অক্টোবরের বেতনের সঙ্গে মিলতে পারে প্রায় তিন মাসের বকেয়া
নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণের (পে ফিক্সেশন) কাজ শুরু হচ্ছে আজ সোমবার (৫ অক্টোবর)। নতুন বেতন কত হবে এবং অক্টোবরের বেতনের সঙ্গে কত টাকা বকেয়া বা এরিয়ার পাওয়া যাবে—এখন সরকারি চাকরিজীবীদের বড় প্রশ্ন সেটিই। অর্থ বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী ২০ অক্টোবরের মধ্যে পে ফিক্সেশনের পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে।
পে ফিক্সেশনের পুরো কাজ হবে সমন্বিত বাজেট ও হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থা আইবাস প্লাস প্লাসের (আইবাস) নির্ধারিত মডিউলের মাধ্যমে। অনলাইনে শুধু বর্তমান বেতনের তথ্য দিলেই হবে না; চাকরিতে যোগদানের তারিখ, বর্তমান পদ ও গ্রেড, ৩০ জুন ২০২৬ তারিখের মূল বেতনসহ আগের বেতন নির্ধারণ, পদোন্নতি, বদলি, সময় স্কেল, বাছাই গ্রেড ও উচ্চতর গ্রেডের তথ্যও সঠিকভাবে দিতে হবে। এসব তথ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অফিস আদেশ ও প্রয়োজনীয় নথি প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পে ফিক্সেশনের আগে জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, জন্মতারিখ, বর্তমান পদবি ও গ্রেড, চাকরিতে যোগদানের তারিখ এবং ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে প্রাপ্ত মূল বেতনের তথ্য হাতে রাখতে হবে। আইবাস++-এ নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরও সচল থাকতে হবে। তথ্যের কোনো গরমিল থাকলে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের যাচাইয়ের সময় তা সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে।
অনলাইনে তথ্য পূরণ করে আবেদন জমা দিলেই প্রক্রিয়া শেষ হবে না। সংশ্লিষ্ট প্রধান হিসাব ও অর্থ কর্মকর্তা, বিভাগীয় হিসাব নিয়ন্ত্রক, জেলা হিসাব ও অর্থ কর্মকর্তা বা উপজেলা হিসাব কর্মকর্তার কার্যালয় চাকরির নথির সঙ্গে অনলাইনে দেওয়া তথ্য মিলিয়ে দেখবে। তথ্য সঠিক পাওয়া গেলে পে ফিক্সেশন অনুমোদন করা হবে। অনুমোদনের পর আইবাস++ থেকে যাচাই নম্বর তৈরি হবে এবং তা চাকরির নথিতে নতুন নির্ধারিত মূল বেতনের সঙ্গে সংরক্ষণ করা হবে।
নতুন বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে ৩০ জুন ২০২৬ তারিখের মূল বেতনকে ভিত্তি ধরা হবে। কোনো কর্মচারী পুরোনো বেতন স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপে থাকলে সংশ্লিষ্ট গ্রেডের নতুন স্কেলের প্রারম্ভিক বেতনই তাঁর নতুন মূল বেতন হবে। আর প্রারম্ভিক ধাপের চেয়ে বেশি মূল বেতন থাকলে পুরোনো স্কেলের শুরু থেকে বর্তমান বেতনের ব্যবধান বের করে তা নতুন স্কেলের প্রারম্ভিক বেতনের সঙ্গে যোগ করা হবে। হিসাবের ফল নতুন স্কেলের কোনো নির্ধারিত ধাপে না মিললে পরবর্তী উচ্চতর ধাপ অনুযায়ী বেতন নির্ধারণ করা হবে।
নতুন জাতীয় বেতন কাঠামোতে সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন মূল বেতন একবারে পুরোপুরি কার্যকর না হয়ে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রথম ধাপে নতুন ও পুরোনো মূল বেতনের পার্থক্যের ৪০ শতাংশ, ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ৭০ শতাংশ এবং ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে পুরো নতুন মূল বেতন কার্যকর হবে। নতুন কাঠামোর ভাতা কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।
