কম হলে দুই দেশ ৫০ শতাংশ করে পানি পায়। প্রবাহ ৭০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার কিউসেকের মধ্যে থাকলে বাংলাদেশ ৩৫ হাজার কিউসেক এবং অবশিষ্ট পানি ভারত পায়। আর প্রবাহ ৭৫ হাজার কিউসেকের বেশি হলে ভারত ৪০ হাজার কিউসেক পায় এবং অবশিষ্ট পানি বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত হয়।
এ ছাড়া প্রতিবছর ১১ মার্চ থেকে ১০ মে পর্যন্ত তিনটি ১০ দিনের পর্যায়ে পালাক্রমে দুই দেশের জন্য ৩৫ হাজার কিউসেক পানির নিশ্চয়তার বিধান রয়েছে। চুক্তির এই পানি বণ্টন ব্যবস্থা মূলত শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কা পয়েন্টের প্রবাহের ওপর ভিত্তি করে কার্যকর হয়।
চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার বছরেই এর ভবিষ্যৎ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা জোরদার হয়েছে। ২০২৬ সালের শুরুতে দুই দেশ গঙ্গা ও পদ্মার বিভিন্ন পয়েন্টে যৌথভাবে পানির প্রবাহ পরিমাপও শুরু করে। চুক্তি অনুযায়ী ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত নির্ধারিত পয়েন্টে প্রতি ১০ দিন পরপর পানি পরিমাপ করা হয়।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নতুন চুক্তিতে গ্যারান্টি ক্লজসহ দেশের দীর্ঘমেয়াদি পানির চাহিদা ও স্বার্থ বিবেচনার কথা বলা হলেও ভারতের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত নতুন চুক্তির কাঠামো বা শর্ত নিয়ে কোনো বিস্তারিত অবস্থান প্রকাশ করা হয়নি। ভারতের বক্তব্যে যৌথ নদী কমিশন ও বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় কাঠামোর মাধ্যমে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়টিই গুরুত্ব পেয়েছে।
এদিকে ব্রিফিংয়ে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের ঢাকা সফর নিয়ে ছড়িয়ে পড়া গুঞ্জন সম্পর্কেও জয়সওয়ালের কাছে জানতে চাওয়া হয়। এ বিষয়ে তাঁর কাছে কোনো তথ্য নেই বলে জানান ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র।
গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে পরবর্তী ব্যবস্থা নির্ধারণের জন্য দুই দেশের কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। তবে চুক্তিটি নবায়ন হবে, নাকি নতুন কোনো কাঠামোয় পানি বণ্টনের ব্যবস্থা করা হবে—এ বিষয়ে এখনো দুই দেশের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ঘোষণা আসেনি।