- হকারদের অভিযোগ, ভেকুর আঘাতে তার ছিঁড়ে পাঁচ দোকানে আগুন; স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, অভিযানে সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল—আটক ৩০
রাজধানীর মিরপুরে ফুটপাত দখলমুক্ত করতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) উচ্ছেদ অভিযান ঘিরে পুলিশ, সিটি করপোরেশনের কর্মী ও হকারদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে। হকার ও দোকানিদের একাংশের দাবি, উচ্ছেদের সময় বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে আগুন লাগার পর ক্ষোভ থেকে সংঘর্ষের সূত্রপাত। অন্যদিকে ডিএনসিসির প্রশাসক ঘটনাটিকে পরিকল্পিত হামলা ও অগ্নিসংযোগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, অভিযানে দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল বলে তাঁর মনে হয়েছে।
গত বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে হোপ মার্কেটের দিকে যাওয়া সড়কে ফুটপাতের অবৈধ দখল উচ্ছেদে অভিযান শুরু করে ডিএনসিসি। অভিযানের একপর্যায়ে বায়তুল কুদ্দুস জামে মসজিদ মার্কেটের নিচের দোকান সরানোর সময় ভেকুর আঘাতে বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে আগুন লাগে বলে স্থানীয় দোকানি ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। আগুনে পাঁচটি দোকান পুড়ে যায়। পরে আগুন লাগার ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং হকারদের সঙ্গে সিটি করপোরেশনের কর্মীদের সংঘর্ষ শুরু হয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে তাদের সঙ্গেও সংঘর্ষ বাধে।
আগুনে দোকান পুড়ে যাওয়া ব্যবসায়ী শরিফুল ইসলাম বলেন, সিটি করপোরেশনের ভেকু মার্কেটের সীমানার ভেতরে ভাঙচুর করার সময় বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে আগুন লাগে। এতে তাঁর দোকানসহ পাঁচটি দোকান পুড়ে গেছে। তাঁর ভাষ্য, আগুন লাগার পর ক্ষুব্ধ হকার ও দোকানিরা সিটি করপোরেশনের কর্মীদের ওপর চড়াও হলে সংঘর্ষ শুরু হয়। পরে পুলিশ এলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
সংঘর্ষের সময় সিটি করপোরেশনের তিনটি ময়লার গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। পুলিশের একটি গাড়ি, একটি ভেকু ও কয়েকটি বাস ভাঙচুরের খবরও পাওয়া যায়। সংঘর্ষের মধ্যে সংবাদ সংগ্রহ করতে যাওয়া সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। এতে পুলিশ সদস্যসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। ঘটনার পর মিরপুর ও আশপাশের এলাকা থেকে ৩০ জনকে আটক করে পুলিশ।
সংঘর্ষের পর ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন। তিনি বলেন, হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা পরিকল্পিত। তাঁর অভিযোগ, ‘ফ্যাসিজমের দোসররা’ এসব ঘটনা ঘটিয়েছে। তিনি আরও বলেন, অরাজকতায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে মামলা করা হবে এবং তদন্ত করে তাঁদের গ্রেপ্তার করতে হবে। একই সঙ্গে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত রাখার কথা জানান তিনি। তবে ঘটনার পেছনে কারা জড়িত, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার বিষয়।
অন্যদিকে, সংঘর্ষের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, অভিযানে দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশের মধ্যে যথাযথ যোগাযোগ হয়নি বলে তিনি জেনেছেন। সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, তাঁর ধারণা, এটি সমন্বয়ের অভাবের কারণে ঘটে থাকতে পারে। ফলে ডিএনসিসি প্রশাসকের পরিকল্পিত হামলার বক্তব্যের পাশাপাশি অভিযানের প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
সংঘর্ষের পর আবার উচ্ছেদ
ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের পর দুপুর ২টা ২০ মিনিটের দিকে আবার উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়। বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলে এ অভিযান। এতে পুলিশের পাশাপাশি এসআরবি সদস্যদেরও দেখা যায়। দ্বিতীয় দফায় মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরের পাশের ফুটপাতের দোকান ও অবৈধ স্থাপনা সরানো হয়। অভিযানের আগে অনেক দোকানি তাঁদের মালামাল সরিয়ে নেন।
এদিকে উচ্ছেদের পর ফুটপাত ও সড়কের কিছু অংশ অটোরিকশার দখলে চলে যাওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। মিরপুর সরকারি গার্লস স্কুলের নিরাপত্তাকর্মী পরিচয় দেওয়া সজল বলেন, আগে ফুটপাতজুড়ে দোকান বসায় যান চলাচলে সমস্যা হতো। উচ্ছেদের পর সড়কটি তুলনামূলক খোলামেলা হলেও পরে দুই পাশে অটোরিকশা জমায় আবার চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মারুফ হোসাইনও বলেন, ফুটপাত ছাড়িয়ে সড়কের মধ্যে দোকান বসানোর কারণে ওই এলাকায় যানজট লেগে থাকত। তবে তাঁর আশঙ্কা, নিয়মিত নজরদারি না থাকলে উচ্ছেদের পর আবার দখল শুরু হতে পারে।
মালামাল জব্দ ও নিলাম নিয়ে অভিযোগ
উচ্ছেদ অভিযানের নামে মালামাল জব্দ করে পরে নিলামে বিক্রি করার অভিযোগ তুলেছেন কয়েকজন হকার। জুতার দোকানি ইসমাইলের দাবি, ২১ সেপ্টেম্বর থেকে চলা অভিযানে সিটি করপোরেশনের লোকজন তাঁদের মালামাল জব্দ করছেন এবং পরে নিলামের মাধ্যমে সেগুলো আবার তাঁদের কাছেই বিক্রি করা হচ্ছে। মেয়েদের পোশাক বিক্রেতা খাদিজাও একই ধরনের অভিযোগ করেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সিটি করপোরেশনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার হাসান মোহাম্মাদ নাছের রিকাবদার বলেন, আটক ব্যক্তিদের পরিচয় ও ঘটনার সঙ্গে তাঁদের সম্পৃক্ততা যাচাই করা হচ্ছে। যাঁদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে না, তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হবে; অন্যদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ঘটনায় দুটি মামলা করার প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছেন ডিএনসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাকির হোসেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একটি মামলা করবে পুলিশ এবং অন্যটি করবে সিটি করপোরেশন।
মিরপুরের এ ঘটনা ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযান, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকা, নগরবাসীর নির্বিঘ্ন চলাচল এবং অভিযান পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের প্রশ্ন সামনে এনেছে। সংঘর্ষের কারণ, অগ্নিকাণ্ডের পরিস্থিতি এবং হামলা-ভাঙচুরে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়ার কথা। একই সঙ্গে উচ্ছেদে জব্দ করা মালামাল নিয়ে হকারদের অভিযোগেরও ব্যাখ্যা প্রয়োজন।