পে ফিক্সেশন শেষ হওয়ার পর অক্টোবরের বেতন নতুন মূল বেতনের ভিত্তিতে হিসাব করা হবে। একই সঙ্গে ১ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়া নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী প্রাপ্য পার্থক্যের হিসাব করে প্রায় তিন মাসের বকেয়া বা এরিয়ার নির্ধারণ করা হবে। তবে সবার বকেয়ার পরিমাণ এক হবে না। গ্রেড, ৩০ জুনের মূল বেতন, নতুন কাঠামোয় নির্ধারিত বেতন এবং চাকরির পূর্ববর্তী বেতন-ইতিহাসের ওপর তা নির্ভর করবে।
এ কারণে পে ফিক্সেশনের সময় বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে আগের বেতন নির্ধারণের তথ্য। পদোন্নতি, বদলি, সময় স্কেল, বাছাই গ্রেড বা উচ্চতর গ্রেডের কোনো তথ্য বাদ পড়লে নতুন মূল বেতন ও বকেয়ার হিসাবেও সমস্যা হতে পারে। নতুন বেতন আদেশে আগের কাঠামোয় একাধিক বাছাই গ্রেড, সময় স্কেল বা উচ্চতর গ্রেড পাওয়া কর্মচারীদের ক্ষেত্রে নতুন উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ নিয়েও নির্দিষ্ট বিধান রাখা হয়েছে। ফলে শুধু বর্তমান বেতন জানলেই পে ফিক্সেশন সম্পন্ন করা যাবে না; চাকরির পুরো বেতন-ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারি চাকরিজীবীদের পে ফিক্সেশন শুরু হলেও এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের নতুন বেতন কার্যকর করার প্রক্রিয়া নিয়ে কিছুদিন ধরে যে ধোঁয়াশা ছিল, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক এরই মধ্যে পরিষ্কার হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক গত ৩০ সেপ্টেম্বর জানিয়েছেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের নতুন পে স্কেলে অন্তর্ভুক্তির জন্য পৃথক প্রজ্ঞাপনের প্রয়োজন হবে না। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য জারি করা বেতন-ভাতার আদেশই এমপিওভুক্ত জনবলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে বলে তিনি জানান।
এর আগে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি হবে বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল। পরে অর্থ ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় পৃথক প্রজ্ঞাপনের প্রয়োজন নেই বলে মত আসে। ফলে এখন মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন কীভাবে এবং কখন নতুন কাঠামোয় সমন্বয় করা হবে।
দেশে বর্তমানে ছয় লাখের বেশি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন। এর মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে প্রায় ৩ লাখ ৯৮ হাজার, মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে পৌনে ২ লাখ এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে ২৩ হাজারের বেশি শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন।
এমপিওভুক্ত জনবলের ক্ষেত্রে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের প্রশাসনিক ও বেতন সমন্বয়ের কাজ শিক্ষা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে করতে হবে। সরকারি চাকরিজীবীদের মতো তাঁদের সব ভাতা একইভাবে প্রযোজ্য হবে কি না, সে বিষয়টি আলাদা বিধান ও বিদ্যমান এমপিও কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্ধারিত হবে। অর্থাৎ সরকারি চাকরিজীবীদের পে ফিক্সেশন ৫ থেকে ২০ অক্টোবরের মধ্যে এগোলেও এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে বেতন সমন্বয়ের কারিগরি প্রক্রিয়াটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হলো পে ফিক্সেশনের আগে নিজের এনআইডি, জন্মতারিখ, পদ ও গ্রেড, চাকরিতে যোগদানের তারিখ এবং ৩০ জুনের মূল বেতনসহ পূর্ববর্তী সব বেতন নির্ধারণের কাগজপত্র মিলিয়ে রাখা। সঠিক তথ্যই নির্ধারণ করবে নতুন মূল বেতন কত হবে এবং অক্টোবরের বেতনের সঙ্গে কত টাকা বকেয়া পাওনা যুক্ত হবে।