চীনের অর্থনৈতিক সংস্কারের রূপকার ঝু রংজি আর নেই

আজাদ ডেস্ক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:

বাজারমুখী অর্থনীতির পথে চীনের যাত্রায় নেতৃত্ব দেওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যু

চীনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঝু রংজি মারা গেছেন। বুধবার বেইজিংয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯৭ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয় বলে দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে। অর্থনৈতিক সংস্কার, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন এবং চীনকে বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থার সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য তিনি দেশটির আধুনিক অর্থনৈতিক ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত চীনের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন ঝু রংজি। এর আগে ১৯৯১ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত তিনি উপপ্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর নেতৃত্বের সময়েই চীন রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি থেকে আরও বাজারমুখী ব্যবস্থার দিকে দ্রুত এগিয়ে যায়।

অর্থনীতির কঠিন সময়ে দায়িত্ব

১৯৯০-এর দশকের শুরুতে চীনের অর্থনীতি দ্রুত বাড়ছিল। তবে একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকঋণের ঝুঁকি, স্থানীয় সরকারের আর্থিক চাপ এবং লোকসানে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সমস্যা বড় হয়ে উঠেছিল। ঝু রংজি এসব সংকট মোকাবিলায় কঠোর আর্থিক নীতি এবং ব্যাপক কাঠামোগত সংস্কারের উদ্যোগ নেন।

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন ছিল তাঁর সংস্কার কর্মসূচির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অদক্ষ ও লোকসানি প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা বেসরকারি খাতে দেওয়ার ফলে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক চাকরি হারান। তবে এর মাধ্যমে চীনের অর্থনীতিতে দক্ষতা ও প্রতিযোগিতা বাড়ানোর পথ তৈরি হয়। একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা ও শ্রমিক পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

করব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। রেকর্ড মূল্যস্ফীতির পর চীনা সরকার তাঁর সময়েই অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার কঠোর পদক্ষেপ নেয়।

বিশ্ব বাণিজ্যে চীনের বড় দরজা

ঝু রংজির রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জনগুলোর একটি ছিল বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) চীনের প্রবেশের পথ তৈরি করা।

চীনকে বিশ্ব বাণিজ্যব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করতে প্রায় ১৫ বছর ধরে আলোচনা চলেছিল। ঝু সেই দীর্ঘ আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। শেষ পর্যন্ত ২০০১ সালে চীন ডব্লিউটিওর সদস্য হয়। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগে চীনের অংশগ্রহণ দ্রুত বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়।

তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে তখন চীনের ভেতরেও বিতর্ক ছিল। সমালোচকদের কেউ কেউ মনে করেছিলেন, ডব্লিউটিওতে প্রবেশের জন্য চীনকে অতিরিক্ত ছাড় দিতে হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে চীনের বৈশ্বিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে এই সিদ্ধান্তকে দেখা হয়।

‘ইকোনমিক জার’ হিসেবে পরিচিতি

কঠোর সংস্কার নীতি ও অর্থনৈতিক বিষয়ে সরাসরি অবস্থানের কারণে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ঝু রংজি প্রায়ই ‘ইকোনমিক জার’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

তাঁর বক্তৃতার ধরনও ছিল অন্য অনেক চীনা নেতার তুলনায় ব্যতিক্রমী। দুর্নীতি, ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম, স্থানীয় সরকারের ঋণ ও অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা নিয়ে তিনি প্রকাশ্যেই কঠোর ভাষায় কথা বলতেন। তাঁর বক্তব্যের সংকলন প্রকাশের পরও চীনে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছিল।

১৯৯৮ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এক সংবাদ সম্মেলনে ঝু বলেছিলেন, সামনে যত কঠিন পরিস্থিতিই থাকুক, তিনি পিছিয়ে যাবেন না। তাঁর সেই দৃঢ় বক্তব্য পরবর্তী সময়ে তাঁর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের প্রতীক হয়ে ওঠে।

সংস্কারের মূল্যও দিতে হয়েছে

ঝু রংজির সংস্কারগুলো সবক্ষেত্রে সমালোচনামুক্ত ছিল না। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ চাকরি হারান। অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনের সামাজিক মূল্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল।

কিছু নীতিগত সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও পরে বিতর্ক হয়েছে। তবে তাঁর সময়ের সংস্কারগুলো চীনের অর্থনীতিকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে দেশটির সংযোগ গভীর করতে বড় ভূমিকা রাখে।

সাংহাই থেকে বেইজিং

১৯২৮ সালে হুনান প্রদেশের রাজধানী চাংশায় জন্ম ঝু রংজির। তিনি বেইজিংয়ের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে তড়িৎ প্রকৌশল নিয়ে পড়াশোনা করেন। চীনের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় তাঁর কর্মজীবনও বাধাগ্রস্ত হয়। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় তিনি রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। পরে রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত হয়ে আবারও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ফেরেন।

১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে সাংহাইয়ের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা নজরে আসে। সাংহাইকে অর্থনৈতিকভাবে আরও গতিশীল করার উদ্যোগে তাঁর ভূমিকা চীনের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা দেং শিয়াওপিংয়ের নজর কাড়ে। এরপর ১৯৯১ সালে তিনি উপপ্রধানমন্ত্রী হিসেবে কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্বে আসেন।

১৯৯৮ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তাঁর সামনে ছিল অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখা এবং একই সঙ্গে বড় ধরনের সংস্কার বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ। পাঁচ বছরের দায়িত্বকালে তিনি সেই সংস্কার কর্মসূচি এগিয়ে নেন।

একটি যুগের অবসান

২০০৩ সালে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে অবসর নেন ঝু রংজি। কিন্তু চীনের অর্থনীতিতে তাঁর সময়ের সংস্কারের প্রভাব বহু বছর ধরে অব্যাহত থাকে। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন, কর ও আর্থিক ব্যবস্থার সংস্কার এবং ডব্লিউটিওতে চীনের প্রবেশ—এসব পদক্ষেপ দেশটিকে পরবর্তী দুই দশকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হওয়ার পথে এগিয়ে দেয়।

চীনের সরকারি শোকবার্তায় ঝু রংজিকে অর্থনৈতিক সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা নেতা হিসেবে স্মরণ করা হয়েছে। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে চীনের দ্রুত অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান হলো।

এলাকার খবর

সম্পর্কিত