ঢাকার কাছেই নতুন গ্যাসের সন্ধানে মানিকগঞ্জে অনুসন্ধান কূপ খননের পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স)। আগামী অর্থবছরে ‘মানিকগঞ্জ-১’ নামের কূপটি খননের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য ২ হাজার হর্সপাওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন নতুন একটি খননযন্ত্র বা রিগ কেনার প্রক্রিয়া চলছে। কূপ খনন ও পরীক্ষায় গ্যাসের উপস্থিতি এবং বাণিজ্যিক উৎপাদনের সম্ভাবনা নিশ্চিত হলে রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় দেশীয় গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এখনই মানিকগঞ্জে গ্যাস আবিষ্কারের দাবি করার সুযোগ নেই।
গত ১৭ অক্টোবর পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আব্দুল মান্নানের সই করা বৈঠকের কার্যপত্রে মানিকগঞ্জে অনুসন্ধান কূপ খননের পরিকল্পনার কথা উঠে এসেছে। এর আগে ৬ অক্টোবর বাপেক্সের ২ হাজার হর্সপাওয়ার রিগ কেনার প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভায় ‘মানিকগঞ্জ-১’ কূপের প্রস্তুতি ও নতুন রিগের ব্যবহার নিয়ে আলোচনা হয়।
সভা-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, নতুন রিগ সরবরাহের পর মানিকগঞ্জ-১ কূপ খনন প্রকল্পে সেটির কমিশনিং ও পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। কূপ খননের জন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরির কাজ চলছে। নির্ধারিত সময়ে রিগের কমিশনিং ও কূপ খননের প্রস্তুতি শেষ করতে ডিপিপি প্রণয়নসহ সংশ্লিষ্ট কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাপেক্সের নতুন রিগ কেনার জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। দরপত্র মূল্যায়নের পর ক্রয় প্রস্তাব সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের জন্য প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী, রিগ সরবরাহে ১৩ মাস সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে ক্রয়প্রক্রিয়া, সরবরাহ, কমিশনিং ও কূপ খননের প্রস্তুতি নির্ধারিত সময়ে শেষ করা প্রকল্পটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহে বড় ব্যবধান
দেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে মূলত চাহিদা ও সরবরাহের দীর্ঘদিনের ব্যবধান এবং দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে। জ্বালানি খাতের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ থেকে ৪০০ কোটি ঘনফুটের মধ্যে থাকলেও সরবরাহ সাধারণত এর চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ২০২৬ সালের আগস্টে দৈনিক গ্যাস সরবরাহের গড় নেমে আসে প্রায় ২ হাজার ২৩৫ মিলিয়ন ঘনফুটে। পরে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সরবরাহ বেড়ে একপর্যায়ে ২ হাজার ৬১০ মিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছায়। সরবরাহের এই ওঠানামায় দেশীয় উৎপাদনের পাশাপাশি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি ও টার্মিনালের কার্যক্রমও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। <Cite refs={["turn304572search8","turn304572search11"]} />
দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো গেলে আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আনার সুযোগ তৈরি হয়। তবে নতুন কূপ খননের পরিকল্পনা মানেই দ্রুত গ্যাস পাওয়া নয়। অনুসন্ধান, কূপ খনন, গ্যাসের স্তর শনাক্তকরণ, চাপ ও প্রবাহ পরীক্ষা, মজুত মূল্যায়ন এবং উৎপাদন অবকাঠামো গড়ে তোলার মতো একাধিক ধাপ পেরোতে হয়। কোনো কূপে গ্যাস পাওয়া গেলেও তা বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য কি না, সেটি আলাদাভাবে নিশ্চিত করতে হয়।
নারায়ণগঞ্জের কূপে পানি, চলছে ওয়ার্কওভার
মানিকগঞ্জের আগে নারায়ণগঞ্জে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে কূপ খনন করেছে বাপেক্স। প্রাথমিকভাবে সেখানে গ্যাসের উপস্থিতির কথা বলা হলেও পরে কূপে পানি প্রবেশ করায় গ্যাস উত্তোলন সম্ভব হয়নি। বর্তমানে কূপটি পুনরায় উৎপাদনযোগ্য করার লক্ষ্যে ওয়ার্কওভার কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
বাপেক্সের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, কূপটি থেকে দৈনিক ৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার আশা করছে সংস্থাটি। এই পরিমাণ গ্যাস জাতীয় সরবরাহের তুলনায় সীমিত হলেও বর্তমান সংকটের প্রেক্ষাপটে তা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তবে এ সম্ভাবনাকে নিশ্চিত উৎপাদন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ওয়ার্কওভার শেষে কূপটির কার্যকারিতা, গ্যাসের প্রবাহ ও চাপ পরীক্ষা করে উৎপাদনযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। এরপর গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার মতো অবকাঠামো ও কারিগরি প্রস্তুতির বিষয়ও বিবেচনায় আসবে।
