অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক অবহেলা ও অভিভাবকহীনতার সুযোগ নেয় অপরাধচক্র
রাজনীতির উত্তাল মাঠে কোনো কর্মী নিহত হলে, নিখোঁজ হলে কিংবা বছরের পর বছর কারাগারে থাকলে দলীয় কার্যালয় ও রাজপথে শোক-প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। সভা-সমাবেশে দেওয়া হয় নানা প্রতিশ্রুতি, সংবাদমাধ্যমেও প্রকাশিত হয় সহমর্মিতার খবর। কিন্তু ক্যামেরার আলো নিভে গেলে, মাইক সরিয়ে নেওয়া হলে কী হয় সেই পরিবারগুলোর? যাঁদের আত্মত্যাগকে একসময় রাজনৈতিক সংগ্রামের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল, তাঁদের স্ত্রী-সন্তানদের খোঁজ রাখেন কতজন?
রাজনৈতিক সহিংসতায় পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি নিহত বা কারাবন্দি হলে অনেক ক্ষেত্রেই ভেঙে পড়ে পুরো পরিবারের অর্থনৈতিক ভিত্তি। আইনি লড়াই, সংসার চালানো ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন অনেকে। কেউ নামেন অন্যের বাড়িতে কাজ করতে, কেউ স্বল্প মজুরিতে যুক্ত হন পোশাক কারখানা কিংবা অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ে শিশুরা। পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়, তৈরি হয় মানসিক চাপ ও নিরাপত্তাহীনতা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জীবিকার তাগিদে কিংবা স্থানীয় প্রভাবশালীদের প্ররোচনায় তারা জড়িয়ে পড়ে অপরাধচক্রে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি সংকট কিশোর অপরাধের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে এর পেছনে দারিদ্র্য, শিক্ষার সুযোগ সংকুচিত হওয়া, পারিবারিক অস্থিরতা, সামাজিক অবহেলা এবং অপরাধচক্রের প্রভাবসহ একাধিক কারণ কাজ করে। রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মীদের পরিবারকে সহায়তা না করার সংস্কৃতি এই সংকটকে আরও গভীর করে তুলতে পারে।
বেসরকারি সংস্থা হেল্ড ফর ইউ সম্প্রতি কিশোর গ্যাং নিয়ে একটি জরিপ করেছে। সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট রুনা আক্তার রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, রাজধানীতে একটি রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মী ছিলেন সুমন। তিন বছর আগে রাজপথের সংঘর্ষে তিনি নিহত হন। তাঁর মৃত্যুর পর স্ত্রী রাবেয়া দুই সন্তানকে নিয়ে চরম সংকটে পড়েন। প্রথম কয়েক মাস দল থেকে কিছু আর্থিক সহায়তা পেলেও পরে তা বন্ধ হয়ে যায়। ঘরভাড়া দেওয়া ও সন্তানদের খাবার জোগাড় করতে রাবেয়া এখন অন্যের বাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ করেন। তাঁর ছেলে রাজন পড়াশোনা ছেড়ে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য হয়েছে।
রুনা আক্তারের ভাষ্য, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। তাঁদের জরিপে এ ধরনের আরও অনেক পরিবারের সংকট উঠে এসেছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লাসহ বিভিন্ন এলাকায় অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার কিশোরদের একটি অংশের পারিবারিক পটভূমিতে এমন আর্থিক ও সামাজিক বিপর্যয়ের চিত্র পাওয়া গেছে বলে তিনি জানান।
তবে রাজনৈতিক সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সন্তানদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা কতটা বিস্তৃত, তা নির্ধারণে আরও বিস্তারিত ও প্রতিনিধিত্বশীল গবেষণা প্রয়োজন। কারণ, কোনো শিশুর পারিবারিক পরিচয় বা আর্থিক দুরবস্থাই তার অপরাধে জড়িয়ে পড়ার নিশ্চিত প্রমাণ নয়।
সহায়তা বন্ধ হলে সংকট বাড়ে
রাজনীতির মাধ্যমে যাঁরা অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন, তাঁদের পরিবারের সংকট মোকাবিলার সামর্থ্য তুলনামূলক বেশি। কিন্তু রাজপথের কর্মী ও তৃণমূলের নেতাদের অনেকেরই সঞ্চয় সীমিত। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি নিহত বা কারাবন্দি হলে তাঁদের আয় বন্ধ হয়ে যায়। মামলার খরচ, জামিনের চেষ্টা ও সংসারের ব্যয় মেটাতে গিয়ে শেষ সম্বলটুকুও হারাতে হয় অনেককে। কোনো কোনো পরিবারকে বিক্রি করতে হয় ভিটেমাটিও।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় সামাজিক অবহেলা ও অনিশ্চয়তা। পরিবারের প্রধানকে হারানো কিংবা তাঁর বিরুদ্ধে মামলা থাকার কারণে স্ত্রী-সন্তানদের নানা ধরনের কটূক্তি ও বৈষম্যের মুখে পড়তে হয়। সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে ওঠে। পরিবারের আয় বাড়াতে স্কুল ছেড়ে কাজে নামতে হয় তাদের। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় অপরাধচক্র ও প্রভাবশালীরা সহজেই তাদের প্রলুব্ধ করতে পারে।
রাজধানীর ভাটারা থানার সোলমাইদ এলাকার গৃহবধূ সাজেদা খাতুনের জীবনেও দেখা দিয়েছে এমন সংকট। তাঁর স্বামী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে তিনি একটি হত্যা মামলাসহ আটটি মামলায় কারাগারে রয়েছেন বলে জানান সাজেদা। তিন সন্তানকে নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকেন তিনি। আর্থিক সংকটে মেয়ের স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। এক ছেলে কলেজ ছেড়ে অটোরিকশা চালাচ্ছেন, অন্য ছেলে মাদক ও কিশোর অপরাধীদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে বলে তাঁর অভিযোগ।
সাজেদা বলেন, ‘আগে দলের অনেক নেতাকর্মী আসতেন। স্বামী যখন রাজপথে বা জেলে, তখন ঘরে খাবার আছে কি না, তা জানার জন্য কোনো নেতা আসেন না। নেতাদের কাছে তিনি একজন “সংগ্রামী কর্মী”; কিন্তু আমার ও আমার সন্তানদের কাছে তিনি বেঁচে থাকার একমাত্র আশ্রয়।’
সাজেদার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে দেয় রাজনৈতিক সহমর্মিতা ও বাস্তব সহায়তার মধ্যে ব্যবধানের চিত্র। কোনো কর্মী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকাকালে দলীয় নেতাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেও তাঁর পরিবার দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পড়লে সেই সহায়তা কতটা অব্যাহত থাকে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
শিশুদের ওপর পড়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
রাজনৈতিক সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের শিশুদের দুর্দশা কেবল অর্থনৈতিক সংকটেই সীমাবদ্ধ থাকে না। তাদের পড়াশোনা ব্যাহত হয়, স্বাভাবিক সামাজিক জীবন সংকুচিত হয়ে পড়ে। কোনো কোনো শিশুকে বাবার রাজনৈতিক পরিচয় বা মামলার কারণে সহপাঠী ও প্রতিবেশীদের কটূক্তির শিকার হতে হয়। এর ফলে আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া, নিরাপত্তাহীনতা ও ক্ষোভ তৈরি হতে পারে।
অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. সাইফুল আলম বলেন, রাজনৈতিক সহিংসতার সবচেয়ে নির্মম প্রভাব পড়ে শিশুদের ওপর। যেসব পরিবারের উপার্জন বন্ধ হয়ে যায়, সেসব পরিবারের শিশুদের পড়াশোনা প্রথমেই ব্যাহত হয়। অনেককে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করতে হয়, কেউ কেউ বাধ্য হয়ে শিশুশ্রমে যুক্ত হয়। তিনি বলেন, সামাজিক অবহেলা ও মানসিক নির্যাতন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা পাড়া-মহল্লায় ‘রাজনৈতিক অপরাধীর সন্তান’ বা ‘সন্ত্রাসীর বাচ্চা’ বলে কটূক্তি শুনতে হলে শিশুর মধ্যে হীনম্মন্যতা ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হতে পারে। পারিবারিক বিপর্যয়, মানসিক আঘাত ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা একসঙ্গে কাজ করলে কোনো কোনো শিশু বিষণ্নতা, ক্ষোভ কিংবা অপরাধপ্রবণতার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, রাজনৈতিক কর্মীদের পরিবারের দায়িত্ব নিতে ব্যর্থ হওয়া দলগুলোর জন্য যেমন নৈতিক সংকট, তেমনি এটি সামাজিক কাঠামোরও দুর্বলতা প্রকাশ করে। রাজনৈতিক সহিংসতায় অভিভাবক হারানো শিশুদের কাছে পরিবারের সদস্যের আত্মত্যাগের স্বীকৃতি না থাকা এবং দীর্ঘদিন অবহেলিত থাকার অভিজ্ঞতা সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি ক্ষোভ তৈরি করতে