নেত্রকোনার মদনে ১২ বছর বয়সী এক কওমি মাদরাসাছাত্রীকে ধর্ষণ ও গর্ভবতী করার অভিযোগে করা মামলায় অভিযুক্ত শিক্ষক আমান উল্লাহ মাহমুদী সাগরের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ। অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদনে ওই শিশুর জন্ম দেওয়া নবজাতকের সঙ্গে আমান উল্লাহর ডিএনএর ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ মিল পাওয়া গেছে।
রাষ্ট্রপক্ষ জানিয়েছে, ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন হাতে আসায় মামলাটির তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে। শিগগিরই আদালতে এ মামলার চূড়ান্ত অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হবে।
মামলার রাষ্ট্রপক্ষের সরকারি কৌঁসুলি মো. নুরুল কবীর রুবেল বলেন, ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল মামলায় গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রমাণ হিসেবে যুক্ত হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, এখন মামলাটি বিচারিক কার্যক্রমে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত। দ্রুততম সময়ের মধ্যে পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করবে।
মামলার নথি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে মদন উপজেলার কাইটাইল ইউনিয়নের পাঁচহার বড়বাড়ি গ্রামের একটি মহিলা কওমি মাদরাসায় ঘটনাটি ঘটে। ওই মাদরাসার পরিচালক ও শিক্ষক ছিলেন আমান উল্লাহ সাগর। অভিযোগ, তিনি ওই শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ করেন।
ঘটনার পর প্রাণনাশের হুমকির কারণে শিশুটি প্রথমে বিষয়টি কাউকে জানায়নি। পরে তার শারীরিক পরিবর্তন দেখা দিলে পরিবারের সদস্যদের সন্দেহ হয়। চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হলে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তার অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়। এরপর গত ২৩ এপ্রিল শিশুটির মা বাদী হয়ে মদন থানায় মামলা করেন। ঘটনাটি প্রকাশ্যে এলে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। র্যাব-১৪ এ ঘটনায় ছায়াতদন্ত শুরু করে।
তদন্তের একপর্যায়ে গত ৬ মে ময়মনসিংহের গৌরীপুর থেকে অভিযুক্ত শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগরকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। পরে তাকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে তিন দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
মামলার তদন্তে ডিএনএ পরীক্ষাকে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আদালতের অনুমতি নিয়ে গত ১৭ মে ঢাকার সিআইডি কার্যালয়ে আমান উল্লাহ সাগরের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরবর্তী সময়ে ভুক্তভোগী শিশুর সন্তান জন্ম দেওয়ার পর নবজাতকের নমুনাও সংগ্রহ করা হয়।
গত ২ জুলাই সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেয় ওই শিশু। বর্তমানে মা ও নবজাতককে সিলেটের একটি সেফহোমে রাখা হয়েছে।
আদালতের নির্দেশে গত ২৮ জুলাই সিআইডির একটি দল সেফহোমে গিয়ে নবজাতকের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে। পরে সেটি পরীক্ষার জন্য ল্যাবে পাঠানো হয়। সম্প্রতি সেই পরীক্ষার প্রতিবেদন সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছায়। প্রতিবেদনে অভিযুক্ত শিক্ষক ও নবজাতকের ডিএনএর মধ্যে ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ মিল পাওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
ডিএনএ পরীক্ষার এই ফল মামলার তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কারণ, পিতৃত্ব নির্ধারণে ডিএনএ প্রোফাইলিং একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। আদালতে এ ধরনের প্রতিবেদন অন্যান্য সাক্ষ্য ও আলামতের সঙ্গে মামলার প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি মো. নুরুল কবীর রুবেল বলেন, ডিএনএ প্রতিবেদনসহ মামলার প্রয়োজনীয় তদন্ত-উপকরণ এখন পুলিশের হাতে রয়েছে। তাই অভিযোগপত্র দাখিলের প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে ভুক্তভোগী শিশু ও তার পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। সংগঠনটির একটি প্রতিনিধি দল ঘটনাস্থল ও থানায় গিয়ে পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছে এবং মামলার আইনগত প্রক্রিয়া সম্পর্কে খোঁজ নিয়েছে।
মামলার শুরু থেকে ভুক্তভোগী শিশুর নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বর্তমানে তাকে ও তার নবজাতককে সেফহোমে রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করে অভিযোগপত্র দাখিল এবং বিচারিক প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়া জরুরি।
ডিএনএ প্রতিবেদনে অভিযুক্ত শিক্ষক ও নবজাতকের মধ্যে ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ মিল পাওয়ার পর এখন মামলাটির পরবর্তী ধাপ হচ্ছে চূড়ান্ত অভিযোগপত্র দাখিল। এরপর আদালতে সাক্ষ্য, আলামত ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে মামলার বিচার কার্যক্রম এগোবে।