নারায়ণগঞ্জ ও মানিকগঞ্জ—দুটি এলাকাতেই অনুসন্ধানের সম্ভাবনা কাজে লাগানো গেলে ঢাকা ও আশপাশের অঞ্চলে গ্যাস সরবরাহে কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কিন্তু সম্ভাব্য উৎপাদনের পরিমাণ, উৎপাদন শুরুর সময় এবং সরবরাহের এলাকা সম্পর্কে এখনই নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
একই ধরনের ভূতাত্ত্বিক গঠন, নতুন অনুসন্ধান পাবনায়
বাপেক্সের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ এবং পাবনার সুজানগরের মোবারকপুর এলাকায় একই ধরনের ভূতাত্ত্বিক গঠন দেখা গেছে। এই মিল অনুসন্ধানের আগ্রহ বাড়ালেও কেবল ভূতাত্ত্বিক সাদৃশ্যের ভিত্তিতে কোনো এলাকায় বাণিজ্যিক গ্যাসের মজুত রয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া যায় না। প্রকৃত সম্ভাবনা নির্ধারণে কূপ খনন ও পরীক্ষা অপরিহার্য।
পাবনার মোবারকপুরে ২০১৪ সালে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য কূপ খননের চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ চাপ ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে তখন কাজ বন্ধ রাখতে হয়। এবার আরও গভীরে অনুসন্ধানের জন্য নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। সেখানে চীনের সিএনপিসি চুয়ানচিং ড্রিলিং ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির সঙ্গে কাজের চুক্তি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
মোবারকপুর ডিপ-১ প্রকল্পে ছয় কিলোমিটারেরও বেশি গভীরতায় কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্প এলাকায় অবকাঠামো নির্মাণ ও সাইট উন্নয়নের কাজ চলছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মূল খননকাজ ২০২৮ সালের জুনের মাঝামাঝি শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে। সফলভাবে অনুসন্ধান ও পরীক্ষা সম্পন্ন হলে পরবর্তী সময়ে বাণিজ্যিক উৎপাদনের সম্ভাবনা মূল্যায়ন করা হবে।
এই প্রকল্পে গভীর কূপ খননের জন্য বিশেষায়িত প্রযুক্তি ও দক্ষতার প্রয়োজন হবে। আগের প্রচেষ্টা প্রযুক্তিগত কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবার উন্নত সরঞ্জাম ব্যবহার করে অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে মোবারকপুরে গ্যাসের সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদ থাকলেও কূপ খনন ও পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের আগে মজুতের পরিমাণ কিংবা উৎপাদন নিশ্চিত বলে ধরে নেওয়া যাবে না।
রিগ সংকট ও প্রকল্প বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ
বাপেক্সের অনুসন্ধান কার্যক্রম বাড়ানোর ক্ষেত্রে রিগের প্রাপ্যতা গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানের বরাতে জানানো হয়, তখন বাপেক্সের পাঁচটি রিগ ছিল—বিজয়-১০, বিজয়-১১, বিজয়-১২, বিজয়-১৮ ও আইপিএস-১। অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করতে দুটি নতুন রিগ কেনার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এর মধ্যে ২ হাজার হর্সপাওয়ারের রিগ কেনার মূল্যায়ন চলছিল এবং ১ হাজার ৫০০ হর্সপাওয়ারের আরেকটি রিগের জন্য ডিপিপি তৈরির কথা জানানো হয়েছিল।
মানিকগঞ্জ-১ কূপের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নতুন রিগের সরবরাহ ও কমিশনিংয়ের সময়সূচি তাই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দরপত্র অনুযায়ী সরবরাহে ১৩ মাস লাগলে ক্রয়প্রক্রিয়া ও প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদনে বিলম্বের প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে কূপ খননের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, ভূতাত্ত্বিক মূল্যায়ন, জমি ও অবকাঠামো প্রস্তুতি এবং খনন-পরবর্তী পরীক্ষার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।
গ্যাস মিললেই কি ঢাকায় সরবরাহ বাড়বে
মানিকগঞ্জে গ্যাস পাওয়া গেলে ঢাকার কাছাকাছি হওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছু সুবিধা তৈরি হতে পারে। তবে কূপের অবস্থান রাজধানীর কাছে হওয়াই সরাসরি গ্যাস সরবরাহের নিশ্চয়তা নয়। গ্যাসের মজুত ও প্রবাহ, কূপের উৎপাদনক্ষমতা, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সঞ্চালন পাইপলাইন এবং জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার কারিগরি ব্যবস্থা—সবকিছু বিবেচনায় নিতে হবে।
বর্তমানে দেশে গ্যাসের ঘাটতি মোকাবিলায় আমদানির ওপরও নির্ভর করতে হচ্ছে। নতুন অনুসন্ধান সফল হলে দেশীয় উৎস থেকে সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে; কিন্তু একটি অনুসন্ধান কূপের সম্ভাব্য উৎপাদন দিয়ে জাতীয় চাহিদার বড় ব্যবধান মেটানো যাবে কি না, তা নির্ভর করবে প্রকৃত মজুত ও উৎপাদনের পরিমাণের ওপর।
সব মিলিয়ে মানিকগঞ্জ-১ কূপকে ঘিরে নতুন আশা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জের কূপ পুনরায় উৎপাদনযোগ্য করার চেষ্টা এবং পাবনার মোবারকপুরে গভীর অনুসন্ধান প্রকল্প দেশীয় গ্যাসের নতুন উৎস খোঁজার বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো নির্ধারিত সময়ে রিগ সংগ্রহ, প্রকল্প অনুমোদন ও কূপ খনন সম্পন্ন করা এবং ভূতাত্ত্বিক সম্ভাবনাকে পরীক্ষিত, বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসে রূপ দেওয়া।