রাজধানীতে জমি ও সম্পত্তির দখলকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক একাধিক হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় পুরোনো অপরাধচক্রের তৎপরতা নিয়ে নতুন করে নজরদারি শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ইসিবি চত্বরের নিউ গিনি প্রপার্টিজ, মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার এবং মোহাম্মদপুরসহ কয়েকটি এলাকায় সংঘটিত ঘটনায় জমি-বিরোধের পাশাপাশি অপরাধীচক্রের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সামনে এসেছে। এরই মধ্যে রাজধানীর শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকা হালনাগাদ করার কথা জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। একই সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের যৌথ অভিযান চালানোর বিষয়টি সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
২০০২ সালের ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এর আদলে কোনো অভিযান পরিচালনা করা যায় কি না, তা নিয়েও প্রাথমিকভাবে আলোচনা হচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে এ ধরনের কোনো অভিযানের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রয়োজন হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত অভিযান আরও জোরদার করা হতে পারে।
শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকা হালনাগাদের বিষয়টি অবশ্য নতুন কোনো উদ্যোগ নয়। চলতি বছরের ২ মে ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার জানিয়েছিলেন, রাজধানীতে অপরাধ দমনে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকা নিয়মিত হালনাগাদ করা হচ্ছে। তিনি বলেছিলেন, আগের মতো বড় শীর্ষ সন্ত্রাসী না থাকলেও তাদের সহযোগী এবং নতুনভাবে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে—এমন ব্যক্তিদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
এর আগে ২০০১ সালের ২৬ ডিসেম্বর তৎকালীন সরকার ২৩ জনকে ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। পরে ২০১০ সালের ১৬ মার্চ জাতীয় সংসদে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন ৪২ জন শীর্ষ সন্ত্রাসীর আরেকটি তালিকা প্রকাশ করেন। এরপর নতুন করে কোনো আনুষ্ঠানিক জাতীয় তালিকা প্রকাশের তথ্য না থাকলেও বিভিন্ন সময়ে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান চালানো হয়েছে।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে নতুন করে তালিকা হালনাগাদের প্রয়োজনীয়তা কেন দেখা দিয়েছে—সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, অপরাধের ধরন বদলেছে। একসময় সরাসরি অস্ত্রবাজি ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে যে প্রভাব বিস্তার করা হতো, এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জমি দখল, স্থানীয় আধিপত্য, সংঘবদ্ধ হামলা এবং রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহারের অভিযোগ। ফলে শুধু পুরোনো তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের খোঁজ নয়, তাদের সহযোগী, যোগাযোগের নেটওয়ার্ক ও নতুন করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে এমন ব্যক্তিদেরও নজরদারিতে রাখা হচ্ছে।
তবে কোনো ব্যক্তিকে ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে অভিযোগ, মামলা, গোয়েন্দা তথ্য ও অপরাধের ধরন আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি। ২০০১ বা ২০১০ সালের তালিকায় থাকা মানেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বর্তমানে সক্রিয়—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। একইভাবে কোনো পুরোনো সন্ত্রাসীর নাম কোনো নতুন ঘটনায় উঠে এলেই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমনটিও বলা যায় না।
সাম্প্রতিক নিউ গিনি প্রপার্টিজের ঘটনাটি এ আলোচনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে ইসিবি চত্বরের দক্ষিণ মানিকদীতে ওই আবাসন প্রকল্পে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। সেখানে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ‘ব্রাউনফিশ’ স্টুডিওও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পুলিশ প্রাথমিক তদন্তে জানিয়েছে, নিউ গিনি প্রপার্টিজের সঙ্গে পাশের জমির মালিকের দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরেই হামলা হয়ে থাকতে পারে এবং চাঁদাবাজির কোনো তথ্য তারা পায়নি।
ঘটনায় নিউ গিনি প্রপার্টিজের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছে এবং একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ২৭ সেপ্টেম্বর তিন আসামিকে আদালতে হাজির করে কারাগারে পাঠানো হয়; পরে আরও গ্রেপ্তারের তথ্য এসেছে।
এই ঘটনায় বিভিন্ন মহল থেকে রাজনৈতিক পরিচয় ও অপরাধীচক্রের সংশ্লিষ্টতার নানা অভিযোগ উঠলেও পুলিশ এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে জমি-বিরোধকেই প্রাথমিক কারণ হিসেবে সামনে রেখেছে। ফলে কোনো শীর্ষ সন্ত্রাসী বা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠী এই হামলার নেপথ্যে ছিল—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে তদন্তের ফল পাওয়া প্রয়োজন।
মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাও একই সময়ে রাজধানীর নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সেখানে ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে হামলার পর পুলিশ একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে। ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের সংখ্যা নয়জনে পৌঁছেছে।
রাড্ডা ঘটনায় পুলিশের দায়িত্ব পালনে গাফিলতির অভিযোগও তদন্তের আওতায় এসেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, শাহ আলী থানার ওসির দায়িত্ব পালনে অবহেলা ছিল এবং তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মিরপুর ও ইসিবি চত্বরের দুটি ঘটনা একই ধরনের কি না, অথবা এর পেছনে অভিন্ন কোনো অপরাধী নেটওয়ার্ক রয়েছে কি না—এ বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো সরকারি বক্তব্য নেই। তবে অল্প সময়ের ব্যবধানে জমি ও সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধে সংঘবদ্ধ হামলার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর বেড়েছে।
মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান, ঢাকা উদ্যান, নবীনগর হাউজিং ও আশপাশের এলাকাতেও জমি দখল, চাঁদাবাজি এবং স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে অপরাধচক্রের তৎপরতার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এসব এলাকায় পুরোনো অপরাধীদের সহযোগী কিংবা নতুন প্রভাবশালী গোষ্ঠী সক্রিয় হয়েছে কি না, তা নিয়েও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, অপরাধীচক্রের সক্ষমতা নির্ধারণে শুধু একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে থাকা মামলা নয়; তার নিয়ন্ত্রিত লোকবল, অস্ত্রের উৎস, অর্থের প্রবাহ, যোগাযোগের নেটওয়ার্ক, বিভিন্ন এলাকায় প্রভাব এবং বিদেশে অবস্থান করেও অপরাধ পরিচালনার সক্ষমতা বিবেচনায় নেওয়া হয়। এ কারণে তালিকা হালনাগাদের ক্ষেত্রে অপরাধের ‘ম্যাপিং’ বা এলাকা ও নেটওয়ার্কভিত্তিক বিশ্লেষণও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
২০০১ সালের তালিকা প্রকাশের সময় ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, অস্ত্রবাজি ও আধিপত্য বিস্তার ছিল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বড় উদ্বেগ। পরে তালিকাভুক্ত অনেক ব্যক্তি গ্রেপ্তার, নিহত বা আত্মগোপনে যান। আবার কেউ কেউ দেশের বাইরে অবস্থান করেন। ফলে পুরোনো তালিকাকে বর্তমান পরিস্থিতির সরাসরি প্রতিচ্ছবি হিসেবে ব্যবহার না করে নতুন তথ্যের ভিত্তিতে হালনাগাদ করার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে।
এ বছরের মে মাসে ডিএমপি কমিশনারও বলেছিলেন, বর্তমানে আগের মতো বড় ধরনের শীর্ষ সন্ত্রাসী না থাকলেও তাদের সহযোগী এবং নতুন করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা ব্যক্তিদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কেউ মাথাচাড়া দেওয়ার আগেই ব্যবস্থা নেওয়ার লক্ষ্যেই তালিকা হালনাগাদ করা হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনায় গ্রেপ্তার করে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অপরাধের নেপথ্যের নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা জরুরি। কে অর্থ দিচ্ছে, কারা অস্ত্র সরবরাহ করছে, কারা মাঠে লোকবল জড়ো করছে এবং কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে কি না—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আনার কথা ভাবা হচ্ছে।
এ কারণে বড় ধরনের যৌথ অভিযান চালানোর প্রস্তাব নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। ২০০২ সালের ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এর আদলে অভিযান পরিচালনার ধারণাটিও সেই আলোচনার অংশ। তবে বর্তমান সময়ে এমন কোনো অভিযান হলে তার আইনি কাঠামো, নেতৃত্ব, লক্ষ্য, জবাবদিহি এবং বাহিনীগুলোর দায়িত্ব কী হবে—এসব বিষয়ে সরকারের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্য, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার কাজ চলছে। তদন্তে যাদের নাম ও সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি পোশাকধারী পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে।
তবে এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক পরিচয় ও অপরাধের অভিযোগকে এক করে দেখার ঝুঁকিও রয়েছে। কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী বা সমর্থকের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ উঠলে তদন্তের ভিত্তিতে ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণ করা প্রয়োজন; একইভাবে কোনো পুরোনো সন্ত্রাসীর নাম উঠে এলেই তাকে নতুন কোনো ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করার আগে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ দরকার।
রাজধানীর সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাই সরকারের সামনে দুটি সমান্তরাল চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে—একদিকে জমি ও সম্পত্তিকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ সহিংসতা ঠেকানো, অন্যদিকে এসব ঘটনার নেপথ্যে থাকা অপরাধী নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকা হালনাগাদ, গোয়েন্দা নজরদারি এবং প্রয়োজনীয় যৌথ অভিযান—এই তিনটি উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়, তা নির্ভর করবে তদন্তের মান, আইনি প্রক্রিয়া এবং অপরাধের নেপথ্যের নেটওয়ার্ক পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কতটা পৌঁছাতে পারে তার ওপর।