তিস্তার ভাঙনে বসতভিটা ও ফসলি জমি হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের জয়রামওঝা চল্লিশসাল চরের বাসিন্দারা। এক সপ্তাহের ব্যবধানে ওই এলাকায় ১৮টি পরিবারের ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের কবলে পড়েছে উঠতি আমন ধানসহ অন্তত ৫০ একর ফসলি জমি। সর্বস্ব হারানোর আশঙ্কায় অনেক কৃষক পাকা হওয়ার আগেই ধান কেটে গবাদিপশুকে খাওয়াতে বাধ্য হচ্ছেন। অথচ ভাঙন ঠেকাতে এখনো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
বর্ষা শেষে হেমন্তের আগমনে মাঠে মাঠে আমন ধান পাকতে শুরু করেছে। কৃষকের ঘরে নতুন ধান ওঠার কথা এই সময়ে। কিন্তু তিস্তার তীরবর্তী চল্লিশসাল চরের কৃষকদের জন্য সেই প্রত্যাশা এখন দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নদীর স্রোতে একদিকে হারিয়ে যাচ্ছে বসতভিটা, অন্যদিকে চোখের সামনে তলিয়ে যাচ্ছে বছরের পরিশ্রমে ফলানো ফসল।
সরেজমিনে দেখা যায়, তীব্র স্রোতে তিস্তার পাড় ভেঙে নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে। ভাঙনের মুখে থাকা পরিবারগুলোর কেউ ঘরবাড়ি খুলে অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন, কেউ শেষ মুহূর্তে বসতভিটা রক্ষার চেষ্টা করছেন। কোথাও ইতিমধ্যে বিলীন হয়েছে বাড়িঘর, কোথাও নদীর কিনারায় দাঁড়িয়ে রয়েছে বসতভিটা। একই সঙ্গে ভাঙনের কবলে পড়ছে আবাদি জমি। ফসল রক্ষার উপায় না পেয়ে কোনো কোনো কৃষক কাঁচা আমন ধান কেটে নিচ্ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, সম্প্রতি তিস্তার পানি বাড়ার পর নদীতে স্রোতের তীব্রতা বেড়ে যায়। পরে পানি কমতে শুরু করলে স্রোতের গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে জয়রামওঝা চল্লিশসাল চরের দিকে ধাবিত হয়। এরপর থেকেই ওই এলাকায় ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করে।
গত এক সপ্তাহে ভাঙনের শিকার ১৮টি পরিবারের সদস্যরা হলেন বাবর আলী, গোলাপী বানু, গোলজার হোসেন, নুর ইসলাম, মতিয়ার রহমান, আহাদ আলী, জহুরা বেগম, আসাদুল ইসলাম, আব্দুল হক, মইনুল ইসলাম, শাহ আলম, নজু মিয়া, মোন্নাফ আলী, আবুল হোসেন, শফিকুল ইসলাম, দুলু মিয়া, নুরল ইসলাম ও নাজমুল হক। ভাঙনের আশঙ্কায় তাঁদের অনেকে আগেভাগেই ঘরবাড়ি অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু বসতভিটা ও জমি হারানোর ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার সামর্থ্য তাঁদের অনেকেরই নেই।
ভাঙনের শিকার জাহেদুল ইসলাম বলেন, কয়েক বছর ধরে জয়রামওঝা চল্লিশসাল চরে বসবাস করে চাষাবাদের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছেন তাঁরা। এবারের মূল বন্যায় তেমন ক্ষতি হয়নি। কিন্তু হঠাৎ তিস্তার স্রোতের গতিপথ চরের দিকে পরিবর্তিত হওয়ায় ভাঙন ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। এতে বসতভিটার পাশাপাশি ফসলি জমিও হারাচ্ছেন তাঁরা।
কৃষকদের কাছে আমন ধান শুধু একটি ফসল নয়; সারা বছরের খাদ্য ও সংসারের ব্যয় মেটানোর অন্যতম অবলম্বন। সেই ফসল নদীগর্ভে চলে যাওয়ায় পরিবারগুলো আর্থিক সংকটে পড়ার আশঙ্কা করছেন। ধান পরিপক্ব হওয়ার আগেই কেটে নিতে বাধ্য হওয়ায় ফলন ও সম্ভাব্য আয়—দুই দিক থেকেই ক্ষতির মুখে পড়ছেন তাঁরা। গবাদিপশুকে কাঁচা ধান খাওয়ানোর ঘটনা সেই সংকটেরই চিত্র তুলে ধরছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একের পর এক ঘরবাড়ি ও আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হলেও ভাঙনরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাঁদের দাবি, ভাঙনপ্রবণ অংশে দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আরও পরিবার বসতভিটা হারাবে এবং ফসলি জমির ক্ষতি বাড়বে।
লক্ষ্মীটারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল হাদী বলেন, কয়েক দিন ধরে চল্লিশসাল এলাকায় ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি পরিবারের বাড়িঘর ও আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। তাঁরা ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেসমিন আক্তার বলেন, তিস্তার ভাঙনে বেশ কিছু পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাঁদের সহায়তা দেওয়া হবে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী হাফিজুল হক বলেন, বন্যার পর হঠাৎ ওই এলাকায় ভাঙন শুরু হয়েছে। তিনি ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন এবং বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন। পরিস্থিতি বিবেচনা করে ভাঙনরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
তবে কখন এবং কী ধরনের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট সময়সীমা জানানো হয়নি। ফলে একদিকে বসতভিটা হারানোর শঙ্কা, অন্যদিকে আমন ফসল রক্ষার অনিশ্চয়তা নিয়ে দিন কাটছে চল্লিশসাল চরের বাসিন্দাদের। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে নদীভাঙনে তাঁদের ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়তে পারে।