পারে। সময়মতো সহায়তা না পেলে সেই ক্ষোভ ভবিষ্যতে সামাজিক বৈষম্য ও অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক ডা. রেজাউল হাসান বলেন, ছোটবেলা থেকে বাবার ওপর রাজনৈতিক নিপীড়ন দেখা কিংবা হঠাৎ তাঁকে হারানোর অভিজ্ঞতা শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপের কারণ হতে পারে। কিছু শিশুর ক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞতার পরবর্তী প্রভাব হিসেবে মানসিক আঘাত-পরবর্তী চাপজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে পরিবারের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সহায়তা প্রয়োজন।
তাঁর মতে, কোনো রাজনৈতিক কর্মী নিহত, নিখোঁজ বা দীর্ঘ সময় কারাবন্দি হলে তাঁর পরিবারের আইনি, অর্থনৈতিক ও মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। রাজনৈতিক দলগুলোকে শুধু কর্মসূচি ও বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন এবং সন্তানদের শিক্ষা অব্যাহত রাখার জন্য নির্দিষ্ট কল্যাণ তহবিল গঠন করা উচিত।
শূন্যতার সুযোগ নেয় অপরাধচক্র
রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সন্তানদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক ও অপরাধ বিশ্লেষক তৌহিদুল হক বলেন, কোনো পরিবার অভিভাবকহীন বা অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়লে কিশোরদের মধ্যে টিকে থাকার চাপ বাড়ে। তখন আর্থিক সহায়তা, নিরাপত্তা কিংবা সামাজিক স্বীকৃতির আশায় তারা অপরাধচক্রের কাছাকাছি চলে যেতে পারে।
তাঁর মতে, স্থানীয় প্রভাবশালীরা এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে কিশোরদের দখলদারি, চাঁদাবাজি কিংবা অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করতে পারে। রাজনৈতিক পরিচিতি বা স্থানীয় ‘বড় ভাইদের’ আশ্রয় তখন কোনো কোনো কিশোরের কাছে নিরাপত্তা ও জীবিকার বিকল্প বলে মনে হতে পারে। তৌহিদুল হক বলেন, মোহাম্মদপুর, মিরপুর ও কুমিল্লাসহ বিভিন্ন এলাকায় কিশোর অপরাধের ঘটনা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কিশোরদের পারিবারিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পটভূমি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। অভিভাবকের অনুপস্থিতি ও আর্থিক সংকটের পাশাপাশি অপরাধচক্রের প্রভাব কীভাবে কাজ করছে, তা বুঝতে হবে। তবে রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার থেকে আসা কিশোরদের সবাই অপরাধে জড়িত—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রবীণ রাজনীতিবিদ বলেন, রাজনৈতিক মাঠে জয়-পরাজয়ের হিসাব কষতে গিয়ে নেতারা অনেক সময় নতুন কৌশল ও কর্মসূচিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু যেসব পরিবারের সদস্যরা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থেকে প্রাণ হারিয়েছেন বা দীর্ঘদিন কারাবন্দি রয়েছেন, তাঁদের স্ত্রী-সন্তানদের জীবনসংগ্রাম আড়ালেই থেকে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সামাজিক ও মানসিকভাবে পুনর্বাসিত করা না হলে তাদের ক্ষোভ ও হতাশা আরও বাড়তে পারে।
রাজনীতির কর্মীদের ত্যাগের কথা বলা সহজ, কিন্তু সেই ত্যাগের মূল্য দিতে গিয়ে তাঁদের পরিবার কীভাবে বেঁচে আছে, তার দায়িত্ব নেওয়া কঠিন। রাজনৈতিক সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সহায়তা, আইনি সহযোগিতা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিত করা গেলে সংকটের তীব্রতা কমানো সম্ভব। পাশাপাশি কিশোরদের জন্য নিরাপদ সামাজিক পরিসর, খেলাধুলা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে।
রাজনৈতিক দলগুলো যদি কর্মীদের শুধু আন্দোলন-সংগ্রামের সময় মনে রাখে, আর বিপর্যয়ের পর তাঁদের পরিবারকে ভুলে যায়, তবে সেই অবহেলার মূল্য দিতে হতে পারে পরবর্তী প্রজন্মকে। রাজনীতির ক্ষত যেন শিশু-কিশোরদের ভবিষ্যৎ কেড়ে না নেয়, সে দায়িত্ব শুধু দলগুলোর নয়—রাষ্ট্র, সমাজ ও সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের।