সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাবে কেন গণভোটের কথা বলা হচ্ছে, তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।তার মতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের পাশাপাশি ভবিষ্যতে এই ব্যবস্থা পরিবর্তন করতে হলেও জনগণের কাছে যাওয়ার সুযোগ রাখতে গণভোটের বিধান সংবিধানে পুনরায় যুক্ত করা হবে।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) জাতীয় সংসদে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবারের প্রতিনিধি ও ‘জুলাই যোদ্ধা’দের সঙ্গে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে এসব কথা বলেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমি দু-এক জায়গায় শুনছি, কেউ কেউ বলছেন সংবিধানে তো গণভোট নেই। আমরা কেন গণভোটের কথা বলছি? তারা সঠিক কথা বলছেন না। পঞ্চদশ সংশোধনের মাধ্যমে আর্টিকেল ১৪২ থেকে যে গণভোটের বিধানটা তুলে দেওয়া হয়েছিল, সেটার বৈধতা ছিল না। এবং সেটাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে ইতোমধ্যে হাইকোর্ট থেকে রায় দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ আগে যা ছিল, তাই সঠিক।’
কেন গণভোটের কথা বলা হচ্ছে, ব্যাখ্যা দিলেন সালাহউদ্দিন আহমদ
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পরিবর্তনে সংবিধানে ফিরছে গণভোটের বিধান
গণভোটের বিধান স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়েছে কি না- এমন প্রশ্নের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘অনেকে বলছেন, সেটা তো অটোমেটিক বহাল হয় না। এখানে আমার বক্তব্য হচ্ছে, সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় একটা ডকট্রিন আছে। এটা হচ্ছে ডকট্রিন অব ইক্লিপস।’
কেন গণভোটের কথা বলা হচ্ছে, ব্যাখ্যা দিলেন সালাহউদ্দিন আহমদ
সাড়ে ১৩ হাজার অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ নিয়োগে কাটল আইনি জট
‘ডকট্রিন অব ইক্লিপস’ ব্যাখ্যা করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এটা যারা আইনে প্রফেসরি করেন, আইনের ছাত্র তারা জানেন। চন্দ্রগ্রহণ যখন হয়, গ্রহণটা সরে গেলে চাঁদটা আবার আলো দেখা যায়। এটাকে বলা হয় ডকট্রিন অব ইক্লিপস। ওই সংবিধানের যে বিধানটা পরিবর্তন করে গণভোট বাতিল করে দিয়েছিল, সেটাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছে হাইকোর্ট। সুতরাং আগেরটা বহাল হয়েছে।’
তবে বিষয়টি সংবিধানে স্পষ্টভাবে পুনঃস্থাপনের প্রয়োজন রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখানে একটা আইনের জটিল প্রশ্ন আছে। সেটা যতদিন পার্লামেন্টে আবার সংবিধানে ধারণ না করবে, ততদিন পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিস্থাপিত হয়েছে বলা যাবে না। তবে বিচার বিভাগ তাদের যে রায় দিয়েছে, সেই রায় অনুসারে সংবিধানে আমরা এই সংশোধনীতে সেটা ধারণ করব।’
গণভোটের বিধান সংবিধানে পুনরায় যুক্ত করার বিষয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সুতরাং ইট ইজ দেয়ার। এটা অসাংবিধানিক যদি কেউ বলে, যদি বলে- এখন তো সংবিধানে গণভোটের বিধান নেই, গণভোটের বিধান বহাল হয়েছে- আমরা এটা যখন সংবিধানে নিয়ে আসব, তখন সেটা আমাদের মানতে হবে। সেই হিসাবে সাংবিধানিক ভোটটা।’
সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাবের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘যে সংশোধনটা আমরা সামনে আনব, সেখানে প্রস্তাবনা, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি সহ মৌলিক বিষয়গুলোতে পরিবর্তন আসবে। আর্টিকেল ৪৮ ও ৫৬-এ আসবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে আমরা কেন ধারণ করব, সেই বিষয়গুলো আসবে। আর্টিকেল ১৪২-এ যেখানে গণভোট ছিল, শেখ হাসিনার সরকার সেটা বাদ দিয়েছিল, সেখানে আবার সেটা আমাদের ধারণ করতে হবে।’
ভবিষ্যতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পরিবর্তনের সুযোগ রাখা হলেও জনগণের মতামত নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে চান বলে জানান তিনি। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনরায় আমরা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করলে সেটা যাতে ভবিষ্যতে কেউ সহজে পরিবর্তন করতে না পারে, সেজন্য আমরা ওইটা পরিবর্তন করলেও ভবিষ্যতে জনগণের কাছে যাতে যেতে হয়, সেই গণভোটের বিধান রাখতে হবে। সেজন্য এই পরিবর্তনগুলো এবং এই সাংবিধানিক সংশোধনীগুলো আমরা সংবিধানে আনলে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা অনুসারে আমাদের গণভোট দিতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তাছাড়া প্রস্তাবনা, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিসহ অন্যান্য মৌলিক বিষয়গুলো যেগুলোতে পরিবর্তন হলে সাংবিধানিক গণভোট দেওয়ার কথা, সেই ১৪২ অনুসারে সেটা তো আছেই এবং আমরা যুক্ত করব। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যবস্থা যে আমরা সংবিধানে আনছি, সেটা যাতে ভবিষ্যতে পরিবর্তন যদি কেউ করতে চায়, তখনও যাতে গণভোটের বিধান বহাল থাকে, জনগণের কাছে যেতে হয়-এইভাবে আমরা একটা সমৃদ্ধ সাংবিধানিক সংশোধনী আনব।’
উল্লেখ্য, ১৯৭৯ সালে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে ১৪২ অনুচ্ছেদে গণভোটের বিধান প্রথম যুক্ত করা হয়। পরে ২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আনা পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এ বিধান সংবিধান থেকে বাদ দেওয়া হয়। একই সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাও বাতিল করা হয়েছিল।
চলতি বছরের ৯ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ পঞ্চদশ সংশোধনীর মূল অংশগুলো অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাদ পড়া গণভোট ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিধান পুনঃস্থাপনের বিষয়টি সামনে আসে।
আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি পাওয়ার পর আইন মন্ত্রণালয় সংবিধানের সংশোধিত রূপ বা একটি টেক্সট প্রকাশ করবে বলে জানা গেছে। সেখানে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাদ পড়া ১৪২ অনুচ্ছেদের গণভোটের বিধান এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারসংক্রান্ত অনুচ্ছেদগুলো পুনঃস্থাপনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হবে।