দুই কোটি টাকার নিচে নড়ব না’ এবং ‘পাঁচ কোটি টাকা থেকে আমাকে দুই কোটি টাকা দেন, আমি সব সই করে দেব’—এমন কথোপকথনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর লক্ষ্মীপুর বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল আমিনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। বিপিডিবির তদন্ত ও শৃঙ্খলা পরিদপ্তরের উপপরিচালক-১ মো. কাউসার আহমেদ অপু স্বাক্ষরিত চিঠিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়, নুরুল আমিনের বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেনসংক্রান্ত কথোপকথনের একটি ভিডিও গণমাধ্যমে প্রচারিত হওয়ায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (কর্মচারী) চাকরি বিধিমালা, ১৯৮২-এর ১৪১(১) বিধির অধীনে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
চিঠি অনুযায়ী, সাময়িক বরখাস্তের সময়ে নুরুল আমিন বিধিমালার ১৪১(২) অনুযায়ী খোরপোষ ভাতা পাবেন। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তার পূর্বানুমতি ছাড়া তিনি কর্মস্থল ত্যাগ করতে পারবেন না। এটি চূড়ান্ত শাস্তি নয়; অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত ও পরবর্তী প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা।
এর আগে রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) রাতে প্রায় ৮ মিনিট ৫০ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটির বিভিন্ন অংশে নুরুল আমিনের কণ্ঠসদৃশ একজনকে ঠিকাদারি কাজ, প্রকল্পের মালামাল, বিল অনুমোদন এবং অর্থ লেনদেন নিয়ে কথা বলতে শোনা যায়। ভিডিওটির কণ্ঠ ও দৃশ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় এবং পুরো ঘটনার প্রেক্ষাপট স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। ভিডিওটি সম্পাদিত কি না, কথোপকথনের সম্পূর্ণ অংশ কী এবং সেখানে উল্লেখ করা অর্থের সঙ্গে বাস্তব কোনো লেনদেনের সম্পর্ক রয়েছে কি না—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
ভিডিওর একটি অংশে নুরুল আমিনকে বলতে শোনা যায়, ‘এসি স্যার রাজি হয়ে গেছে কোনো একটা কারণে, আমি দুই কোটি টাকা থেকে নড়ব না।’ পরে তাঁকে আরও বলতে শোনা যায়, ‘একটা বিলের জন্য যদি ২ কোটি টাকা নিই, তাহলে চেয়ারম্যান কি আমার বিরুদ্ধে যাবে? আমাকে জায়গামতো পোস্টিং দেবে।’ এরপর একটি কাজের ব্যয় ও প্রকল্পের মালামাল নিয়ে কথা বলতে গিয়ে পাঁচ কোটি টাকার মালামাল আত্মসাতের অভিযোগের কথাও বলতে শোনা যায়। তাঁর বক্তব্যের প্রেক্ষাপট ও দাবিগুলোর সত্যতা এখনো তদন্তে যাচাই হয়নি।
ভিডিওতে কয়েকজন ব্যক্তির কাছ থেকে নুরুল আমিনকে টাকা গ্রহণ করতেও দেখা যায় বলে বিভিন্ন গণমাধ্যম জানিয়েছে। তবে ওই ব্যক্তিদের মুখ স্পষ্ট নয় এবং তাঁদের পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি। ভিডিওর একটি অংশে একজনকে টাকার পরিমাণ বলতে শোনা যায়। এর পর নুরুল আমিনের কণ্ঠসদৃশ ব্যক্তিকে অর্থের পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন করতে শোনা যায়। তবে ওই অর্থ কী উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছিল এবং সেটি ঘুষের টাকা কি না, তা ভিডিও থেকেই নিশ্চিত করা যায় না।
এ ঘটনায় সোমবার দুপুরে তদন্ত কমিটি গঠনের কথাও জানায় পিডিবি। কমিটির প্রধান করা হয়েছে পিডিবির ময়মনসিংহ অঞ্চলের পরিচালন ও সংরক্ষণ সার্কেল-১-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এস এম ইকবালকে। পিডিবির কুমিল্লা বিতরণ অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) শেখ ফিরোজ কবির তদন্ত কমিটি গঠন ও সাময়িক বরখাস্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর নুরুল আমিনের বক্তব্য জানতে তাঁর দাপ্তরিক মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। সাংবাদিকেরা তাঁর কার্যালয়ে গিয়েও তাঁকে পাননি। ফলে ভিডিওতে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তাঁর সরাসরি বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে লক্ষ্মীপুর পিডিবির কয়েকজন ঠিকাদার ও কর্মকর্তার বরাতে বিভিন্ন গণমাধ্যমে বলা হয়েছে, ভিডিওটি প্রায় দুই বছর আগে পিডিবির লক্ষ্মীপুর কার্যালয়ের ডরমেটরিতে ধারণ করা হয়ে থাকতে পারে। কয়েকজন ঠিকাদার সম্প্রতি ভিডিওটি সংযুক্ত করে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ করেছেন বলেও দাবি করা হয়েছে। ঠিকাদারি কাজ ও বিলসংক্রান্ত বিষয়কে কেন্দ্র করে অর্থ আদায়ের অভিযোগও উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা এখনো নিশ্চিত হয়নি।
এর আগে নুরুল আমিনের বিরুদ্ধে পিডিবির সেবা ও কার্যক্রম নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগ ওঠার খবরও প্রকাশিত হয়েছিল। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে লক্ষ্মীপুর প্রেসক্লাবের সামনে একদল গ্রাহক বিক্ষোভ করে তাঁর অপসারণ দাবি করেছিলেন বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তবে ওই অভিযোগগুলোর সঙ্গে সাম্প্রতিক ভিডিওর কথিত অর্থ লেনদেনের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
পিডিবির পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত ভিডিওতে দেখানো অর্থ লেনদেনকে ঘুষ হিসেবে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করার কোনো তদন্ত-ফল প্রকাশ করা হয়নি। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং ঠিকাদারদের অভিযোগ—সবকিছুর সত্যতা যাচাই করাই তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে।
সাময়িক বরখাস্ত ও তদন্ত কমিটি গঠনের ফলে এখন অভিযোগগুলোর প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়েছে। তদন্তে ভিডিওটির উৎস, সময় ও স্থান, কথোপকথনের প্রেক্ষাপট, অর্থ লেনদেনের প্রকৃতি এবং ঠিকাদারি বিল বা প্রকল্প অনুমোদনের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক ছিল কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকবে।